ডাউন পেমেন্ট ছাড়া কৃষিঋণ পুনঃ তফসিলের নির্দেশনা ব্যাংকগুলোকে পরিপালন করতে হবে

সোমবার , ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ
63

দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো এখন থেকে ক্ষেত্রবিশেষে ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই কৃষকদের স্বল্পমেয়াদী কৃষিঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবে। একই সঙ্গে ঋণ পুনঃতফসিলের পর কৃষকদের পুনরায় নতুন করে স্বল্পমেয়াদে ঋণ দিতে পারবে তারা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ নিয়ম কার্যকর থাকবে। গত ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের কপি দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষি খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের স্বল্প মেয়াদি কৃষি ঋণ পুনঃ তফসিলীকরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ডাউন পেমেন্ট গ্রহণের শর্ত শিথিল করা যাবে। ক্ষেত্র বিশেষে ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই এ ধরনের ঋণ পুনঃ তফসিল করা যাবে। এতে আরো বলা হয়েছে, পুনঃ তফসিলিকরণের পর কৃষকদের পুনরায় নতুন করে স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ দেয়া যাবে। এক্ষেত্রে কোন নতুন জমা ছাড়াই পুনঃতফসিল-পরবর্তী নতুন ঋণ দেয়া যাবে। এছাড়া সার্টিফিকেট মামলা চলাকালে গ্রাহকের সঙ্গে সমঝোতার (সোলেনামা) মাধ্যমে সার্টিফিকেট মামলা উত্তোলন ও নিষ্পত্তির পর ঋণ পুনঃ তফসিল করা যাবে। পত্রিকান্তরে গত ১৮ ডিসেম্বর এ খবর প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশ আবহমানকাল থেকে একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের জাতীয় অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। কৃষির প্রাণ আবার কৃষক। বাংলাদেশ এ সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। এ ব্যাংকের জোর তৎপরতায় দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি কৃষিখাতে ঋণ বিতরণ আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে এ খাত থেকে বিতরণ করা ঋণ সঠিক সময়ে আদায় হচ্ছে না। ফলে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। কৃষি ও কৃষকের জন্য প্রতিকূল অবস্থাগুলো হলো, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস অতিবৃষ্টি ইত্যাদি। মূলত এসব কারণে দেশের কৃষকেরা ফসল উৎপাদন ও আহরণ-পরবর্তী সময়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং ঋণ নিয়ে যথাসময়ে শোধ করতে পারছেন না। বলতে গেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে তারা ঋণের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এই বিবেচনা মাথায় রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ সুবিধায় আবারো কৃষকদের ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিতে উদ্যোগী হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ অর্থনীতি এক রূপান্তরকাল পার করছে। এ অন্তর্বর্তী সময়ে দেশের অর্থনীতিতে সেবা ও শিল্পখাতের অবদান বাড়লেও কৃষির গুরুত্ব সামান্যতমও হ্রাস পায়নি। বিশেষ করে সারা দেশের মানুষের খাদ্য যোগানো ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ অবদান রাখছে। এ প্রসঙ্গে আরো একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ বর্তমানে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে, উপরন্তু খাদ্য রফতানিও করছে। এর জন্য দেশের কৃষকদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। স্বভাবতঃ বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি কৃষকের দুর্ভোগ লাঘবে ডাউন পেমেন্ট গ্রহণের শর্ত শিথিল করে কিংবা ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই কৃষিঋণ পুনঃ তফসিলের যে নির্দেশনা জারি করেছে তা খুবই সঠিক সন্দেহ নেই। তবে এর সুফল পুরোটাই নির্ভর করছে আলোচ্য নির্দেশনার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ওপর। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা চাই, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালনে ব্যাংকগুলোর সত্যিকারের আন্তরিক প্রয়াস এবং সাথে সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি নিশ্চিত করা হোক। অতীতে কিছুক্ষেত্রে পুনঃ তফসিল সুবিধার অপব্যবহার হয়। এধরনের অপব্যবহার বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপও জরুরি।
বিগত দিনের বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খুবই শিথিল। এর একটি বড় উদাহরণ হলো, মোট ঋণের ৫ শতাংশ কৃষি খাতে দেওয়ার বাধ্যতামূলক বিধান । এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো কৃষি সংশ্লিষ্ট শিল্পকে দেওয়া ঋণ কৃষি ঋণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে আলোচ্য নিয়ম পরিপালন হয়েছে বলে অভিযোগও রয়েছে। বস্তুত এটি ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণ বিতরণের অনাগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ । এছাড়া ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সাধারণ পদ্ধতি অনুযায়ী কাগজপত্র দাবি করা হয় যার বেশিরভাগই সাধারণ গ্রামীণ কৃষকদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয় না। কৃষকদের ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়া সংক্রান্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এতটুকু শৈথিল্য ও অনাগ্রহও কাম্য নয়। আমরা চাই, এই শৈথিল্যের অবসান। আশা করি তপসিলি ব্যাংকগুলো বিষয়টি আমলে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা সুষ্ঠু পরিপালন নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেবে।

- Advertistment -