ড. মঈনুল ইসলামের কলাম

সোমবার , ৭ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ
39

দুর্নীতি ও পুঁজিলুণ্ঠনের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান : প্রধানমন্ত্রী বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছেন
ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার ও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও পুঁজিলুন্ঠনের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত ‘নিজের ঘর’ থেকে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ এর অঙ্গীকার বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। প্রথমে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে শেখ হাসিনার নির্দেশে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ার পর দু’সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ঢাকার নামী-দামী ফুটবল ক্লাবগুলোতে বেআইনিভাবে চালু হওয়া এবং পুলিশের নাকের ডগায় রমরমা ব্যবসা চালানো অনেকগুলো ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে র‌্যাবের ক্র্যাকডাউন এবং ক্যাসিনো পরিচালনাকারী আওয়ামী যুব লীগের নেতার আসনে গেড়ে বসা ‘গডফাদারদের’ গ্রেফতার ও কোটি কোটি টাকা মূল্যের জুয়ার সরঞ্জাম উদঘাটন দেশে-বিদেশে বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে কয়েকজনের কাছ থেকে কয়েকশত কোটি টাকার এফডিআর ও বিপুল অংকের নগদ টাকা পাওয়ার পর এই গডফাদাররা প্রকৃতপক্ষে কত শত বা হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছে এবং কিভাবে, তা নিয়ে সবার মধ্যে প্রচন্ড কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জনাব এইচ টি ইমামের ভাষ্য অনুযায়ী এই গডফাদারদের সিংহভাগই বিএনপি ও ফ্রিডম পার্টি থেকে যুবলীগে ঢুকে পড়ে গত দশ বছরে প্রতাপশালী নেতা বনে গেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী জনাব ওবাইদুল কাদের এই ক্র্যাকডাউনকে শেখ হাসিনার নির্দেশে শুরু হওয়া ‘শুদ্ধি অভিযান’ অভিহিত করে দাবি করেছেন, এই অভিযান আরো সম্প্রসারিত ও জোরদার করা হবে। গত ২ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থ যে ‘উইপোকারা’ খেয়ে ফেলছে ওদেরকে দমন করতে হবে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই এখন নাকি গোয়েন্দাদের স্ক্যানারে রয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে অদূর ভবিষ্যতে ক্র্যাকডাউন পরিচালিত হবে। দেরিতে হলেও এই শুদ্ধি অভিযান শুরু করার জন্যে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন, তাঁর প্রতি রইল শুভকামনা। বাংলাদেশের উন্নয়নের পথের ‘এক নম্বর বাধা’ দুর্নীতি ও পুঁজি লুন্ঠন। এবার যদি এই দুটো জাতীয় মহাদুর্দশার বিরুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ সত্যিসত্যিই শুরু হয় তাহলে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করবেন।
বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতনের পর ১৯৯৬-২০০৮ পর্যায়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনে কোন ক্ষমতাসীন দল বা জোট পরপর দু’বার নির্বাচনে জয়ী হতে পারেনি দুর্নীতি ও পুঁজিলুন্ঠনের তাণ্ডব থেকে দলের বা জোটের নেতা-কর্মীরা মুক্ত থাকতে না পারার কারণে। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের তিনটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনেই জনগণ সদ্য-সাবেক সরকারে আসীন দল বা জোটকে প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। জনগণের প্রত্যাখ্যানের কারণে ক্ষমতা হারানোর এই ‘অনিবার্য ধারাবাহিকতায়’ ভয় পেয়েই ২০১১ সালে শেখ হাসিনার ইচ্ছানুসারে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মহাজোট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধান থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে। কারণ, ২০০৯-১৪ মেয়াদের মহাজোট সরকারও দুর্নীতি ও পুঁজিলুন্ঠনের পুরানো পথেই শাসনকার্য চালিয়েছিল। সেজন্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা সত্ত্বেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত জোট বয়কট না করলে ঐ নির্বাচনে তারা ক্ষমতাসীন মহাজোটকে আবারো পরাজিত করতে সক্ষম হতো বলে ওয়াকিবহাল মহলে দৃঢ়মূল ধারণা ছিল।
