ড. গৌরী ভট্টাচার্য্য (মন শুদ্ধিকরণ)

সোমবার , ৫ নভেম্বর, ২০১৮ at ৩:২৪ অপরাহ্ণ
19

মানুষের মন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীরঘেরা সম্পূর্ণ নিজস্ব বস্তু। পরস্পরের মনের কথা অনুধাবনের চেষ্টা কার্যত ব্যর্থ হয়। আবার একমনের সাথে অন্যমনের যোগাযোগ স্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার।একে অপরের মন বোঝাও অসম্ভব। চোখে দেখে শরীরের অবস্থা বোঝা গেলেও মনের অবস্থা বোঝা যায়না, শুধুমাত্র অনুমান করা যায়। আবার যা অনুমান করা হয় তা কখনো সম্পূর্ণ সত্য হয়না, কখনো ভুল অনুমানও করা হয়। বেশীরভাগ সময় কোন ব্যক্তির আচরণ বন্ধুর মতো হলেও আসলে তার মনে বন্ধুতা নাকি শত্রুতা আছে তা কেউ বলতে পারেনা।অর্থাৎ পরস্পরের কাছে মন একেবারেই অজ্ঞাত। অথচ সমাজে, সংসারে, কর্মক্ষেত্রে, চলতে ফিরতে মনকে মেনে নেওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। দেহের অভ্যন্তরে অতি সুক্ষতর কিছু দিয়ে মন গঠিত,যা সম্পূর্ণ যার যার নিজস্ব,অদৃশ্য বস্তুু। মনের ভিতর থেকেই ভালোমন্দের পরিবর্তন ঘটে।এই পরিবর্তন পরিস্থিতির কারণে কখনো ইচ্ছায় কখনো বা অনিচ্ছায়।
প্রাচীন মুনিঋষি গণ বলেছেন মনই সর্বাধিক দ্রুতগতি সম্পন্ন। মনদিয়ে সমগ্র বিশ্বজগতকে অনুভব করা যায়। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত মনেমনে ভ্রমণ করা যায়, মনের চোখে দেখাও যায়। বহুবছর আগে দেখা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা,মনোরম দৃশ্য, পবিত্রস্থান, চিত্ররূপে মনের গভীরে চীরস্থায়ী রেখাপাত করে, আবার ক্রোধ, ঘৃণা, দুঃখজনক ঘটনা সবই মনের মধ্যে ছবির মতো আঁকা থাকে। স্মৃতির পথ ধরে সেগুলি আবার মনে বিভিন্ন সময় উদয় হয়, মনের চোখে দৃশ্যমান হয়। মন তখন দুঃখবেদনা, পাওয়া না পাওয়ার হিসাব কষতে থাকে, জীবনের ব্যর্থতার কথা ভেবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে অসুস্থায় ভোগে। অসুস্থ মননিয়ে শান্তিতে থাকা যায়না,দেহ রোগাক্রান্ত হয়। মনকে সুস্থ রাখার জন্য মনের শুদ্ধিকরণ খুবই প্রয়োজন। মন শুদ্ধিকরণের জন্য অবাঞ্চিত, অনভিপ্রেত, ভ্রান্তধারণা সমন্বিত ছবিগুলিকে মনথেকে মুছে ফেলা একান্ত দরকার। গুণ সম্বলিত, গৌরবময় অর্জন,আনন্দময় ঘটনা, শিক্ষণীয় বিষয়গুলি মনের গভীরে স্থায়ীভাবে অনুভব করতে করতে মন অভ্যস্ত হয়ে উঠবে শুদ্ধিকরণে। মনের মধ্যে লুকিয়ে আছে অপ্রতিরোধ্য শক্তি, সে শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হয়। দেহের ভিতরে থেকেই এইমন স্থান, কাল, কার্যকারণের সীমা অতিক্রম করতে পারে। মানুষের দেহের অভ্যন্তরে মহা মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে মন। অথচ এই মূল্যবান সম্পদ বেশীরভাগ সময় অসুস্থতায় ভোগে। মনের শুদ্ধিকরণ করে মনকে সুস্থ রাখা যায়। মনের উন্নতি সাধন করে শুদ্ধিকরণ ঘটতে পারে। পেশাগত শিক্ষাই শুধু মনের শুদ্ধতার জন্য যথেষ্ট নয়,এক্ষেত্রে নৈতিক মূল্যবোধের সাধন করা প্রয়োজন। নৈতিক মূল্যবোধ যেমন, সত্যবাদিতা, সততা, মানবিকতা, নির্ভীকতা, বিনয়, আত্মসংযম, বিবেক, সুবুদ্ধি, ধৈর্য্য, মৈত্রীভাব, ত্যাগ,সহিষ্ণুতা, শ্রদ্ধাভক্তি প্রভৃতি মনের গভীরে উপলব্ধি করতে করতে দীর্ঘস্থায়ী রেখাপাত করে। এই সকল নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার মাধ্যমে মনের শুদ্ধিকরণ সাধিত হয়। দেহের ভিতর পরম পবিত্র আত্মা শুদ্ধ মনের সাথে অভেদ থাকে। মন তখন আর বিচলিত হয়না সদা শান্ত থাকে। শুদ্ধ মনের অধিকারী হলে দেহে শান্তি বিরাজ করে।

x