ডা. সাজিয়া আফরিন (সাফল্যবান আর মূল্যবান)

বৃহস্পতিবার , ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৬:৫০ পূর্বাহ্ণ
157

বাল্যশিক্ষা বইতে ছোটবেলায় পড়েছিলাম —“আপনারে বড় বলে বড় সেই নয়/ লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়।কথাগুলো প্রতি পরতে পরতে সত্য। তবে বুঝতে হবে, কেবল পড়ার জন্য পড়লাম তাহলে তো হলোনা। যোগ্যতা সবাই জন্মের সময় নিয়ে আসেনা, সৃষ্টিকর্তা সবাইকে সবটা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান না। কেউ পরিশ্রম করে যোগ্যতা অর্জন করে,আবার কেউ সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত গুণ নিয়েই পৃথিবীতে আসে। কিন্তু ব্যাপার হলো, জিনিসটা ধরে রাখতে হবে সেটা যেভাবেই পাওয়া যাক না কেনো! নিজেকে বড় প্রমাণ করতে গিয়ে হাস্যকর বানিয়ে ফেলাটা বড্ড করুণ। অনুকরণে কিছুই ফল লাভ হয়না। নিজেকে এবং নিজের কর্মকে সুন্দর করে তোলার জন্য, দশজনের কাছে আকর্ষণীয় করার জন্য যা দরকার তার প্রথম ধাপ হলো নিজের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলা, নিজের কাজের প্রতি মনোযোগী হওয়া। যে গুণ বা যে যোগ্যতা আমার মাঝে আছে,তাকে শান দেওয়া। অনভ্যাসে কর্মক্ষমতাতেও মরচে ধরতে পারে বৈ কি! লোকজনের কাছে নিজেকে জাহির করতে গিয়ে নিজেকে হাস্যকর করে তোলা কি খুব জরুরি? কেনো মানুষ বুঝেনা তার সীমা কতদূর হওয়া উচিত!কতটুকু পর্যন্ত গেলে একটা রসিকতা তার সীমায় থাকে আর কতটুকু অতিক্রম করলে তাকে ভাঁড়ামি বলা হয়! নিজেকে জাহির করাতে আসলে মজাটা কি! আমার যদি যোগ্যতা থাকে, তাহলে তা লোকে জানবেই, জানতেই হবে। বর্তমান যে যুগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সব ছড়িয়ে যায়, সবার সবকিছুই অনোক লোকের চোখে পড়ে, ভালোটা মন্দটা যাচাই করা যায় কয়েক মুহূর্তের মাঝে। আগেকার দিনে প্রতিভা থাকলেও তা জায়গামত বিকশিত হতে সময় লেগে যেতো, কিন্তু বিকশিত হতো ঠিকই, সময় যতোই লাগুক, প্রতিভা কখনো ছাই এ চাপা পড়েনা। আর এ যুগ তো ডিজিটাল যুগ, রকেটের গতিতে সব ছড়িয়ে পড়ে, তৈরি হয়ে যায় ফেসবুক সেলেব, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার তার। তা ভালো খুব কম সময়ে কারো ভাবনা, কারো মত, কারো সৃষ্টি পৌঁছে যাচ্ছে তাদের গুণগ্রাহীর কাছে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবতে হবে দায়িত্ব বেড়ে যাচ্ছে, অনেকখানি দায়িত্ব কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে। এতো লোকে যখন কাউকে ফলো করে, তাদের প্রতিও কিন্তু যথাযথ দায়িত্ব তাকে পালন করতে হবে। এমন কোন বার্তা যেনো তার দ্বারা লোকজনের মাঝে না পৌঁছায়, যা কিনা বড্ড অমূলক, সস্তা কিংবা মানহীন। অন্য দশজন যখন আমাকে অনুসরণ করবে, আমার পদক্ষেপ অনুসরণ করবে, তখন নিশ্চয় আমাকে সেভাবেই অনুসরণীয় করে তুলতে হবে নিজেকে, নিজের জায়গা নিজেকেই ধরে রাখতে হবে। এমন কোন কর্মকান্ড যেনো না হয়ে উঠে যাতে করে বিরক্তি তৈরি হয়, লোকে মুখ লুকিয়ে হাসে। হাজার হাজার ফলোয়ার বা অনুসরণকারী দেখে আনন্দে আটখানা হওয়ার মতো কিছু নেই। সব অনুসরণকারী আপনার ভক্ত কিন্তু না, কেউ কেউ বসেই আছে আপনার একটা ভুল পদক্ষেপের জন্য। নিজেকে নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে কিছু একটা বা কেউ একজন হতে চাওয়াটা নিতান্তই হাস্যকর নয় কি! তাতে করে নিজেকে পণ্য হিসেবে গণনা করা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। যতো অখাদ্যই হোক না কেনো, একজন কেতাদুরস্ত মডেল এনে একটা ভালো বিজ্ঞাপন নামিয়ে দিলেই চলবে, লোকে খাবে। শিল্পী, কবি, লেখক কিংবা যে কোন সৃষ্টিশীল ব্যক্তি যদি নিজেকে পণ্য ভাবতে শুরু করেন,এরচেয়ে দুঃখজনক আর কি বা হতে পারে! পরিচিতির পেছনে হন্যে হয়ে ছুটে লাভ নেই। প্রতিভা থাকলে তা প্রকাশ পাবেই, সেটা আজ হোক কিংবা কাল।তার জন্য নিজেকে পন্য করে তোলার যৌক্তিকতা নেই।কিছুটা ভাবাবেগ যথেষ্টই জরুরি একজন সৃষ্টিশীল ব্যক্তির জন্য;সৃষ্টি যার হাতে হয়,সে হবে কিছুটা খামখেয়ালি, জাগতিক ভাবনা নিয়ে মাথাব্যথা কি তার সাধে! প্রতিভা এমন এক রত্ন যাকে প্রতিনিয়ত শান দিতে হয়,নিজেকে প্রতিভাবান মনে করে তাতে ধূলো জমতে দিয়ে সাফল্য লাভের পেছনে দৌড়ে কোন লাভ কি আদৌ হয়! নিজেকে করে তুলতে হবে যোগ্য, মূল্যবান। আর এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের এ উক্তিটি যথার্থ —“সাফল্যবান মানুষ না হয়ে বরং মূল্যবান মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

x