বেগম জিয়ার ‘পন্ডিতপ্রবর পুত্রের’ ডিকটেশানে এবং সন্ত্রাস ও খুনাখুনির মাধ্যমে সামরিক শাসন আনতে পারবে বলে জামায়াত-শিবিরের অগাধ বিশ্বাসের কারণে ভুল চাল দিয়ে তারা ঐ সুযোগ হারিয়েছে। কিন্তু, ২০১৪-২০১৮ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনেকগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনায় সাফল্যের কারণে শেখ হাসিনার ওপর জনগণের আস্থা ক্রমেই বেড়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনী প্রচারের পর্যায়ে বোঝা যাচ্ছিল জনগণ শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী করতে যাচ্ছে। একইসাথে, অর্থনীতির এই সাফল্যের ধারা যাতে বিঘ্নিত না হয় সেজন্যে বিএনপি-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি সম্পর্কে জনগণের মনে বিতৃষ্ণা জোরদার হতে থাকায় তাদের জনপ্রিয়তায়ও ভাটার টান শুরু হয়েছে। কিন্তু, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং চাণক্যপ্রবর ‘থিংক ট্যাংক’ জনগণের এই নাড়িস্পন্দন ধরতে না পারায় আওয়ামী লীগ ও মহাজোট ব্যালট জবরদখল করে সিল মারার পথেই এগিয়ে যায়, যার কোন প্রয়োজন ছিল না। ফলে, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের এই ‘গোল্ডেন চান্সটা’ হারিয়ে ফেলেছে।
ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন সত্ত্বেও গত নয় মাসে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর কোন রাজনৈতিক চাপই সৃষ্টি করতে পারেনি। অন্যদিকে, অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো এখন আরো বেশি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। ২০১৮-১৯ অর্থ-বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৩ শতাংশে পৌঁছে গেছে, যেটা এশিয়ায় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির হার। সাফল্যের এই শিখরে পৌঁছার পর এবং বিরোধী জোটের কোন রাজনৈতিক চাপ না থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা যে নিজের ঘর থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে শুদ্ধি অভিযানটা শুরু করলেন সেটা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। বিশেষত, শুদ্ধি অভিযানে শেখ হাসিনার সাফল্যের জন্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি এজন্যে যে তিনি হয়তো এই অভিযানের মাধ্যমে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক সংগ্রামে ঝাঁপ দিয়েছেন। এদেশে দুর্নীতি ও পুঁজি লুন্ঠনকে রুখে দাঁড়ানোর দুঃসাহস দেখানো যেন বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়া, শুদ্ধি অভিযানের কারণে শেখ হাসিনা দুর্নীতিবাজ ও পুঁজি লুটেরাদের টার্গেটে পরিণত হতে পারেন!
স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকারেও ১৯৭৩ সাল থেকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ ও আমলারা সক্রিয় হয়েছিল। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন বেশ কয়েকবার তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্যে প্রকাশ্যেই বঙ্গবন্ধুকে অভিযোগ জানিয়েছিলেন, কোন ফায়দা হয়নি। দুর্দিনের সাথীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে না পেরে দুর্নীতিকে মেনে নেয়ার এই ভুল বঙ্গবন্ধুর শাসনামলকে আজো কালিমালিপ্ত করে চলেছে। আরো মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এদেশে দুর্নীতি ও পুঁজি-লুন্ঠনকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের সুযোগ করে দিয়েছেন তাঁদের অবৈধ শাসনকে স্থায়ী করার প্রয়োজনে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে আবারো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তানি কায়দার সামরিক বাহিনী ও সিভিল আমলাতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত নব্য-ঔপনিবেশিক, আমলাতান্ত্রিক ও পুঁজিলুন্ঠনমূলক সরকার ব্যবস্থা। সুযোগ-শিকারী ডানপন্থী ও বামপন্থী নেতা-পাতিনেতা-কর্মী, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সিভিল আমলা, পেশাজীবী এবং ব্যবসায়ীদেরকে কেনাবেচার রাজনীতির মাধ্যমে জড়ো করে ক্যান্টনমেন্টে বসেই জিয়াউর রহমান গড়ে তুলেছিলেন তাঁর তল্পিবাহক রাজনৈতিক দল বিএনপি।
রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে তিনি নিজে দুর্নীতি না করলেও তাঁর আমলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি ও পুঁজিলুন্ঠন ক্রমেই বেড়ে গিয়েছিল। এ-ব্যাপারে তাঁর আমল নিয়ে দুটো গবেষণা-গ্রন্থের দু’জন লেখকের কাছে তিনি খোলামেলা স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন।
১৯৯৩ সালে প্রকাশিত বই পেট্রন-ক্লায়েন্ট পলিটিক্স এন্ড বিজনেস ইন বাংলাদেশ-এর লেখক কোসানেকের কাছে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে জিয়া বলেছিলেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে উন্নয়নের প্রাথমিক স্তরে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি অপরিহার্য বাস্তবতা (fact of life)। কোসানেক বলছেন, জিয়া আমলে, Corruption was converted from a crime to a habit. ১৯৮২ সালে প্রকাশিত মার্কাস ফ্রান্ডার বই বাংলাদেশ: দি ফার্স্ট ডিকেড-এ ফ্রান্ডার মতামত আরো খোলামেলা, What Zia has done is to regularize corruption and make it almost necessary for everyone to become involved in it.
