ডাকসু ভিপি ‘কোটার’ নূর, জিএস ছাত্রলীগের রাব্বানী

শোভনের কোলাকুলি শপথ নেয়ার ইচ্ছা নূরের থাকবেন আন্দোলনেও

আজাদী ডেস্ক

বুধবার , ১৩ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ
409

দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি) হলেন বাংলাদেশ সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নূর। এর মধ্য দিয়ে ২৫তম ভিপি হিসেবে ডাকসুর গৌরবমাখা ইতিহাসের অংশ হলেন তিনি। এছাড়া সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হয়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। গত সোমবার দিবাগত রাত ৩টা ২৪ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন। ঘোষিত ফলাফলে নূরুল হক নূর পান ১১ হাজার ৬২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদের ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন পেয়েছেন ৯ হাজার ১২৯ ভোট। অন্যদিকে জিএস পদে গোলাম রাব্বানী ১০ হাজার ৪৪৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কোটা আন্দোলনের নেতা মো. রাশেদ খাঁন পেয়েছেন ৬০৬৩ ভোট। এছাড়া এজিএস সাদ্দাম হোসেন ১৫ হাজার ৩০১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ফারুক হোসেন পেয়েছেন ৮৮৯৬ ভোট।
এদিকে গত সোমবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গতকাল দিনভর উত্তেজনা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ভিপি পদে শোভনের পরাজয় মানতে না পেরে গতকাল সকাল থেকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নেতা নূরুল হক নূরকে ভিপি পদে জয়ী করতে ‘অনেক বড় জালিয়াতি’ হয়েছে অভিযোগ করে ওই পদে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানান তারা।
অন্যদিকে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেওয়া প্যানেলগুলোর ডাকে গতকাল সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা ছিল বন্ধ। সংগঠনগুলো আলাদা আলাদাভাবে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশ করে নতুন করে নির্বাচনের তফসিল দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। ভোট চলাকালে সোমবার দুপুরে রোকেয়া হলে গিয়ে ছাত্রলীগের হামলার শিকার নূর রাতে ছিলেন হাসপাতালে। মঙ্গলবার দুপুরে তিনি ক্যাম্পাসে ফিরে আনন্দ মিছিলে অংশ নেওয়ার পর টিএসসিতে ফের হামলার মুখে পড়েন।
ওই হামলার জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করে রাজু ভাস্কর্যের সামনে এক সমাবেশে তিনি ঘোষণা দেন, ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক ছাড়া ডাকসুর বাকি সব পদে নতুন করে ভোট না দিলে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি চলবে।
তবে ওই হামলার ঘটনার কিছুক্ষণ পর ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন ভিসির বাসভবনের সামনে গিয়ে কর্মীদের ভোটের ফল মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিতে বলেন। ছাত্রলীগ কর্মীরা এসময় ‘মানি না, মানি না’ বলে স্লোগান দিতে থাকলে শোভন বলেন, ‘তাইলে তোমরা আমাকেও মানো না। অনেক সময় অনেক কিছুর কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ভালো রাখার জন্য, দেশের ভালোর জন্য নিজেকে বলি দিতে হয়। অনুরোধ, তোমরা হলে ফিরে যাও।
বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে নূরসহ সব প্যানেলের নেতাকর্মীদের নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চান তিনি। শোভনের অনুরোধে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে থাকা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা সরে গেলে সংগঠনের সভাপতি দলবল নিয়ে যান টিএসসিতে। ভোট বর্জন করা প্যানেলগুলোর নেতাদের সঙ্গে তখন সেখানেই অবস্থান করছিলেন নূর। শোভনকে মিলনায়তনে ঢুকতে দেখেই নূর মঞ্চে উঠে দাঁড়ান। শোভন এ সময় মঞ্চে উঠে নূরের সঙ্গে করমর্দন আর কোলাকুলি করেন।
উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে শোভন বলেন, ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে নূরুল হককে স্বাগত জানাতে এসেছি। ২৯ বছর পর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা তুলে ধরে ছাত্রলীগের সভাপতি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীর প্রতি আহ্বান জানাই, শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। নুরুল হককে মেনে নিয়ে যার যার অবস্থান থেকে সহযোগিতা করতে হবে।
