ডিজিটাল চট্টগ্রাম গড়তে ফোরজি ও আইওটিতে গুরুত্ব দিচ্ছে গ্রামীণফোন

দৈনিক আজাদীর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে মাইকেল ফোলি

শনিবার , ২০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ
190

মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের এদেশে গ্রাহক রয়েছে সাত কোটি চল্লিশ লাখ। ১৯৯৭ সালের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চে কার্যক্রম শুরু করে গ্রামীণফোনই প্রথম দেশে জিএসএম প্রযুক্তির সূচনা করে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত মোবাইল অপারেটরটি দেশের ৯৯ ভাগ এলাকায় তার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কের অবকাঠামো উন্নয়নে ৩৪ হাজার ৭শ’ কোটিরও বেশি টাকা বিনিয়োগ করেছে, পরিণত হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় করদাতা প্রতিষ্ঠানের একটিতে। গত বছর ফোরজি প্রযুক্তি চালু করার পর এখন প্রস্তুতিমূলক কাজ করছে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) নিয়ে। দেশের এগিয়ে চলার পাশাপাশি প্রযুক্তি জগতে গ্রামীণফোনের অগ্রযাত্রার এ চিত্র দৈনিক আজাদী’র প্রবীর বড়ুয়া’র কাছে তুলে ধরেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী (সিইও) মাইকেল ফোলি।
আজাদী : গ্রামীণফোন বাংলাদেশে ফোরজি চালু করেছে প্রায় ১৪ মাস হতে চললো। চট্টগ্রাম থেকে আপনারা কেমন সাড়া পেয়েছেন?
মাইকেল ফোলি : চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী, শিল্পের রাজধানী এবং সমুদ্রবন্দরও চট্টগ্রামেই। এ খাতগুলোর আরো উন্নতির জন্য প্রয়োজন উচ্চগতির ডাটা ট্রান্সফার সুবিধা যা ফিক্সড ফোন লাইনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। আমরা প্রায় সবকিছুই করতে চাই ফোরজি কিংবা ফাইভজির মাধ্যমে। শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানেরই নয় অন্যান্য মোবাইল অপারেটরদেরও এ প্রযুক্তির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রামের গ্রাহকরা ফোরজির ব্যাপারে বেশ ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ ভাগ গ্রাহক তাদের থ্রিজি সিম পাল্টিয়ে ফোরজি সিম নিয়েছেন। তাই, আমরা চট্টগ্রামকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
বিশ্ব অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য বাংলাদেশকে প্রযুক্তির ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে কেননা বিশ্ব এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে একে অপরের সাথে সংযুক্ত। তাই, বাংলাদেশে যদি সেরা প্রযুক্তি না থাকে তাহলে বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও শিল্পায়নসহ প্রতিটি ব্যাপারেই বাংলাদেশকে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। ২০০৯ সালে, বিশ্বব্যাপী থ্রিজি চালু হওয়ার ১১ বছর এবং ফোরজি চালুর এক বছর পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশে গ্রামীণফোন থ্রিজি সেবা নিয়ে আসে ২০১৩ সালে যা বিশ্বে চালু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। থ্রিজি থেকে ফোরজিতে উন্নীত হতে বাংলাদেশের লেগেছে ৫ বছর যেখানে বাকি বিশ্বের লেগেছে প্রায় ২০ বছর। আমি বলতে পারি বাংলাদেশ বিশেষ করে চট্টগ্রামের মতো শিল্পাঞ্চল ডিজিটালকরণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
আজাদী : চট্টগ্রামে এবং পুরো দেশে ফোরজি প্রযুক্তি সমপ্রসারণে গ্রামীণফোন কী উদ্যোগ নিয়েছে?
মাইকেল ফোলি : সারাদেশে আমাদের এখন সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি ফোরজি সাইট আছে। মোট সাইট আছে প্রায় ১৫ হাজার। সুতরাং, এই ১৫ হাজার সাইটের মধ্যে অনেক সাইট হয় থ্রিজি নয়ত ফোরজি অথবা দুটোই। এগুলোর মধ্যে ৫৪৫টি সাইট আছে চট্টগ্রামে যে সংখ্যাকে আমরা এ বছর দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছি। এর ফলে, চট্টগ্রামের মানুষ আরও শক্তিশালী নেটওয়ার্কে ফোরজি সেবা পাবেন। তাছাড়া, আমরা সারাদেশের সাড়ে ৫ হাজার ফোরজি সাইটকে ১০ হাজারে উন্নীত করারও পরিকল্পনা করছি। আমাদের গ্রাহকদের মধ্যে থ্রিজি থেকে ফোরজিতে রূপান্তরের গতিও কিন্তু কম নয়। আমরা যখনই কোনো সাইট চালু করেছি তখনই দেখেছি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ৪৫ ভাগ গ্রাহক ফোরজি সেবা নিতে শুরু করেছেন। তার মানে হলো আমাদের গ্রাহকরা বেশ দ্রুত অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য গতিতে থ্রিজি থেকে ফোরজিতে চলে আসছেন। ফোরজির বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি একটি দারুণ ঘটনা। আমরা আমাদের গ্রাহকদের ধন্যবাদ দিতে চাই ফোরজিতে ইন্টারনেট অভিজ্ঞতা নেয়ার জন্য। আমরা বিগত ১৪ মাসে ১ কোটি ফোরজি গ্রাহক পেয়েছি। বিশ্বের কোনো দেশেই এতো গ্রাহক এতো কম সময়ে ফোরজি সেবা গ্রহণ করেনি।
আজাদী : গ্রাহকসেবা বাড়াতে গ্রামীণফোন ভবিষ্যতে কি ধরনের বিনিয়োগের চিন্তাভাবনা করছে?
মাইকেল ফোলি : আমি ইতোমধ্যেই বলেছি যে আমরা আমাদের সাইটের সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে কাজ করছি। কিন্তু এটি খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। এতে আইনগত অনেক ব্যাপার আছে এবং এটি সময়সাপেক্ষ। তারপরও টাওয়ারের সংখ্যা বাড়াতে আমরা বিশেষ অনুমতির জন্য আবেদন করেছি। আমরা অবকাঠামো উন্নয়ন করছি। তাছাড়া, ফোরজির সাথে ইন্টারনেট অভ থিংসের (আইওটি) একটি গভীর সম্পর্ক আছে। চট্টগ্রামে এর অবকাঠামো উন্নয়নে গ্রামীণফোন উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করবে।

