ট্রাম্প ও রাজনীতির রসায়ন!

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৪ জুলাই, ২০১৮ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ
27

ছাত্র শিক্ষকদের অনিশ্চিত ভবিষ্যত, নিরাপত্তাহীনতার মুখে লাগাতার আন্দোলনে ঠেলে দেয়ার দায় নেবে কে? রাজনীতিতে জিরো টলারেন্স এর নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা কেন? মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে এরা একটা কথাও বলেনি। সামরিক জান্তা ও তাদের দোসরদের অপ রাজনীতির কারণে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অনেক গলদ ও ভুয়া আছে। বাদ পড়েছে অনেক প্রকৃত যোদ্ধা। সরকার তা সংশোধন করেনি। শুধু সুযোগই বিলিয়ে যাচ্ছে, ভেজাল শুদ্ধ করার প্রক্রিয়া এখনো শেষই হয়নি। কেন? পাড় মিথ্যাবাদী খ্যাত ট্রাম্পের মতো আমাদের রাজনীতিও কী মিথ্যার স্রোতে ভেসে যাবে?

বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রতি একটা অবসেশন বা মোহ আছে সবার। বিশেষ করে উদারনৈতিক ও মধ্যপন্থায় বিশ্বাসীদের। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নিযে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাদপ্রতিম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন থেকে শুরু করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীরও নিজস্ব কিছু মন্তব্য আছে। গণতন্ত্রের সামগ্রিক রূপ এসব মন্তব্যে খুবই পরিষ্কার। মন্তব্যগুলোর সার কথা হচ্ছে, জনগণ কর্তৃক, জনগণের জন্য, এবং জনগণের কল্যাণে পরিচালিত শাসন ব্যবস্থাই হচ্ছে গণতন্ত্র। কিন্তু গণতন্ত্রের মৌলিক বা আদি সংজ্ঞাটি সামপ্রতিক সময়ে একদম পাল্টে গেছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিশ্বের বৃহত্তম সাংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ ভারতসহ কমবেশি সবখানেই। মার্কিন গণতন্ত্রে পপুলার আর ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটের শুভংকরের ফাঁক তো আছেই। এই ফাঁকের চিপায় আটকে ডেমোক্রেট প্রার্থী হিলারী ক্লিনটন সাড়ে চার মিলিয়ন বেশি পপুলার ভোট পেয়েও গত নির্বাচনে কাদায় আটকে শেষ! নির্বাচন ঘিরে অবাধ চাঁদাবাজি দেশটিতে জায়েজ। সুযোগটা শতভাগ কাজে লাগায়, মার্কিন প্রশাসন ও গণতন্ত্রের নেপথ্য নিয়ামক শক্তিশালী ইহুদি লবিষ্টরা। তারা কংগ্রেস, সিনেট দুতরফেই পছন্দের প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে বিশাল তহবিল যোগান দেয়। এখানে ডেমোক্রেট বা রিপাবলিকান ভেদ নেই। যারা কট্টর ইহুদীবাদী ইসরায়েলের যেকোনো সিদ্ধান্ত মুখস্ত সমর্থন দেবে, তারাই হোয়াইট হাউস, সিনেট বা কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণের সোনার চাবির মালিক হবে। অবৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে মার্কিন গণতন্ত্র ও প্রশাসন এই নীতি থেকে একচুলও সরে আসেনি।

আগে কিছু কূটনৈতিক আড়াল থাকলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর ওসব ঝেড়ে ফেলেছেন। জেরুজালেমে দূতাবাস সরিয়ে এনে ইসরায়েলি রাজধানীর সিল ছাপ্পড় মেরে দিয়েছেন। পাশাপাশি দখলীকৃত পুরো পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি আবাসন গুঁড়িয়ে দিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে, হাজার হাজার ইহুদী আবাসন কমপ্লেক্র। বাধা দেয়ার কোনো উপায় নেই। প্রতিবাদ করলেই তাৎক্ষণিক মৃত্যুর টিকিট! বিশ্ব বিবেক কাগজে আছে, কাজে নয়। জাতিসংঘ প্রস্তাব পাশ করে। ভেটো দেয় যুক্তরাষ্ট্র। মহাসচিব বিবৃতি দেনইসরায়েল তালি দেয়! ওইটুকুতেই শেষ। মিশাইল, জঙ্গি বিমান, বোমা হামলার সাথে এখন ইসরায়েল ট্রাম্পের লাই পেয়ে ফিলিস্তিনিদের মারছে ট্যাঙ, খাবার ও ওষুধ আটকে দিয়ে। ফিলিস্তিনি শিশুনারীসহ সবাই মরছে। ইরান ছাড়া চারপাশের মুসলিম উম্মাহ পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে, বর্বর ইসরায়েলকে! এইতো ইসলামী সংহতি!