১৯৫৭ সালে প্রকাশিত পল বারানের বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ Political Economy of Growth এ মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া (বা মুৎসুদ্দি পুঁজি) (comprador bougeoisie) ও মুৎসুদ্দি সরকার (comprador government) ধারণাগুলো সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। বারান ‘মুৎসুদ্দি পুঁজি’ কনসেপ্টটির সংজ্ঞা দিয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর নব্য-ঔপনিবেশিক বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রচন্ড শক্তিধর বহুজাতিক করপোরেশানগুলোর উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে তৃতীয় বিশ্বের পুঁজিপতিদের এজেন্টের ভূমিকা পালনকে ফোকাস করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইন্ডেন্টর, আমদানিকারক, সোল এজেন্ট, পরিবেশক, এসেম্বলি প্ল্যান্ট স্থাপনকারী শিল্পপতি, ফ্র্যান্সাইজি কিংবা সেলস এজেন্টের ভূমিকা পালনের মাধ্যমে যেসব বাণিজ্য-নির্ভর পুঁজিপতি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মুনাফা আহরণ করে তাদেরকেই পল বারান ‘মুৎসুদ্দি পুঁজি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আর, নব্য-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় ‘মুৎসুদ্দি সরকার’ বলা হয়েছে ঐসব রাষ্ট্রের সরকারকে যেগুলো উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর ও তাদের তল্পিবাহক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ডিকটেশান মেনে চলে। সামরিক একনায়ক জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সরকারের শাসনামলে দুজনেরই মার্কিন বশংবদতার কারণে এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর তখনকার বাংলাদেশের অর্থনীতির সর্বব্যাপ্ত নির্ভরতাহেতু তাঁদের নেতৃত্বাধীন সরকারকে ‘মুৎসুদ্দি সরকার’ আখ্যায়িত করা যায়।
১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশে যে পুঁজিপতি গোষ্ঠীর বিকাশ হয়েছে তাঁদের চারিত্র্য বর্ণনার জন্যে ‘মুৎসুদ্দি পুঁজি’ কনসেপ্টটি খুবই যুতসই। ১৯৭৫ সাল থেকে বর্ধিত বৈদেশিক অনুদান ও ঋণ থেকে মার্জিন আহরণ এবং আমদানি বাণিজ্যে বহুল প্রচলিত নানা পদ্ধতিতে এদেশে পুঁজি লুন্ঠন ও দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করেছিল, যে প্রক্রিয়াগুলো স্বৈরাচারী এরশাদ আমলে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে।
১৯৯১ সালে ভোটের রাজনীতি চালু হওয়ার পর গত ২৮ বছর একই প্রক্রিয়াগুলো চালু রয়েছে। একইসাথে, ক্ষমতাসীন দল বা জোটগুলোর নেতা-কর্মীরা সরকারি প্রকল্পগুলো থেকে বেধড়ক্‌ পুঁজি-লুন্ঠন করেছে। দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় এই ৪৪ বছর ধরে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতিও বেড়ে পর্বতপ্রমাণ হয়ে উঠেছে। এই সরকার ব্যবস্থাকেই উন্নয়ন ডিসকোর্সে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা চৌর্যতন্ত্র (kleptocracy) কিংবা ‘পুঁজি-লুন্ঠনমূলক সরকার’ (extractive government) আখ্যায়িত