“ডিসঅ্যাপিয়ার বনাম মিসিং” কেন?

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৩ জুলাই, ২০১৯ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
49

প্রিয়া সাহা মহিলাটার পদবি আছে। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক। ওয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে নালিশ দিলেন। বললেন, প্রেসিডেন্ট স্যার আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সেখানে ৩ কোটি ৭০ লাখ বা ৩৭ মিলিয়ন হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান উধাও (ডিসঅ্যাপিয়ার) হয়ে গেছেন! এখনো সেখানে ১৮ মিলিয়ন অর্থাৎ এক কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু আছে। দয়া করুন, আমরা আপনার সাহায্য চাই। আমরা দেশ ছাড়তে চাইনা। আমি বাড়ি হারিয়েছি, তারা আমার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। জমি কেড়ে নিয়েছে। এর কোন বিচার পাইনি।
কারা এসব করেছে জানতে চান ট্রাম্প। প্রিয়া সাহার উত্তর, উগ্রবাদী মুসলিমা এটা করেছে। সবসময় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা এসব করে যাচ্ছে!
বিস্ময়কর, অবিশ্বাস্য! এ’ ব্যাপারে প্রথম আলো পত্রিকার প্রশ্নের জবাবে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, প্রিয়া সাহা যে যুক্তরাষ্ট্র গেছেন, তা আমরা মিডিয়ার কাছ থেকে জানতে পেরেছি। তিনি আমাদের যুক্তরাষ্ট্র বা ওই সমাবেশে যাওয়ার কথা জানাননি। তা’ ছাড়া সম্মেলনে তিন সদস্যর যে প্রতিনিধি দল গেছে, তাতে তিনি অন্তর্ভুক্ত ছিলেননা। তিনি ‘ডিসঅ্যাপিয়ার’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন, সেটা তিনিই ভাল বলতে পারবেন। মি, দাশগুপ্ত ‘৪৭ সাল থেকে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, পাকিস্তানের জন্মলগ্নে ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ ৭১ সালের পর কমে ১৯ দশমিক ২০ শতাংশ এবং সর্বশেষ জরিপে এ’ সংখ্যা ৯ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনীতিতে এদের ‘মিসিং পিপল’ এবং বাংলায় হারিয়ে যাওয়া বা নিরুদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বলা হয় বলে ব্যাখ্যা দেন তিনি।
প্রিয়া সাহা আর হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান ঐক্য পরিষদ সম্পাদকের বক্তব্যের মূল পার্থক্য হচ্ছে, ইংরেজি শব্দ ‘ডিসঅ্যাপিয়ার আর মিসিং’! মিসেস সাহা প্রথম শব্দ ব্যবহার করেছেন আর বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সম্পাদক দ্বিতীয় শব্দ । বাকি হিসাব নিকেশ, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ কষ্ট করে নিজেরা মিলিয়ে নিন। রানা’দা আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তিনি অর্থনীতির ভাষা কেন ব্যবহার করছেন, ভোতা মাথায় ঢুকেনি। আর তাঁর সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে জঘন্য মিথ্যা, মনগড়া অভিযোগ দায়ের করলেন, তাও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে! তা কী দেশের মর্যাদাকে বিশ্বের বহু জাতিগোষ্ঠীর কাছে হেয় করেনি? এদিকে ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলার মিসেস সাহার বক্তব্য বাতিল করে দিয়ে বাংলাদশকে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির দেশ হিসাবে উল্লেখ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ঘটনার শিকড় কোথায়? কেন এমন জঘন্যতম রাষ্ট্রদ্রোহ!
