ডেঙ্গু ।। আতঙ্ক নয়, চাই সচেতনতা

অধ্যাপক ডা. অনুপম বড়ুয়া

শনিবার , ৩ আগস্ট, ২০১৯ at ৪:৪৮ পূর্বাহ্ণ
89

ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে কোন আতঙ্ক নয় বরং ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সামাজিক সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
ডেঙ্গু জ্বর এডিস মশাবাহিত একটি সংক্রামক ব্যাধি। বিশেষ করে বর্ষাকালের শেষ দিক থেকে (জুলাই এর মাঝামাঝি) পুরো শরৎ এবং হেমন্তের শুরু পর্যন্ত (অক্টোবর পর্যন্ত) ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, এ বছর ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব অনেকখানি বেড়ে গেছে।
গরম এবং আর্দ্র পরিবেশ এডিস মশা বিস্তারের জন্য উপযোগী। এডিস মশা স্বচ্ছ এবং স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। তাই এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী সমস্ত জায়গা পরিষ্কার রাখতে হবে, যা হবে ডেঙ্গু জ্বর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সবচাইতে কার্যকরী পদক্ষেপ। তাই ঘরের ভিতর এবং আশেপাশে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো ফুলের টব, প্লাস্টিক এবং মাটির পাত্র, ড্রাম, গাড়ির টায়ার এয়ারকুলার ও ফ্রিজে জমে থাকা পানি, ডাবের খোসা, গাছের কোটর ইত্যাদিতে জমে থাকা স্বচ্ছ পরিষ্কার পানি তিনদিনের মধ্যে পরিষ্কার করতে হবে। বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত, বিদ্যালয়ের চারপাশে সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিন দিন মশার স্প্রে, ওষুধ ইত্যাদি ছিটানো উচিত। এছাড়া মহল্লা বা ওয়ার্ডভিত্তিক, সিটি কর্পোরেশন ও স্কুল কলেজ, পৌরসভাসমূহে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাও এক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।
এডিস মশা সাধারণত ভোর এবং গোধূলীকালীন সময়ে কামড়ায়। তবে অন্যান্য যেকোন সময়ও এটি কামড়াতে পারে। পনের বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। তাই মশা থেকে বাঁচার জন্য বাসা-বাড়ির জানালায় নেট লাগানো যেতে পারে। মশা তাড়ানোর জন্য মশার স্প্রে, লোশন, ক্রিম ইত্যাদিও ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুদের ফুলহাতা জামা, লম্বা প্যান্ট ও মোজা পরিয়ে রাখা উচিত।
ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণু হলো ডেঙ্গু ভাইরাস। এটি একটি আরএনএ (জঘঅ) ভাইরাস, ফ্লেভি ভাইরাসগণের অন্তর্ভুক্ত, চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপ আছে (উঊঘঠ-১, ২, ৩, ৪)। সাধারণত তিন ধরনের ডেঙ্গু জ্বর দেখা যায়। ক্ল্যাসিক ডেঙ্গু জ্বর, ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। কখনো কখনো অন্যান্য জটিলতা যেমন- লিভার কিংবা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া, হৃদপিণ্ড বা ব্রেইনে সংক্রমণ ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।
ক্ল্যাসিক ডেঙ্গু জ্বরে ২ থেকে ৭ দিন জ্বর থাকে। এই ক্ষেত্রে তীব্র জ্বরের সাথে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা, অক্ষি কোটরে ব্যথা, কোমর, অস্থি সন্ধি বা মাংসপেশীতে ব্যথা থাকতে পারে। এই কারণে ডেঙ্গু জ্বরকে ব্রেক বোন ফিভারও বলা হয়। জ্বরের চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ দিনে শরীর জুড়ে লালচে দানার মত র‌্যাস হয়। রোগীর বমি ভাব ও ক্লান্তিবোধ হতে পারে। সাধারণত ৪-৫ দিনে জ্বর কমে যায়, কারো ক্ষেত্রে ২-৩ দিন পর আবার জ্বর আসতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বরের চারটি সেরোটাইপের মধ্যে যেকোন একটি দিয়ে এটি হয়। পরবর্তীতে এই সেরোটাইপ দিয়ে একই রোগীর আর জ্বর হয় না। কোন একটি সেরোটাইপ দিয়ে সংক্রমণের পরবর্তীতে অন্য সেরোটাইপ দিয়ে ডেঙ্গু জ্বর হলে ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হতে পারে।
ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরে ক্লাসিক ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণের পাশাপাশি শরীরের বিভিন্ন অংশ যেমন-চামড়া, দাঁতের মাড়ি, কফ, বমি বা পায়খানার সাথে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এমনকি মেয়েদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঋতুস্রাবও হয়। এই সময় রোগীর বুকে ও পেটে পানি জমতে পারে।
ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে হঠাৎ করে রোগীর রক্তচাপ, নাড়ির স্পন্দন কমে যায়, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায় এবং প্রস্রাব কমে যায়। কখনো কখনো রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বর সিবিসি (ঈইঈ) পরীক্ষা, ৩ দিনের মধ্যে এনএস-১ (ঘঝ১) পরীক্ষা এবং ৩ দিনের অধিক হলে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে সহজেই নির্ণয় করা যায়।
ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা খুবই সাধারণ। ক্লাসিক ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত ৫-৭ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। জ্বর হলে ভেজা কাপড় দিয়ে গা মুছতে হবে এবং প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেতে হবে।
এছাড়া প্রচুর পরিমাণে স্যালাইন, শরবত, ডাবের পানি, পানি ও অন্যান্য তরল খাবার খেতে হবে। জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামলই যথেষ্ট। অন্যান্য ওষুধ, যেমন-এসপিরিন, ইবোপ্রোফেন বা যে কোন ব্যথানাশক ওষুধ সম্পূর্ণ পরিহার করা অত্যাবশ্যক।
রোগী খেতে না পারলে শিরাপথে স্যালাইন দিতে হয়।
ডেঙ্গু জ্বর বর্তমানে একটি কঠিন বাস্তবতা, ডেঙ্গু হয়তো সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয় কিন্তু ডেঙ্গু জ্বরের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে নয় আর কোন আতঙ্ক, দরকার সামাজিক সচেতনতা ও কার্যকরী পদক্ষেপ। সচেতন হতে হলে ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কে জানতে হবে। এই মৌসুমে জ্বর হলে অবহেলা না করে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন এবং নিরাপদ থাকুন।

লেখক : মেডিসিন বিভাগ
চমেক হাসপাতাল

x