ডানামেলা পাখিদের নানা কথা

সাঈদুল আরেফীন

বৃহস্পতিবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ
13

এখন পাখি নিয়ে বাংলাদেশে প্রচুর চর্চা হচ্ছে। হচ্ছে গবেষণা। প্রতিবছর পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে অতিথি পাখিরা ছুটে আসে আমাদের দেশে। বাংলাদেশে পাখি ভালবাসার যেমন আছে তেমনি পাখি নিয়ে গবেষণা করার মানুষেরও অভাব নেই। এই শীত মৌসুমেই বাংলাদেশের হাওড় বাওড় জলাশয়, বড়ো বড়ো বিল এবং হ্রদগুলোতে প্রতিবছর নানা বর্ণের নানা রঙের হরেক প্রজাতির পাখির সমাবেশ ঘটতে থাকে। আমাদের দেশে জাহাংগীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় হলো পাখিদের এমনই এক অভয়ারণ্য। পাখির বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে এখানে সহজেই হাজার হাজার অতিথি পাখি আসতে থাকে। জুলাইয়ের শেষ দিক হতে এবং আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে পরিযায়ী পাখিরা বাংলাদেশে আসার সময়টাকে বেছে নেয়। সচরাচর পাখিদের আগমন অব্যাহত থাকে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত। শীত এলেই জাহাংগীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন পাখি প্রেমীদের ভীড় জমে ওঠে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের পাশাপাশি অনুপম আত্মীয়তায় মেতে ওঠে পাখিরা এই সময়টাতে। পাখিরা তাদের উপযোগী পরিবেশ পায় বলেই হাজার হাজার মাইল দূর থেকে ছুটে আসে প্রকৃতির অতি সন্নিকটে । পরিযায়ী পাখিরা বাংলাদেশের যে প্রান্তেই আসুক না কেন সেটা হয়ে ওঠে একসময় প্রকৃতির অনুপম স্বর্গরাজ্য। এটা প্রকৃতির জন্য ও বয়ে আনে সৌভাগ্য ও অনাবিল সৌন্দর্যের পসরা। প্রকৃতি পিয়াসী মানুষজন নানা নামে ও বর্ণে সাজায় ওই এলাকাকে। খোঁজ করলে দেখা যাবে ,পাখির অবাধ বিচরণের কারণে কোন গ্রাম বা এলাকা পাখিদের গ্রাম বা পাখির রাজ্য নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এরকম অনেক গ্রাম ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সন্ধান এখনো আমাদের দেশে পাওয়া যায়।
আগেই বলেছি আমাদের দেশে পাখিদের কলকাকলি আর কিচির মিচির শব্দে মানুষ হারিয়ে যেতে চায়। আজকাল পাখির সান্নিধ্যে নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজেদের খানিকটা সময় বিলিয়ে দিতে চায় সব মানুষ। পাখি প্রেমীদের জন্য সুখবর হলো, প্রতিবছর মে মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখ বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস পালিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস পালনের কথা আমরা শুনে থাকি। বাংলাদেশে যে ৬৫০ প্রজাতির পাখি অবস্থান করে তা আমরা অনেকেই জানি না। পাখি হলো আমাদের প্রকৃতির বিরাট এক সম্পদ। ক্রমে ক্রমে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের দেশ থেকে পাখিরা হারিয়ে যেতে বসেছে। এজন্যে পাখি ও প্রকৃতি প্রেমীদের ক্ষোভের অন্ত নেই। জানা গেছে,বাংলাদেশে আসা ৩০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির মধ্যে ২৯২ প্রজাতি শীত মৌসুম্‌ে এদেশে অবস্থান করে । বাকি আট প্রজাতির পাখি গ্রীষ্ম মৌসুমের জন্য আসে। কিন্তু শীতে চলে যায়। পরিযায়ী পাখি এদেশে নিয়মিত আসার ফলে এখনো আমাদের দেশে পরিবেশের বিরাট ভারসাম্য রক্ষিত হয়ে আছে। এইসব