ডাকাত মিজানের মুখে ঘটনার বিবরণ

চার নারী ধর্ষণ

আজাদী প্রতিবেদন

বুধবার , ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৩:৪৯ পূর্বাহ্ণ
1056

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শাহমীরপুর গ্রামের একই বাড়িতে চার নারী ধর্ষণের ঘটনা তদন্ত ও আসামিদের গ্রেফতারে থানা পুলিশ ব্যর্থতা স্বীকারের একদিনের মধ্যে দু’জনকে আটক করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এদের মধ্যে মিজান মাতব্বর (৪৫) নামে একজনকে গ্রেফতার দেখিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আল ইমরানের আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মিজান ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও ধর্ষণে অংশ নেয় নি বলে দাবি করেছে। সে জানিয়েছে ডাকাতির উদ্দেশ্যে তারা ঘরে ঢুকেছিল।
গত সোমবার থানা পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যর্থতা স্বীকারের পরপরই চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির তদন্তভার পিবিআইকে দেয়া হয়। পিবিআই চট্টগ্রাম মহানগর অঞ্চলের পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা মামলাটির তদন্ত করছেন। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি আজাদীকে বলেন, থানা পুলিশের কাছ থেকে আমরা মামলার দায়িত্ব নিয়েছি। পিবিআই হেডকোয়ার্টার থেকে মামলার তদন্তভার গ্রহণের জন্য সোমবার (২৫ ডিসেম্বর) আমাদের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিকটিম ও তার আত্মীয়স্বজন এবং স্থানীয় বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলেছি। জড়িত একজন আদালতে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছে । আশা করছি অন্যান্য অপরাধীদের অতি দ্রুত আইনের হাতে সোপর্দ করতে পারবো।
এদিকে পিবিআই’র অপর একটি সূত্র জানিয়েছে ঘটনায় জড়িত আবু শামা নামে আরো একজনকে আটক করা হয়েছে, যে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী। বাকি আসামিদের গ্রেফতারের প্রয়োজনে তাকে নিয়ে অভিযান চলছে বলেই আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে গ্রেফতারের কথা স্বীকার করছে না পিবিআই।
প্রসঙ্গত: চার নারী ধর্ষণের ঘটনায় থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে চট্টগ্রামজুড়ে । গত ১২ ডিসেম্বর রাতে কর্ণফুলীর শাহ মীরপুরে এ ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, কয়েকজন ডাকাত জানালার গ্রিল কেটে বাড়ির ভেতরে ঢুকে । পরে প্রতিটি রুমে প্রবেশ করে আলমারিতে থাকা ১৫ ভরি স্বর্ন, ৫টি দামি মোবাইল সেট ও ৮৭ হাজার টাকা নিয়ে যায় এবং চার নারীকে আলাদা রুমে নিয়ে ধর্ষণ করে।
এ ঘটনায় মামলা নিতে পুলিশের বিরুদ্ধে গড়িমসি করার অভিযোগের পর ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদের নির্দেশে কর্ণফুলী থানা পুলিশ প্রায় ৫ দিন পর মামলা নেয়। ক্ষতিগ্রস্থদের ধারণা ডাকাতিতে অংশ নেয়া অনেকের বাড়ি ঘটনাস্থলের আশেপাশে। ঘটনার পর পরেই কর্ণফুলী উপজেলা ছাড়া চট্টগ্রাম নগরীতে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন অব্যাহত আছে।
এ অবস্থায় সিএমপির পক্ষ থেকে কর্ণফুলি থানায় গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে এক পর্যায়ে মামলা নেওয়া ও আসামি গ্রেফতারে ‘আংশিক ব্যর্থতা’র দায় স্বীকার করে নেন সিএমপির উপ পুলিশ কমিশনার (বন্দর) হারুন-উর-রশিদ হাজারী। তবে পরবর্তী সময়ে মামলাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তবে সংবাদ সম্মেলন শেষ হতে না হতেই মামলাটির তদন্ত ভার পিবিআই’র হাতে ন্যস্ত করা হয়।