প্রসঙ্গত জানাশোনায় নিজ পেশাসহ বহু পেশাজীবী সংখ্যালঘু পরিবারের মধ্যবিত্ত ও বিত্তশালীর ছেলে-মেয়ে প্রতিবেশী দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। হয় লেখা-পড়া অথবা অন্য কোন কাজে। অনেকে স্ত্রীকেও। এই প্রক্রিয়া বহু বছর ধরেই টানা চলছে। এরা কী পাসপোর্ট, ভিসা ছাড়া যাচ্ছেন! এই খাতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও সংশ্লিষ্ট দেশে পার হয়ে যাচ্ছে! তাহলে কেসগুলো মিসিং পিপল হয় কী করে? দেশের ইমিগ্রেশন ও সংশ্লিষ্ট দেশের মিশনের ফাইল যাচাই করলেতো সংখ্যাগুলো পাওয়া যাবেই। এরা সন্তান সন্ততি, স্ত্রী পাঠিয়ে দিয়ে এ’দেশের সব রাস্ট্রীয় সুবিধা চুটিয়ে ভোগ করছেন। এমন কী অনেকে সরকারি প্লট, ফ্ল্যাটের মালিকানাও নামমাত্র মূল্যে ভোগ দখল নিয়েছেন। এরাওতো ওনার ভাষায় সবকিছু বেচে দিয়ে মোটা টাকা নিয়ে মিসিং হয়ে যাবেন যে কোনদিন! নাকী? নিজের খুশিতে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে অন্য দেশে পাড়ি দেয়াকে কোন দুঃখে মিসিং বলা হবে! এতেতো ওসব মানীদের ডাহা অপমান করা হয়! মানলাম প্রিয়া সাহা যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো পরিষদের প্রতিনিধি দলে নেই। যদি নাই থাকেন, তিনি পরিষদের প্রতিনিধি দলের হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওভাল অফিসে গেলেন কোন পরিচয়ে? আর মুখপাত্র হয়ে কীভাবে টানা জঘন্য কুৎসা রটালেন দেশের বিরুদ্ধে। চুনকালি মেখে দিলেন বঙ্গবন্ধুর অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশের মুখে! আশা করি, শিগগিরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের তদন্তে আসল সত্য উঠে আসবে। বিষয়টা খুবই ব্যথিত করেছে, এমনকী নিজের অস্তিত্বকে পর্যন্ত! সবসময়ই কট্টর ও উগ্র সামপ্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছি। বারবার হুমকির মুখে পড়েছি। কিন্তু অন্তিমে এসে গোষ্ঠী বিশেষের কদর্য মুখোশ এভাবে খুলে পড়বে, কল্পনা দূরে থাক, দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।
(?)
এমনিতে ভাইরাল জ্বরে ভুগছি। বমি বমি ভাবও। রাজনীতির দূষণ, নেতা, ন্যাতা, তথাকথিত ভিআইপি, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবীর সুবচন শুনলে বমির উদগার আরো বেড়ে যায়। ক’দিন আগে দীর্ঘ দেড় যুগের নিকট প্রতিবেশি সাবেক রেল কর্মকর্তা এস এম হারুন সাহেব পরিণত বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তিনি নগর আওয়ামী যুবলীগের আহবায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চুর বাবা। মরহুম মহিউদ্দিন ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় বাচ্চু সাহেব খুবই শ্রদ্ধা করেন। এ’ যুগের প্রভাবশালী নেতাদের সাথে যা কোনভাবেই মেলেনা। কাছাকাছি থাকলেও তাই দূরত্ব বজায় রাখি। জ্বর নিয়েও হারুন সাহেবকে শেষবারের মতো দেখে আসি। তিনি খুবই পরহেজগার, বিনয়ী এবং দানশীল ছিলেন। ওনার বাসায় উঠার সময় পার্কিং লটে প্রচুর মানুষের ভিড়। বাচ্চু সাহেবের সাথে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা, প্রিয়ভাজন সেলিম, আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, মান্নান ফেরদৌসসহ অনেকে। ওরা যথেষ্ট সম্মান দেখায়। দুঃসময়ের রাজনীতিকালীন স্বচ্ছতা ও নিবেদন, অন্তত প্রাপ্তির এই রেশটুকু ধরে রেখেছে।