করা হয়। দুঃখজনক হলো যে ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর দশ বছর অতিক্রান্ত হলেও শেখ হাসিনা এই দুর্নীতি ও পুঁজিলুন্ঠনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সদিচ্ছা দেখাননি। ফলে, তাঁর দলের সকল স্তরের নেতা-কর্মীদের একটা বড় অংশই লুটেরা পুঁজির ফায়দাভোগী হয়ে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছের’ রূপ ধারণ করেছে। তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জনমনে ভীতি-সঞ্চারকারী ‘গডফাদারে’ পরিণত হয়েছে। কিন্তু, মনে রাখতে হবে এসব গডফাদার কখনোই আওয়ামী লীগের আদর্শিক রাজনীতির জন্যে প্রাণপাত করবে না, বরং তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলে খোদ শেখ হাসিনার জন্যেই তারা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ভূমিকা পালনে দ্বিধা করবে না।
তাই, তাদের বিরুদ্ধে যদি শেখ হাসিনা সত্যিসত্যিই শুদ্ধি অভিযান জোরদার করেন, তাহলে হয়তো তিনি বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ার দুঃসাহসই দেখাবেন। এই দুর্বৃত্তরা সহজে চলমান ক্র্যাকডাউনকে মেনে নেবে না। কিন্তু, ঐ ভয়ে শুদ্ধি অভিযান থামতে পারে না। এদেশের কলংকজনক দুর্নীতি ও পুঁজিলুন্ঠনের ইতিহাস বদলানোর গুরুদায়িত্ব শেখ হাসিনা অসীম সাহসে তাঁর কাঁধে তুলে নিয়েছেন, জাতি তাঁর সাথে থাকবে।
শেখ হাসিনা তেয়াত্তর বছরে পা রেখেছেন, আওয়ামী লীগের অন্যান্য বর্ষীয়ান নেতা-নেত্রীও বয়সের দিক্‌ থেকে সত্তর বা আশির ঘরে অবস্থান করছেন। তাঁরা যদি এদেশের জনগণের মনে ভালবাসা ও শ্রদ্ধার আসন স্থায়ী করতে চান তাহলে এই ‘শুদ্ধি অভিযান’কে বেগবান করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতেই হবে, শেখ হাসিনা যে সুযোগটি সৃষ্টি করে দিয়েছেন তা হারানো দুর্ভাগ্যজনক হবে।
বর্ষীয়ান নেতা-নেত্রীদের প্রায় সবাইকে তিনি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর নূতন মন্ত্রীসভা থেকে বাদ দিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই ঢালাও পরিবর্তনকে সমর্থন করতে পারিনি। গত মন্ত্রীসভার মধ্যে যাঁদের ব্যাপারে জনগণের মধ্যে প্রশংসা, সুনাম ও শ্রদ্ধা পরিলক্ষিত হয়েছে তাঁদেরকে মন্ত্রীসভা থেকে খারিজ করে দেওয়া অসমীচীন হয়েছে, জাতির জন্যেও তা ক্ষতিকর হয়েছে। প্রবীণদের জায়গায় নবীনরা মন্ত্রিসভায় স্থান করে নেবে সেটা স্বাভাবিক, কিন্তু রদবদলটা হতে হবে ক্রমান্বয়ে। কিন্তু, এবারের ঢালাও পরিবর্তনটা অমার্জিত গলাধাক্কা হয়ে গেছে!
অন্যদিকে, বর্তমান মন্ত্রিসভায় যাঁদের ঠাঁই হয়েছে তাঁদের কয়েকজনের অতীতের রেকর্ড মোটেও প্রশংসনীয় ছিল না। সেজন্যেই প্রশ্ন উঠেছে, ইনারা নিজেদের কলংক কিভাবে আড়াল করলেন? ‘জিরো টলারেন্স’ তো ওখান থেকেই শুরু হওয়া উচিত ছিল! আমার আকুল আহ্বান, এই শুদ্ধি অভিযানকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধে পরিণত করুন। রচনাকাল : ৬অক্টোবর ২০১৯

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর,

অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

x