আর নূর বলেন, শোভন ভাই আমার হলের বড় ভাই। আমরা একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। আমি বিজয়ী হয়েছি, উনি আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন, আমিও তাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দুপুরে টিএসসিতে ছাত্রলীগের হামলার ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিয়ে নূর বরেন, আমি শোভন ভাইকে বলেছি। তিনি কি ব্যবস্থা নেন, সেটার জন্য অপেক্ষা করছি।
পরে ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনির্দিষ্টকালের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন নতুন ভিপি নূরুল হক নূর। তবে এর ঘণ্টাখানেক পর টিএসসিতে বাম জোটের প্যানেলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে পুনঃনির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন নূর। নিজের সহকর্মীদের চোখে ‘বিতর্কিত’ এই নির্বাচনে জয়ী নূর ভিপি পদে শপথ নেওয়ার ইচ্ছার কথা সাংবাদিকদের জানিয়ে বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে ডাকসুর ভিপি হিসাবে আমিও থাকব। তিনি বলেন, সোমবার নির্বাচন চলার সময়ই ছাত্রলীগ ছাড়া আমরা সব প্যানেল নির্বাচন বর্জন করেছিলাম। আজও সেই দাবি জানাচ্ছি নির্বাচন বাতিল করে পুনঃতফসিল ঘোষণা করতে হবে। ৩১ মার্চের মধ্যে নতুন নির্বাচন দিতে হবে। এই দাবিতে আজ বুধবার উপাচার্যকে স্মারকলিপি দেওয়া হবে বলে সাংবাদিকদের জানান বাম জোটের ভিপি প্রার্থী ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লিটন নন্দী।
তিনি বলেন, আগামীকাল (আজ) দুপুর ১২টায় আমরা সবাই রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হব। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে উপাচর্যের কার্যালয়ে গিয়ে নির্বাচন বাতিলের দাবিতে স্মারকলিপি দেব। এরপর তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান লিটন।
ডাকসুর কোন পদে কে জিতলেন :
এদিকে নির্বাচনে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক পদে সাদ বিন কাদের চৌধুরী ১২ হাজার ১৮৭, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে আরিফ ইবনে আলী ৯ হাজার ১৫৪, কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে লিপি আক্তার ৮ হাজার ৫২৪, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে শাহরিমা তানজিম অর্নি ১০ হাজার ৬০৪, সাহিত্য সম্পাদক পদে মাজহারুল কবির শয়ন ১০ হাজার ৭০০, সংস্কৃতি সম্পাদক পদে আসিফ তালুকদার ১০ হাজার ৭৯৯, ক্রীড়া সম্পাদক পদে শাকিল আহমেদ তানভীর ৯ হাজার ৪৭, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে শামস-ঈ-নোমান ১২ হাজার ১৬৩ ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে আখতার হোসেন ৯ হাজার ১৯০ ভোটে বিজয়ী হয়েছেন।
এছাড়া ১৩টি সদস্য পদে যোশীয় সাংমা চিবল ১২ হাজার ৮৬৮, মো. রাকিবুল ইসলাম ঐতিহ্য ১১ হাজার ২৩২, তানভীর হাসান সৈকত ১০ হাজার ৮০৫, তিলোত্তমা সিকদার ১০ হাজার ৪৬৬, নিপু ইসলাম তন্বী ১০ হাজার ৩৯৩, রাইসা নাসের ৯ হাজার ৭৬৮, সাবরিনা ইতি ৯ হাজার ৪৫০, মো. রাকিবুল হাসান রাকিব ৮ হাজার ৬৭৩, নজরুল ইসলাম ৮ হাজার ৫০৯, মোছা. ফরিদা পারভীন ৮ হাজার ৪৬৯, মুহা. মাহমুদুল হাসান ৭ হাজার ৯৭৮, মো. সাইফুল ইসলাম রাসেল ৭ হাজার ৮১২ ও মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম সবুজ ৬৫১৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
ঘোষিত ফলাফলে ডাকসুর ২৫ পদের মধ্যে ভিপি ও সমাজসেবা বাদে প্রায় সব পদে ছাত্রলীগ সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী প্যানেল বিজয়ী হয়েছে। সংগঠনটি প্রায় সবগুলো হল সংসদে পূর্ণ প্যানেলে এবং ডাকসুতে ২৩টি পদে বিজয়ী হয়েছে। ডাকসুর ইতিহাসে এই প্রথম ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ভোটে বেশির ভাগ পদে বিজয়ী হয়েছে।
নির্বাচনে প্রত্যেক ভোটার ডাকসু ও হল সংসদের ৩৮টি পদে ভোট দিয়েছেন। এরমধ্যে ডাকসুতে ২৫টি ও হল সংসদে ১৩টি পদে ভোট হয়েছে। ১৮টি হলের মধ্যে ১০টিতে ছাত্রলীগ ভিপি ও জিএস পদে বিজয়ী হয়েছে। এছাড়া জহুরুল হক হলে ভিপি, ফজলুল হক মুসলিম হল ও অমর একুশে হলে জিএস পদে বিজয়ী হয়েছে।

ভিপি ও জিএস পদে বিজয়ী হলগুলো হলো, জগন্নাথ হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল, সূর্যসেন হল, হাজী মোহাম্মদ মুহসীন হল, কবি জসীমউদ্দীন হল, এএফ রহমান হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল এবং বিজয় একুশে হল।
অপরদিকে স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা ফজলুল হক মুসলিম হল ও অমর একুশে হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ভিপি পদে এবং জহুরুল হক হলে জিএস পদে বিজয়ী হয়েছেন।

x