পিবিআই মেট্রো অঞ্চলের পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি আজাদীকে বলেন, তদন্ত টিমে নারী অফিসারও ছিলেন। কেননা তারা আমাদের কাছে পুরো ঘটনা খুলে বলতে নাও চাইতে পারেন। ঐ নারী কর্মকর্তা ভিকটিমদের সাথে একান্তে কথা বলেন এবং প্রথম বারের মতো তারা পুরো ঘটনাটির বর্ণণা দেন। তাদের বর্ণনা অনুযায়ী তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ২৫ ডিসেম্বর রাত সাড়ে দশটার দিকে নগরীর ইপিজেড থানার মাইলের মাথা এলাকা থেকে মিজান মাতব্বরকে (৪৫) গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তার হেফাজত থেকে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, ঘটনার সময় পরিহিত লুঙ্গি, লুণ্ঠিত মালামাল থেকে ভাগ পাওয়া তের হাজার টাকার মধ্যে দুই হাজার ১০ টাকা উদ্ধার করা হয়।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, মিজান আদালতে স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দিতে জানায় ঘটনায় সে সহ পাঁচ জন ছিল। ধর্ষণ নয়, ডাকাতির উদ্দেশ্যে ওই বাড়িতে তারা ঢুকেছিল বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছে মিজান। এতে নেতৃত্ব দিয়েছিল স্থানীয় একজন। জানা গেছে স্থানীয় সেই ব্যক্তিটি ছিলেন আবু শামা, যাকে আটক করা হলেও অফিসিয়ালি এখনও স্বীকার করা হয়নি। মিজান জানায়, ঘরে ঢোকা চারজনের মধ্যে দুজন ধর্ষণ করে। চারজন ডাকাতের মধ্যে দুজন ঢাকা থেকে এসেছিল। মিজান নিজেও ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল। অন্যদের জন্য পারেনি। ঘটনার দিন ভোররাতে স্থানীয় ওই বাসিন্দা তাদের আনোয়ারার চাতুরী-চৌমুহনী এলাকা দিয়ে ১৫ নম্বর ঘাট পার করে পতেঙ্গা এলাকায় পাঠিয়ে দেয়। মিজানের বাড়ি বাগেরহাট। সে বর্তমানে দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর মাইজপাড়ার মকবুল কন্ট্রাকটরের ভাড়া ঘরে বসবাস করছিল।
এর আগে কর্ণফুলি থানা পুলিশ তিন জনকে গ্রেফতার করার কথা জানিয়েছিল। এর মধ্যে গত ১৮ ডিসেম্বর মোহাম্মদ সুমন ওরফে আবু এবং ফারুকী মাহমুদ নামে দু’জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। এছাড়া ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আনোয়ারা উপজেলার চাতুরী-চৌমুহনী এলাকা থেকে ইমতিয়াজ উদ্দিন বাপ্পি (২৩) নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। তবে কর্ণফুলী থানার গ্রেফতার করা তিনজন ঘটনায় জড়িত কিনা জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত নতুন তদন্ত কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার চাকমা এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, তারা কী করেছে, কেন করেছে, সে বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। যদিও এর আগে থানা পুলিশ জানিয়েছিল, ঘটনায় জড়িত আবুকে ২৮ ডিসেম্বর টিআই প্যারেড (আসামি শনাক্ত করার জন্য ভুক্তভোগীদের সামনে উপস্থিত করা) করানোর কথা রয়েছে।
এ মামলায় আগে গ্রেফতার তিনজনের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল আলম বলেন, তিনজনের মধ্যে আবুকে থানায় গিয়ে শনাক্ত করেছেন ধর্ষণের শিকার নারীরা। পুলিশের কাছে সে নিজেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছিল। তার সম্পৃক্ততা না থাকার বিষয়টি সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে।

x