ডেঙ্গুর প্রকোপের শঙ্কা, সতর্ক থাকার পরামর্শ

চসিকের মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন

রতন বড়ুয়া

বৃহস্পতিবার , ১১ জুলাই, ২০১৯ at ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ
117

চলছে ঘোর বর্ষা। তাই স্বাভাবিকভাবেই অপ্রত্যাশিত মরণব্যাধি ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে শঙ্কা ভর করেছে শহর-গ্রামে। এরই মধ্যে ঢাকা শহরে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসকসহ বেশ কয়জনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। যার কারণে মরণব্যাধি এই রোগের প্রকোপ নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রামেও। যদিও এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরে ডেঙ্গু আক্রান্তের খুব একটা খবর পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় বলছে- গত জুন মাসে মহানগরে কেবল আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজন রোগী চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। এর বাইরে গত ফেব্রুয়ারিতে একজন রোগী পাওয়া যায় বেসরকারি রয়েল হাসপাতালে। এ দুটি ছাড়া মহানগরের কোথাও আর ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়নি। তবে উপজেলাগুলোতে গত ৬ মাসে ২ জন রোগী পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. নুরুল হায়দার।
এদিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালেও এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনো রোগী পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। দৈনিক প্রায় ২ শতাধিক রোগী ভর্তি হলেও এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত কোন রোগী পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন মেডিসিন বিভাগের একটি ইউনিটের প্রধান প্রফেসর ডা. অনুপম বড়ুয়া। একই তথ্য দিয়েছেন মেডিসিন বিভাগের আরেক ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুর সাত্তার। শিশুদের মাঝেও এখনো পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত কোন রোগী পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের শিশু-স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ। তবে ডেঙ্গুর প্রকোপ এখনো খুব বেশি ছড়িয়ে না পড়লেও ব্যক্তিগত চেম্বারে ২/১টি করে এ রোগে আক্রান্তের দেখা মিলছে বলে জানিয়েছেন একাধিক চিকিৎসক। অপ্রত্যাশিত এ মরণব্যাধি থেকে বাঁচতে সবাইকে সচেতন হওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমাদের দেশে সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বরে এ জ্বরের প্রকোপ বেশি দেখা দেয়। কারণ, এ সময়টায় ডেঙ্গুর জীবানু বহনকারী এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে। বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে (ফুলের টবে, ডাবের খোসায়, বিভিন্ন খালি কৌটায় প্রভৃতি) পানি জমে থাকে। জমে থাকা বৃষ্টির পরিষ্কার পানিতে এ মশা প্রজনন করে থাকে। তাই বাড়ি বা বাড়ির আঙিনার কোথাও এ ধরনের পানি যেন জমে না থাকে সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পাশাপাশি দিনের বেলা সতর্কতামূলক মশারি টানিয়ে ঘুমানোর পরামর্শও দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
সিটি কর্পোরেশনের অধীন হাসপাতালগুলোতেও ডেঙ্গু আক্রান্তের কোন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী। তবে আক্রান্তের তথ্য পাওয়া না গেলেও বৃষ্টির পর রোগটির প্রকোপ দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। ডেঙ্গু নিয়ে সচেতনতা কার্যক্রম জোরালো করা হবে জানিয়ে চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন- কর্পোরশনের স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে দুয়েক দিনের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে পত্রিকায় সতর্কতা ও সচেতনতা মূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। আর বৃষ্টিপাত বন্ধ হলেই কাউন্সিলরদের নিয়ে প্রতি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে উদ্বুব্ধকরণ প্রোগ্রাম আয়োজন করা হবে। মানুষকে সচেতন করতে লিফলেট বিতরণ করা হবে বলেও জানান ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী।
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর তেমন প্রকোপ নেই জানিয়ে সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী আজাদীকে বলেন, ডেঙ্গু ঢাকায় মহামারী রুপে আর্ভিভূত হলেও চট্টগ্রামে এর প্রকোপ তেমন নেই। তবে আমরা প্রস্তুত আছি। চারদিকে খোঁজ-খবর রাখছি। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনে মেডিকেল টিমসহ সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে কন্ট্রোলরুম চালু করা হবে বলেও জানান সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী।
এদিকে, মশার উপদ্রব বাড়লেও এই সময়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিকের) মশক নিধনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী। তবে চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান সিদ্দিকী দাবি করেছেন- আগে মৌসুম ভেদে কার্যক্রম চালালেও বর্তমানে সারাবছরই মশক নিধন কার্যক্রম চলে। মশক নিধনে কেবল নালায় সেপ্র করা হয়ে থাকে জানিয়ে প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা বলেন- তবে তা কেবল সন্ধ্যা ও রাতে করা হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অধীনে এ কার্যক্রম সারাবছর অব্যাহত থাকে বলেও দাবি করেন তিনি।