ফেরা যাক, ভারতীয় গণতন্ত্রে। ভারতীয় গণতন্ত্রের শিকড় অনেক শক্ত, সত্য। কিন্তু বিজেপি উত্থানের পর থেকে শিকড়ে পচন ধরেছে। আগেও ত্রুটি ছিল কিন্তু এতো ভয়াবহ নয়। হিন্দুত্ববাদী দলটি দেশটির বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের শিকড় উপড়ে ফেলতে সম্ভাব্য সবকিছু করছে। কোনো কোনো রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ী অন্য দলের সদস্যদের কোটি কোটি ডলারে কিনে অথবা আটকে রেখে সমর্থন আদায় করে সরকার গড়ছে। গণতান্ত্রিক বিধি ইচ্ছামতো পায়ে দলছে। আবার পশ্চিম বঙ্গে মমতার তৃণমূল পুরসভা, পঞ্চায়েত নির্বাচনে ব্যপক সহিংসতায় ভর করে যে কোনো মূল্যে নিজ দলের প্রার্থীকে জিতিয়ে আনছে। এটাই এখন ভারতীয় গণতন্ত্রের আসল রূপ। আমাদের দেশেও গণতন্ত্র নানা অসুখে ভুগছে। সরকার কোনোভাবেই বিরুদ্ধ মতকে ন্যূনতম স্পেসদিতে রাজি না। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত ফলের আশংকা বাড়ছে। খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সরকারি দলের প্রার্থী জিতেছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ দাবি করলেও দুটো নির্বাচনেই কিছু দৃশ্যমান অসঙ্গতি আড়ালের সুযোগ নেই। সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল সিটি নির্বাচন নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। সবচেবড় কথা, সিলেটে নগর জামায়াতের আমির এহছানুল মাহবুব জুবায়েরও মেয়র পদে শক্তিশালী প্রার্থী। বিএনপিকে অন্য সব সিটিতে সমর্থন দিলেও জামায়াত সিলেটকে টেস্ট কেস হিসাবে নিয়েছে। দেশের সবখানে সরকার স্বাধীনতা বিরোধী দলটাকে দৌড়ের উপর রাখলেও সিলেটের চিত্র উল্টো! আওয়ামী লীগের বদলে ওখানে জামায়াতের প্রতিপক্ষ বিএনপি! সাবেক মেয়র আরিফুল হকের সাথে জামায়াতের সম্পর্ক খারাপ। আরো খারাপ হয় জামায়াতি মালিকানার মহিলা মেডিকেল কলেজের সীমানা প্রাচীর ভেঙে সড়ক সমপ্রসারণ করায়। বিএনপির ধারণা, দেশের অন্য স্থানে যাই হোক, সিলেটে সরকারি দলের সাথে জামায়াতের বোঝাপড়া বেশ ভালো। তাছাড়া জামায়াত অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল হিসাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান সুরক্ষায় বেশি মনোযোগী। কৌশলের অংশ হিসেবে জামাতশিবিরের মালিকানাধীন হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকী কোচিং সেন্টারেও সরকারি দলের নানা পর্যায়ের নেতাকে উপদেষ্টাসহ অর্থকরি পদে যুক্ত করছে। শুধু সিলেট নয়, সারাদেশেই জামাত এই কৌশল প্রয়োগ করছে। নিষ্ঠুর সত্যি, সরকারি দলের কিছু নেতা আত্মঘাতী টোপ গিলছে। তাই সিলেটে জামাতি নির্বাচনী প্রচারণা নির্ভার! শুধু তাই না, জামাত ১৩ আসনে একক কাউন্সিলর পদে প্রার্থী দিলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী অনেক। দলীয় প্রতীক শুধু মেয়রের জন্য থাকায় কাউন্সিলর পদ খোলা রেখেছে তারা।

রাজনীতিতে জামাতি কৌশলের কাছে হার মানলেও কোটা আন্দোলন নিয়ে সরকার হাঁটছে উল্টোপথে। জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্লামেন্টে কোটা প্রথা অবসানের ঘোষণা দেয়ার পর বিষয়টি চুকেবুকে যাওয়ার কথা। যায়নি। এনিয়ে আমলাতন্ত্র ও দলের কায়েমী স্বার্থবাদিরা তাকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ নিয়েছে। হাইকোর্টে মামলার বিষয়টা বাদ থাক, দোষ কী? অতি উৎসাহী ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী ঢাকা, জাহাঙ্গীর নগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ সবখানে কোটা প্রথা নিয়ে পরিষ্কার ঘোষণার দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জামাত শিবিরের তকমা সেঁটে বেপরোয়া মারধর করছে। হাতুড়ি পেটাসহ ছাত্রী ও শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করছে। আটক করা হয়েছে আন্দোলনের নেতা রাশেদসহ অনেককে। এরা জামাত শিবিরের অনুপ্রবেশকারী কিনা, এই খবরতো শুরুতেই নেয়া যেত। অসংখ্য সরকারি এজেন্সি কেন? এতদিন পর কেন এই অভিযোগ! ছাত্র শিক্ষকদের অনিশ্চিত ভবিষ্যত, নিরাপত্তাহীনতার মুখে লাগাতার আন্দোলনে ঠেলে দেয়ার দায় নেবে কে? রাজনীতিতে জিরো টলারেন্স এর নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা কেন? মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে এরা একটা কথাও বলেনি। সামরিক জান্তা ও তাদের দোসরদের অপ রাজনীতির কারণে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অনেক গলদ ও ভুয়া আছে। বাদ পড়েছে অনেক প্রকৃত যোদ্ধা। সরকার তা সংশোধন করেনি। শুধু সুযোগই বিলিয়ে যাচ্ছে, ভেজাল শুদ্ধ করার প্রক্রিয়া এখনো শেষই হয়নি। কেন? পাড় মিথ্যাবাদী খ্যাত ট্রাম্পের মতো আমাদের রাজনীতিও কী মিথ্যার স্রোতে ভেসে যাবে?

x