ট্যুরিস্ট পুলিশ নিরাপত্তা নাকি ঝামেলার জন্য

কক্সবাজারে সৈকতে দম্পতি নাজেহালের ঘটনায় তোলপাড়

কক্সবাজার প্রতিনিধি

বৃহস্পতিবার , ২১ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৩:২১ পূর্বাহ্ণ
239

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তাদের অভ্যন্তরীণ আয় বাড়াতে পর্যটন খাতকে ঢেলে সাজাচ্ছে। তারা সহজ করছে ভিসা পদ্ধতি, আধুনিক করছে যাতায়াত ব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে পর্যটন স্পটগুলোতে। সাথে দিচ্ছে নানা সুযোগসুবিধাও। এসবের ফলে তারা সফলতাও পাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টি বিবেচনা করে পর্যটন খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। পর্যটন স্পট ঘিরে অপরাধীদের অপতৎপরতা বেশি থাকায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা জেরদারের লক্ষ্যে ট্যুরিস্ট পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করে। তাদের লক্ষ্যউদ্দেশ্য থাকেকিভাবে পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদার করে তাদের ভ্রমণকে আরো আনন্দদায়ক করা যায়। বাংলাদেশ সরকারও এ লক্ষ্যে ‘ট্যুারিস্ট পুলিশ’ নামে আলাদা একটি ইউনিট চালু করেছে। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে তাদের নিয়োগও করা হয়েছে। কিন্তু গত রোববার কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এক পর্যটক দম্পতিকে কাবিননামার অজুহাতে নাজেহালের অভিযোগ উঠার পর ট্যুরিস্ট পুলিশের অতি উৎসাহী কিছু সদস্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্যুরিস্ট পুলিশ যদি এভাবে পর্যটকদের কাবিননামা বা অন্য কোনো বিষয়ে হয়রানি করে, তাহলে দেশের পর্যটন স্পটগুলোতে এর মারাত্মক একটা প্রভাব পড়তে পারে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, ট্যুারিস্ট পুলিশ কী নিরাপত্তার জন্য নাকি এসব ঝামেলা পাকানোর জন্য?

উল্লেখ্য, গত রোববার রাতে কক্সবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্টে কিটকট চেয়ারে বসে রাতের সমুদ্র উপভোগ করছিলেন কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা এনজিও কর্মকর্তা ও সেনাশাখা বিএনসিসির সাবেক ক্যাডেট এম. কায়দে আজম। রাত ৮টার দিকে ট্যুরিস্ট পুলিশের এএসআই মো. মাসুদসহ ৩ কর্মকর্তা এসে দু’জনকে স্বামীস্ত্রী কিনা জানতে চান। এ সময় তারা হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে পুলিশ তাদের বিয়ের কাবিননামা দেখাতে বলেন এবং কাবিননামা দেখাতে না পারলে তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানায়।

তখন আজম প্রশ্ন করেন, কোনো বিবাহিত নারীপুরুষ কি কাবিননামা সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়? কিন্তু সে যুক্তি মানেনি পুলিশ। কথা বার্তা চলার এক পর্যায়ে বাসা থেকে দুজন আত্মীয় এসে আজম ও তার স্ত্রীর পরিচয় নিশ্চিত করার পর পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়। তার আগে দুই ঘণ্টা তাদের আটকে রাখে। পরে আজম কক্সবাজারের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগটি আমলে নিয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপিকে নির্দেশনা দেন। পরে অভিযুক্ত ট্যুরিস্ট পুলিশের এএসআই মো. মাসুদকে ক্লোজ করা হয়। কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশ থেকে প্রত্যাহার করে তাকে ট্যুরিস্ট পুলিশের কেন্দ্রীয় লাইনে সংযুক্ত করা হয়। গত মঙ্গলবার তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ত্যাগ করেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগটি তদন্তে দু’সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিতে রয়েছেন, কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলে রাব্বী ও সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার এইচ এম রায়হান কাজেমী। পর্যটনের স্বার্থে তারা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছেন বলে জানিয়েছেন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার এইচ এম রায়হান কাজেমী।

এদিকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ভুক্তভোগী কায়দে আজম বলেন, সারাদিন কাজের চাপে থাকতে হয় বিধায় পরিবারকে সময় দিতে পারি না। ডিউটি শেষ করে স্ত্রীকে নিয়ে একটু নিরিবিলি সময় কাটাতে সৈকতে গিয়ে অন্যদের মতো চেয়ারে বসেছিলাম। কিন্তু পর্যটকদের নির্বিঘ্ন সময় নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা পুলিশের কাছে এভাবে নাজেহাল হতে হবে কল্পনাও করিনি। তিনি বলেন, এএসআই মাসুদের সাথে থাকা অন্যজন বলছিলেন, ‘কিছু বিনিময় দিয়ে যেন ভুল বুঝাবুঝিটা মিটিয়ে ফেলি’। স্থানীয় হয়ে যদি এমন ভোগান্তিতে পড়ি তাহলে দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের অবস্থা কী হয় সেটা অনুমেয়। একটি পর্যটন এলাকায় এমনটি হয়ে থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব কিন্তু পুরো পর্যটন শিল্পে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন কায়দে আজম।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলে রাব্বির বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা জানায়, কায়দে আজমের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে যার নামে অভিযোগ করা হয়েছে সেই টুরিস্ট পুলিশ সদস্যকে ক্লোজ করা হয়েছে। এছাড়া আজমের কাছে অভিযোগের ব্যাপারে পুলিশ তথ্য চেয়েছে বলেও জানিয়েছেন রাব্বি। তিনি বলেন, অনেক সময় এমন অভিযোগের কথা শোনা গেলেও সাধারণত কেউ লিখিত অভিযোগ করে না।

এ ব্যাপারে আজম জানান, স্ত্রীর সামনে নাজেহাল হওয়ায় অপমান বোধ থেকেই তিনি অভিযোগ করেছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত এএসআই মো. মাসুদ বলেন, রাতের সৈকতে সমুদ্রের আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আমাদের। পাশাপাশি অশালীন কিছু দেখলে তা প্রতিহত করাও আমাদের দায়িত্বে পড়ে। অভিযোগকারীকে অশালীন অবস্থা দেখার পর তাদের পরিচয় জানতে চাওয়া হয়েছিল। অথচ এটাকে আড়াল করে তিনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগটি করেছেন।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার এইচ এম রায়হান কাজেমী বলেন, অভিযোগের কপিটি পেয়ে অভিযুক্ত এএসআই মাসুদকে ক্লোজ করে ঢাকা হেড অফিসে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটি বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার (মাসুদের) বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

x