চসিকের পক্ষ থেকে নালায় সেপ্র করার কথা বললেও তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী। গত তিন-চার মাসে কর্পোরেশনের কোন কর্মচারিকে একবারও সেপ্র করতে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন মুরাদপুর মোহাম্মদপুরের চৌধুরী মসজিদ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা বখতেয়ার আলম। একই দাবি বহদ্দারহাটের তালতলার বাসিন্দা আবুল কালাম ও চকবাজার এলাকার সাদ্দাম হোসেনরও। তাঁরা বলেন, সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম আছে বলে তো মনে হয় না। গত তিন-চার মাসে তাদের একবারও তো এলাকায় দেখিনি।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন- কোথাও কোথাও এখনো আক্রান্তের তথ্য না পেলেও ডেঙ্গুর প্রকোপের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কারণ যে হারে বৃষ্টিপাত হয়েছে, তাতে এডিশ মশার প্রজননের ঝুঁকি তো রয়েছেই। তাছাড়া বর্তমান সময়টা এই এডিশ মশার বংশ বিস্তারের মোক্ষম সময়। অনেক জায়গায় আবার হাসপাতালে পাওয়া না গেলেও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে এ রোগে আক্রান্তদের দেখা মিলছে। তাই রোগটির প্রকোপ দেখা দিতে পারে বলে শঙ্কা চিকিৎসকদের। তাঁরা বলছেন- এ রোগে আক্রান্ত বেশি সংখ্যকই হাসপাতালে আসেন না। খুব জটিল পর্যায়ে পৌঁছলে হাসপাতালে ভর্তি হন। অনেকেই ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা নেন। তাই আক্রান্তদের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র জ্বরই এ রোগের প্রধান লক্ষণ। মধ্যম বা অধিক মাত্রায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীরা সাধারণত হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্রথম দিকে কোন পরিবারই আক্রান্তকে হাসপাতালে আনার কথা ভাবে না। পরবর্তীতে জ্বরের সঙ্গে শরীর ব্যথা, হাড়ব্যথার পাশাপাশি শরীরে লালচে দানা বা র‌্যাশ দেখা দিতে পারে। প্রথমে হাত-পায়ে এবং পরে পুরো শরীরে দেখা যায়। অনেক সময় রক্তক্ষরণও হয়ে থাকে। এছাড়া তীব্র মাথাব্যথা, গলাব্যথা, পিঠব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, অস্থিসন্ধি এবং মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা এবং বমি বমি ভাব হতে পারে। এ ধরণের জটিল লক্ষণ দেখা দিলে কেবল তখনই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় মানুষ। এক্ষেত্রে বেশির ভাগ রোগীকে চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থা সংকটাপন্ন মনে হলেই মানুষ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবে। ফলে হাসপাতালে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম।
ডেঙ্গু কী : চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ডেঙ্গু এক ধরনের ভাইরাসজনিত রোগ। এডিস ইজিপ্টি নামে এক ধরনের মশা এ ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো সাধারণ এডিস মশা (যে এডিস মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের জীবাণু বহন করছে না) কামড়ালে সেই এডিস মশাটিও ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ মশা কোনো মানুষকে কামড়ালে তিনিও এ রোগে আক্রান্ত হন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগের মতো নেই মন্তব্য করে চসিক পরিচালিত মেমন জেনারেল হাসপাতালের (মেমন-২) শিশু রোগ কনসালটেন্ট ডা. সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, এখন আর আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ডাক্তার এবং নার্সদের পাশাপাশি মানুষের সচেতনতাও আগের চেয়ে বেড়েছে। নিয়ম মেনে পরিপূর্ণ বিশ্রাম নিলে অল্প সময়েই এ জ্বর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগের মতো না থাকলেও ডেঙ্গু জ্বরের পরবর্তী জটিলতার ঝুঁকি বেশি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাঁরা বলছেন, মূল ভয়টা ডেঙ্গু জ্বরের পরবর্তী জটিলতা নিয়ে। ডেঙ্গু জ্বর সময়মতো যথাযথভাবে মোকাবেলা না করা গেলে রোগীর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। একপর্যায়ে দেখা দেয় ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণকারী ডেঙ্গু জ্বর। এ জ্বরে ডেঙ্গুর লক্ষণ ও উপসর্গের পাশাপাশি আরও যে সমস্যাগুলো হয় তা হলো- রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্যকারী রক্ত কোষের (অণুচক্রিকা) সংখ্যা কমে যায়। ফলে চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ হয়, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যায়, পায়খানা কালচে বর্ণ ধারণ করে অথবা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যায়, নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়, অনেক সময় মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ফলে সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সর্বোত্তম পন্থা বলে মনে করেন চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. অনুপম বড়ুয়া। রোগটি নিয়ে সচেতনতার বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

x