ডায়াবেটিস থাকবে হাতের মুঠোয়

মো. মুজিবুল হক শ্যামল

শনিবার , ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ
362

১৪ নভেম্বর পালিত হল বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ডায়াবেটিস প্রতি পরিবারের জন্য উদ্বেগ’। আমরা এখন মোবাইল ছাড়া যেমন এক মুহূর্ত চলতে ও থাকতে পারি না, ঠিক তেমনি ডায়াবেটিস, ব্লাড গ্লুকোজ মিটার (সিবিজি) ক্যাপিলারি ব্লাড গ্লুকোজ/মাপক ডিবাইচ (ডায়াবেটিস নির্ণয়করণ যন্ত্র) টি ছাড়াও কোন পরিবার চলতে পারে না। মোবাইলের টাচ স্ক্রিন/বাটনকে আমাদের নিজের আয়ত্বে রাখতে পারলেও ডায়াবেটিস নামক রোগের সিবিজি’র বাটনকে আমরা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারিনি। ডায়াবেটিস রোগের লক্ষণের জন্য সকলের ঘরে ঘরে মোবাইলের মতো সিবিজি শোভা পাচ্ছে, এসময় মোবাইল হাতে হাতে আর সিবিজি ঘরে ঘরে পাওয়া যাচ্ছে। এই দু’টি যন্ত্রের মাঝে কেমন যেন ভালো একটি মিল খুঁজে পাচ্ছি আমি। ডায়াবেটিসের ভয়াবহ অবস্থার কথা নতুন করে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রোগটি বর্তমানে বিশ্বজুড়েই মহামারী আকার ধারণ লাভ করেছে। আমাদের দেশেও এমন কোন পরিবার নেই, যে পরিবারে এক বা একাধিক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি নেই। ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র এমন এক রোগ, যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভল হলেও রোগীর কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু যদি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না হয় তা হলে এ রোগের সঙ্গে দেখা দেয় অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা রোগীর জন্য অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। প্রতি বছরের মতো এ বছরও যথাযথ মর্যাদা, আনুষ্ঠিকভাবে আমাদের দেশে ও বিশ্ব জুড়ে এ দিবসটি পালন করা হবে। যতই দিবসের গুরুত্ব পালন করা হোক না কেন ডায়াবেটিস এখনও কি- এ রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে বা প্রতিরোধ করা সম্ভব, আসলে এই প্রশ্ন থেকেই যায়। আজ থেকে বোধ হয় পাঁচ বছর আগে একটি জরিপ করা হয়, দেশের জনসংখ্যার সাত শতাংশ লোকের ডায়াবেটিস রয়েছে, বর্তমানে সেটি প্রায় প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জনের। ডায়াবেটিস রোগ আছে কিনা, সেটি দেখতে হলে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। সকলেই এটি জানে – একটি হলো খালি পেটে, আরেকটি হলো ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার পরে। দুটি স্যাম্পল নিয়ে আমরা পরীক্ষা করে বলে দিতে পারি ডায়াবেটিস আছে কিনা। বর্তমানে আমেরিকা এসোসিয়েশন থেকে নতুন আরেকটি পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। এটি হলো হিমোগ্লোবিন এওয়ানসি, এটি একটি নতুন টেস্ট পদ্ধতি। এতে গত চার মাসের রক্তের শর্করার গড় পরীক্ষা করা হয়। এই গড় যদি ছয় দশমিক পাঁচ ভাগের উপরে থাকে, তাহলে তার ডায়াবেটিস হয়েছে বলে ধরা হয়। দেশের সব মানুষের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এটি রির্পোটে বললেও আমার মতে মনে হয় আরো বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত আমাদের দেশে। আজ আপনার ডায়াবেটিস নেই বলে কিছুদিন পরে হবে না এমন আপনি নিশ্চত বলতে পারবেন না। তাই আপনাকে আগাম সচেতন হয়ে জীবন গড়ে তুলতে হবে। প্রতিনিয়ত আপনি মোটিভেটেড বা একটিভ থাকতে হবে। আগে থেকে আপনি ফিজিক্যাল একটিভিটিতে থাকতে পারলে আপনি ডায়াবেটিস থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকতে পারবেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ ব্যাপারে আমাদের দেশের অধিকাংশ ডাক্তাররা আগে বা পরে হলেও এধরনের রোগীদের ফিজিওথেরাপি নিতে সাজেস করেন না বা জিমে গিয়ে ব্যায়াম করতে বলেন না, শুধুমাত্র হাঁটতে বলেন। সবাই বলে আমি- প্রতিদিন হাঁটছি, ব্যায়াম বা ওষুধ খাচ্ছি, খাবারও কম করে খাচ্ছি কিন্তু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না। অনেকের শরীরের বিভিন্ন পেশিতে ব্যথাও কমাতে পারছেন না।