আজাদী : চট্টগ্রামে ব্যবসায়িক কী বাধা আছে বলে আপনি মনে করেন?
মাইকেল ফোলি : আমাদের অর্থনৈতিক বা কারিগরি কোনো বাধা নেই। চট্টগ্রামে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও আমাদের ব্যবসা বৃদ্ধিতে তেমন একটা বাধা আছে বলে আমি মনে করি না। এখানে আসল বিষয়টি হলো মূল ব্যাপারে দৃষ্টি দেয়া। ব্যবসা সমপ্রসারণে আমাদের মূল বাধা এখানে নয়। আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে ফোরজি মোবাইল ফোন সেট আমদানি ও তৈরির ব্যাপারে। এখনও দেশে ফোরজি হ্যান্ডসেট বেশ দামি এবং গ্রাহকদের কাছে সহজলভ্য নয়। সুখবর হলো সিম্ফনি ও ওয়ালটনের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট তৈরি করছে। আমরা চাই, তারা যেন টুজি হ্যান্ডসেট তৈরি না করে ফোরজি হ্যান্ডসেট তৈরিতে বেশি মনোযোগী হয়। দেশে যদি ফোরজি হ্যান্ডসেট তৈরি হয় তাহলে এর নির্মাতারা আমদানি শুল্ক না দেয়ার কারণে হ্যান্ডসেটের দাম কম পড়তে পারে। কারণ আমাদের পক্ষে টুজি, থ্রিজি, ফোরজি ও ফাইভজি সবরকমের সেবা দেয়া অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। ফোরজি হ্যান্ডসেটের দাম কমে আসলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজটি অনেকটা সহজ হয়ে আসবে। মোবাইল অপারেশনে আরেকটি বাধা হলো টাওয়ার নির্মাণের ক্ষেত্রে নীতিমালা। কোন টাওয়ার কোথায় এবং কেমন খরচে কীভাবে নির্মিত হবে সেই ব্যাপারে পরিষ্কার নীতিমালা থাকতে হবে।
আজাদী : ইন্টারনেট অভ থিংসের (আইওটি) ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
মাইকেল ফোলি: মাইক্রোসার্কিটের শক্তির ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। তাই, আপনি এখন একটি ছোট ব্যাটারি একটি সেন্সরের মধ্যে দিয়ে ১০ বছর চালিয়ে দিতে পারেন। এর মধ্যে আপনার ব্যাটারি পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজনই নেই। আর সেই সেন্সরটির ডাটা প্রেরণ করতে বেশি ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন হবে না। এটি খুব দ্রুত হওয়ার প্রয়োজন নেই। এটি হলো এক ধরনের আইওটি। আর অন্য আরেকটি ধরন হলো দ্রুতগতির। যখন আপনি কোনো গাড়িকে নিয়ন্ত্রণ করবেন কিংবা সূক্ষ্ম সার্জারি করার প্রয়োজন হবে। আইওটির কারণে দেখা যাবে প্রতি বর্গকিলোমিটারে লাখ লাখ ডিভাইস ব্যবহৃত হবে অর্থাৎ এ জায়গার মধ্যে ১০ টেরাবাইট ডাটা ট্রান্সফার করার প্রয়োজন হয়ে পড়বে। ফলে, অনেক ধরনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। আর আইওটির গুরুত্ব এখানে যেমন থাকবে তেমনি থাকবে কানাডার মতো উন্নত দেশেও। তবে, এটি এদেশে বৃদ্ধি পাবে সেই উন্নত দেশগুলোর চেয়ে দ্রুত কারণ এখানে নতুন অবকাঠামো তৈরির সময় আগের কোনো অবকাঠামোকে বাদ দিতে হবে না যেটা করতে হবে উন্নত দেশগুলোতে।
আইওটি এদেশে খুব দ্রুতই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে কারণ এটি হবে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য। আমরা আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়েছি। আমরা ইতোমধ্যে সীমিত এলাকায় ন্যারোব্যান্ড আইওটি সেবা দেয়া শুরু করেছি। আমরা চট্টগ্রামসহ সারাদেশে প্রায় ২ হাজার সাইট থেকে আইওটি সেবা দিচ্ছি। উদাহরণস্বরূপ, এখন ঢাকা উত্তরে পুলিশ আইওটি ডিভাইস ব্যবহার করছে যেগুলোর মাধ্যমে জনগণ তাদের ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় জরিমানা দিতে পারবেন। নগদ টাকার লেনদেন না থাকার ফলে দুর্নীতি অনেকটা কমে আসবে এবং পুলিশকেও কোনো ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে না। ঘুষের বিষয়টি না আসার ফলে প্রাপ্য অর্থ নির্বিঘ্নে জমা হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। এটি দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পুরো ব্যাপারটি বেশ ব্যয়বহুল হলেও আমরা মনে করি এটি ফাইভজি চালুর ক্ষেত্রে পূর্ব পদক্ষেপ। আইওটির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করতে গিয়ে ফাইভজির জন্যও অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়ে যাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো একজন ব্যবহারকারীর কাছে আইওটি থাকবে অদৃশ্য। তিনি যে এটি ব্যবহার করছেন তা বুঝতেই পারবেন না কারণ আইওটি ফোনের মধ্যেই বসানো থাকবে অর্থাৎ আপনার ফোন থেকে ধীরে ধীরে সিমটি অদৃশ্য হয়ে যাবে।
আজাদী : আইওটির ব্যাপারে চট্টগ্রামের মানুষ কেমন সাড়া দেবে বলে আপনি মনে করেন?
মাইকেল ফোলি : সর্বপ্রথমে আমি মনে করি চট্টগ্রাম হলো দেশের ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র। আমাদের কোম্পানির সবার কাজ হলো গ্রাহকদের কাছে প্রতিযোগিতামূলক সেবা দেয়া যেটা আমরা সারাবিশ্বে করছি। আমরা শুধু মিনিট ও মেগাবাইট বিক্রি করি না, আমরা আমাদের গ্রাহকদের ডিজিটাল বিশ্বের সাথে সংযুক্ত করি। যদি আমরা সেই মূল্যবোধকে তুলে ধরতে পারি তাহলে আরো বেশি গ্রাহক আমাদের প্রতি আকৃষ্ট হবেন, তারা ‘কিছু সম্পর্ক চিরকালের’ মতোই আমাদের সাথেই থাকবেন।

x