পাখিদের বিষ্ঠা আমাদের দেশের কৃষি জমির উর্বরতা অনেক বাড়িয়ে দেয়। পাখির বিষ্ঠা মৎস্য,জলজ ও উদ্ভিদের খাবার হিসেবে অত্যন্ত উপকারী। এইসব পরিযায়ী পাখি কৃষিজমিতে বিদ্যমান ক্ষতিকারক নানা উদ্ভিদ বীজ খেয়ে এদেশীয় কৃষকদের উৎপাদন অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। বলা যায় ,জলবায়ু পরিবর্তনের দু:সময়ে ও পাখি আমাদের জন্য পারিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অনেক বেশি উপকারী প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। সারাবিশ্বে কৃষি জমিতে অবাধে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের কারণে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটছে। আর আমাদের দেশে অবাধে বন উজাড়,গাছ কাটা,ভূমি দখল,চর দখল,জলাভূমি ভরাট, নগরায়ণের কারণে বিনষ্ট হতে চলেছে পরিবেশ , প্রতিবেশ। এছাড়াও নদী দূষণই কেবল নয় নদীর পাড় দখল,নদীর মাঝখানে বাঁধ দেয়াসহ নদী তীরবর্তী বিশাল জায়গা দখল করে রাখার ফলে পাখির বিচরণক্ষেত্রগুলো এখন আর নিরাপদ নয়। সেই সাথে একশ্রেণীর রসনাবিলাসী পাখি শিকারীদের কবলে পড়ে বিনষ্ট হয় প্রকৃতির অফুরান সৌন্দর্য। ধ্বংস হয়ে পড়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। কেবল ২০০ থেকে ৫০০ টাকার বিনিময়ে শিকারীরা উচ্চাভিলাষী এইসব নাগরিকদের কাছে প্রকাশ্যে হাটবাজারে বিক্রি করে দেয়। পরিযায়ী পাখিরা মোটেই নিরাপদ নয় এদেশে। কী শিক্ষিত অশিক্ষিত ভদ্রবেশি নাগরিক প্রত্যেকেই এদেশে এখনো অবচেতন মনে অসচেতন হয়ে পাখি শিকার করছে। এ থেকে পরিযায়ী পাখিকে বাঁচাতে পদক্ষেপ নেয়া দরকার। বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইন অনুসারে যে কোন ব্যক্তি পরিযায়ী পাখি শিকার করলে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয়দণ্ডে দন্ডিত হবেন। এরপরেও থেমে নেই পাখি শিকার। কেবল পাখিশিকার রোধ নয় সরকার প্রকৃতিতে পরিযায়ী পাখিকে বিচরণের পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে। এজন্যে সরকারি ভাবে মাঝে মাঝে ঘোষণা দেয়,সারাদেশের নদীগুলোকে বাঁচাতে অবৈধ দখলমুক্ত করে দেশের প্রকৃতিতে নদী ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। সরকারের সে তৎপরতা কিছুদিন বহাল থাকলেও পরে তা আর আলোর মুখ দেখে না। দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের মতো এই বদ্বীপে প্রকৃতিস্নাত চমৎকার পরিবেশ বিদ্যমান থাকাতে পরিযায়ী পাখিগুলো সুদূর সাইবেরিয়া সহ নানা দেশ উপমহাদেশ থেকে ছুটে আসতো। বাংলাদেশের প্রকৃতিতে জাগাতো নতুন স্ফূরণ। পলে পলে তা কমতে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পরাকাষ্ঠা থেকে যেমন আমাদের প্রকৃতিকে বাঁচানো দরকার , তেমনি পরিযায়ী পাখিদের (যা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ) সুন্দর আবাসস্থল বা বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে, সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রকৃতিপ্রেমী সকল নাগরিককে। সচেতনতার মাধ্যমে রোধ করতে হবে অযাচিতভাবে পাখি শিকার। পরিযায়ী পাখিদের জন্য বাংলাদেশ যে সত্যিকার অভয়ারণ্য তা অবশ্যই আমাদের প্রমাণ করতে হবে। ব্যাপক জনসচেতনতাই পারে বাংলাদেশকে পাখিদের অবাধ বিচরণের স্বর্গরাজ্য হিসেবে গড়ে তুলতে।
লেখক: কবি ও গল্পকার

x