নিয়মতান্ত্রিক খাবার-দাবার

ডায়াবেটিস রোগীদের খাবার-দাবারের ক্ষেত্রে যত কথা বা নিদের্শনা এবং সর্বোপরি নিষেধাজ্ঞা বহাল করা করা হোক না কেন, তাঁরা খাবারের ডায়েটিং মানতে পারেন না। ঘরে বা বাইরে, দাওয়াতে সবখানে মুখখানা সামলাতে পারেন না। টেবিলে বসার সময় বলেন খাব না, আমি কিছু খাই না। কিন্তু টেবিলে বসার পর হচ্ছে তার উল্টো। তাই বলছি সব ডায়াবেটিস রোগীরাই ভাত খেতে পারবেন, তবে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে (এক কাপের বেশি নয়)। সাদা চালের ভাতের থেকে লাল বা বাদামি চালের ভাত উপকারী (লাল চাল’কে আমাদের দেশে আউস ধানের চাল বলে)। কারণ সাদা চাল পলিশ করা হয়, এই পলিশ করার প্রক্রিয়ায় চাল তার পুষ্টিগুণ হারায়। সাদা চালের ভাতে স্টার্চ (হজমের উপযোগী শর্করা) বেশি থাকে, তাই সহজেই হজম হয়। অন্যদিকে বাদামি কিংবা লাল চালের ভাতে থাকে বিভিন্ন মিনারেল, ভিটামিন ও ফাইবার ফলে হজম হতে সময় লাগে। তবে এই চাল মেশিনে ভাঙাবিহীন হলে বেশি ভাল। বাদামি চালের ভাতের ‘গ্লাইসেমিক ইনডেক্স’র (গ্লাইসেমিক ইনডেঙ হল খাবার পেটে যাওয়ার পর রক্তে মিশে গিয়ে ঠিক কি হারে রক্তের সুগার বাড়িয়ে দেয়, তারই ইনডেক্স বা সূচক) (এষুপবসরপ রহফবী) মাত্রা ৬৮ আর সাদা চালের ভাতের ৭৩। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বেসনের আটা কিংবা “হোল গ্রেইন হুইটা’র রুটি সব থেকে উপকারি। ভাতের ক্ষেত্রে বাদামি বা লাল চালের ভাত পরিমাণ মতো খেতে পারেন। সাদা চালের ভাতের ‘গ্লাইসেমিন ইনডেক্স’র (এষুপবসরপ রহফবী) মাত্রা সবচাইতে বেশি, তাই এটি এড়িয়ে চলুন। একজন ডায়াবেটিস রোগী ভাত কিংবা রুটি-দুটোই খেতে পারেন। তবে পুষ্টিবিদ বলছে-পরিশোধিত চাল ও আটার চাইতে বাদামি চাল ও অপরিশোধিত গমের আটা কিংবা বেসনের রুটি ডায়াবেটিসদের জন্য উপযুক্ত। অনেকে আবার বলতে পারেন লাল চাল পাব কোথায়, কীভাবে কিনবো ইত্যাদি। লাল চাল বর্তমানে বড় সুপার সপগুলোতে পাওয়া যায়। আপনার মূল্যবাদ শরীরটার জন্য হয়তো কিছুটা কষ্ট করবেন।
ডায়াবেটিস রোগীরা যেসব খাবার কে ‘না’ বলবেন। সাদা চালের ভাত, ব্লেন্ডেড কপি, কিসমিস, তরমুজ, আলু, আম, চাইনিজ খাবার, পেষ্ট্রি, পূর্ণ ননীযক্ত দুধ, ফলের জুস, ফ্রেন্স ফ্রাই। আর কিছুং খাবার আছে যেগুলো খেলে আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে – করলা, সবুজ শাক-সবজি, কুমড়ার বীজ।

ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপি

ব্যায়ামকে বলা হয় ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার লবণ। লবণ না দিলে যেমন খাবারে স্বাদ হয় না, তেমনি ব্যায়াম না করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ হয় না। এটাকে মহৌষধও বলতে পারেন। একজন ডায়াবেটিসের রোগীর যদি আমৃত্যু ব্যায়াম করার শক্তি থাকে, তাহলে সারা জীবন তাকে ব্যায়ামের মধ্যে থাকতে হবে। আমাদের দেশের প্রতি ঘরে ঘরে এই রোগী থাকার পরও কোন রোগী জিমে গিয়ে ব্যায়াম করেন এমন মানুষ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ডায়াবেটিস রোগীরা যদি জিমে গিয়ে ব্যায়াম করেন তবে হাঁটা ব্যায়াম থেকে বেশি উপকার পাবেন। কারণ জিমে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষক থাকাতে একটি গাইডলাইনে ভাল করে ব্যায়াম করতে পারবেন। এছাড়া ডায়াবেটিস রোগীদের ডাক্তার হাঁটতে বলেন কিন্তু তাঁরা বেশিরভাগ রোগীই ধীর গতিতে হাঁটেন আসলে এটি তাঁদের স্বাস্থ্যের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনতে তেমন উপকার করে না। তাই আজ থেকে নিজেকে তৈরি করুন এবং শুরু করে দিন। ডায়াবেটিসের জন্য ব্যায়াম হলো দ্রুত হাঁটা। হাঁটা হতে হবে অন্তুত দিনে পরিশ্রম সহকারে ৩০ মিনিট, সপ্তাহে কমপক্ষে পাঁচ দিন। প্রতি ১০ মিনিটে এক কিলোমিটার হাঁটতে হবে। এবং প্রতি মিনিটে ১০০ কদম দেওয়ার চেষ্টা করুন। এভাবে আপনি ১০০০ কদম দিতে হবে, প্রথম দিকে হয়তো একটু কষ্ট হবে। তবে হাঁটতে হাঁটতে দেখবেন একসময় হয়ে গেছে, তবে হাঁটা থামাবেন না। বাইরে হাঁটতে না চাইলে রানিং মেশিনে হাঁটতে পারেন। মেশিন দু’ধরনের আছে- একটি মেনোয়েল ও ইলেট্‌্িরক, সবাই অবশ্যই ইলেকট্রিক রানিং মেশিন ব্যবহার করবেন। এ রোগ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায় হলো নিয়মিত ব্যায়াম করা। ব্যায়াম করতে না পারলে শুধু ওষুধ সেবনের মাধ্যমে ডায়াবেটিসের পাশাপশি বিভিন্ন ধরনের হাড়ের ক্ষয়জনিত ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, কোমর ব্যথা, ঘাড় ব্যথা বা কাঁধ ব্যথায় ভুগছেন, তাদের বেশিরভাগই সঠিকভাবে ফিজিওথেরাপি, ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম করতে পারেন না, উৎসাহিত হয়ে কখনও করেন না, এবং সর্বোপরি উদাসীনতা করেন। ফলে ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। এতে রোগীর শরীরে ক্রমে ওষুধ রেসিস্ট্যান্স হয়ে যায়। ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করতে হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন মোটেও সুখর কোনো ব্যাপার নয়। বরং এটি শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যথানাশক ওষুধের কারণে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন লিভার, কিডনি ইত্যাদি মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ডায়াবেটিস রোগীর ব্যথা বেদনা নিরাময়ে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা একটি আদর্শ, আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি ও এটি নিরাপদও বটে। এ চিকিৎসা পদ্ধতিতে এঙপার্ট ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর সমস্যা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ইলেক্টো-থেরাপিউটিক এজেন্ট, থেরাপিউটিক এঙারসাইজ বা ব্যায়াম, নানা ধরনের ম্যানুয়াল থেরাপি বা ম্যানুপুলেট থেরাপির মাধ্যমে ব্যথা কমাতে সাহায্য করেন। ফলে ডায়াবেটিক রোগী আবারও ফিজিক্যাল এঙাসাইজ বা ব্যায়ামগুলো করতে পারেন এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হোন।

ওষুধপত্র

আমেরিকান ডায়াবেটিস এসোসিয়েশনের মতে ডায়াবেটিস রোগীর জন্য এসপারটেন, সুক্রালোজ ইত্যাদি কৃত্রিম মিষ্টির অনুমোদন দিয়েছে। যে খাবার খেয়ে ডায়াবেটিস রোগী ডাক্তারের পরামর্শমতে ব্যায়ামের মাধ্যমে কিংবা ব্যায়াম ও ওষুধের মাধ্যমে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে পারবেন এবং পাবেন প্রয়োজনীয় ক্যালরি সেটাই হবে আসল ডায়াবেটিক খাবার। সেই সাথে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে রক্তের তেল-চর্বির মাত্রাও। অনেকের হয়তো প্রথম দিকে দেখা যায় এই খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়াম দিয়ে ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অনেকে রকমের ওষুধ বাজারে প্রচলিত আছে। তবে যেমন ঔষধ বেশি ব্যবহার করে সালফোনাইলিউরিয়া। তবে এগুলো এখন উঠে যাচ্ছে। কেননা এগুলোর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। মেটফরমিন অনেক পুরানো ওষুধ। এছাড়া জিএলপি অ্যানালগ, ফরডিপিপি, ইনহিবিটরস এগুলো এখন আশাপ্রদ ওষুধ। নতুন কিছু ওষুধ এসেছে এসজিএলটিটু ইনহিবিটরস। এগুলো আমাদের বাজারেও চলে এসেছে। এগুলো ভালো, এগুলো মুখে খাওয়ার ওষুধের সঙ্গে আমরা যোগ করতে পারি। যেকোন ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎকের পরামর্শ নিন।

x