শুক্রবার সকালে মুক্তিযুদ্ধের সাহসী এক সহযোদ্ধা জহুর আহমদ আসেন বাসায়। তিনি জহুর মাষ্টার নামে ধলই ইউনিয়নে একনামে পরিচিত। ওনার চেহারার ক্লিষ্টতা দেখে বুকটা হু হু করে ওঠে। ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। ড্রয়িং রুমে ঢোকার সাথে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ওনার বড় মেয়েটা মাষ্টার্স করেছে। ভাল পাত্রে বিয়েও দিয়েছেন। দুর্ভাগ্য, এক সন্তানের জননী ঢাকায় অবস্থানরত মেয়েটার ব্রেস্ট ক্যান্সার! ভুগছে অনেক দিন। তিনি দু’বছর আগে আমার সাথে বন্ধু অধ্যাপক মোঃ মঈনুদ্দিন সাহেবের পরামর্শে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই ফরম পূরণ করেন। রূপালী ও জনতা ব্যাঙ্কের সাবেক পরিচালক ও উত্তর জেলা আ’ লীগের সহসভাপতি মঈনুদ্দিন সাহেব হাটহাজারী উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির প্রধান ছিলেন। পরে কমিটি নিয়ে মামলা, মোকদ্দমার গেড়োয় কাজটা আর শেষ হয়নি। এখন পুরো দেশের বাছাই প্রক্রিয়াও নাকি ঝুলছে। জহুর মাষ্টার খোঁজ খবর নিলেও ইতিবাচক কিছু জানাতে পারিনি।আসলে খবরও রাখিনা। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের সুফল মহল বিশেষের গোলায়। গ্রামগঞ্জের বহু অসম সাহসী যোদ্ধার নাম তালিকায় নেই। এঁরা সবাই ভুগছেন। জহুর মাষ্টারের বিশ্বাস ছিল, তালিকায় নাম উঠলে এককালীন কিছু বকেয়া ভাতা পাবেন। মেয়ের ব্যায়বহুল চিকিৎসায় সহযোগিতা দেবেন। আধা বেকার ছেলেটারও কিছু একটা হবে। হায়রে নষ্ট সময়ের সুখস্বপ্ন! মঈনুদ্দিন ভাইয়ের কাছে গিয়েও কোন ভরসা পাননি। আমিতো জানি, এঁদের অবদান। রাজনীতিতে যুক্ত করি ভয়াল দিনগুলোতে। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্পাদকীয় বোর্ডে ছিলেন। নিজেদের গড়া বেসরকারি এনায়েতপুর প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। পরে স্কুলটি সরকারীকরণ হয়। গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী মানুষটি ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচনও করেন। ছেড়ে দেন শিক্ষকতা। মাত্র কয়েক ভোটের ব্যাবধানে হেরে যান। রাগ করে গ্রাম ছেড়ে খাগড়াছড়ি পাড়ি জমান। আগাগোড়া স্পষ্টবাদী ও সৎ তিনি। কিন্তু সততাতো এখন বইয়ের পৃষ্ঠায়! ব্যবসায়ে মার খেয়ে শহরে বাদুরতলায় বাসা নেন। কঠিন রোগে মারা যান স্ত্রী। তিন মেয়ে ও একমাত্র পুত্রের বড় সংসার। বড় মেয়ের অসুস্থতা তাঁকে পাগল করে দিয়েছে। পুত্রও ভাল অবস্থানে নেই। মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বড় দরকার তাঁর। শুধু তাঁর না, আরো অনেক সশস্ত্র যোদ্ধার। যারা দেশ মাতৃকার জন্য সব দিয়েও কিছুই পাননি। কেন এমন হচ্ছে? জহুর মাষ্টারদের মত দেশ ও দলের জন্য নিবেদিত সৈনিকেরা জীবন যুদ্ধে হেরে কী তাদের সর্বস্ব ত্যাগের মূল্য শুধবেন! কেন?

x