টুয়েন্টিফোর ফ্রেমস্‌ : মিনিমালিস্ট ফিল্ম স্কুলিং এর ডায়মন্ড

ব্রাত্যজন

মঙ্গলবার , ২৮ মে, ২০১৯ at ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ
74



একটা পাখি / মাঝরাতে গান গায় ; / অচেনা / এমনকি পক্ষীকুলেও ।

একটা কাকতাড়ুয়া / টুপিহীন এবং কোটবিহীন / হিম শীত মধ্যরাতে

শ্বেত-শুভ্র নবীন ঘোড়া / কুয়াশার চাদর ফুঁড়ে উঁকি দেয় / মিলিয়ে যায় ফের / কুয়াশার চাদরে

নগ্ন পায়ে হাঁটি / তপ্ত বালিতে / পুড়ে যাই আপাদমস্তক / পথিকের দৃষ্টিপাতে

কে ঠিক করেছিল / এই তুঁত গাছ / খাদ্য হবে কখনও / রেশম পোকার?

উপরের কবিতাগুলো যিনি লিখেছেন তাঁর নাম আব্বাস কিয়ারোস্তামী, হ্যাঁ দুনিয়ার লোকে তাঁকে বেশী চেনে ইরানের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার হিসেবে। পারস্য সংস্কৃতি সিলভার স্ক্রিনে এত দুর্দান্তভাবে তাঁর মতো করে ফুটিয়ে তুলতে পারেননি খুব বেশী মানুষ। জীবন, মৃত্যু, সংস্কৃতি, শিল্প এবং অস্তিত্বের বিষয়গুলি অনুসরণ করে একটি নির্দিষ্ট ক্যামেরা-এঙ্গেল, পোট্রেটের মতো ছবি, একটি গাড়িতে একটি সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র বা পাহাড়ের লং-শটগুলোই হল তাঁর চলচ্চিত্রের ট্রেডমার্ক। যদিও তাঁকে কোনো ছকে ফেলে দেয়াটা মোটেই উচিৎ হবে না, তিনি এক প্রথা-ভাঙ্গা মানুষ। ইরানের নিউ-ওয়েভ সিনেমার সার্থক রূপকার।
২০০০ সালে মন্ট্রিয়ালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব চলচ্চিত্র উৎসবে আরেক চলচ্চিত্র পরিচালক শাহীন পারহামি তাঁর একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, যেখানে তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন বক্তব্যধর্মী সিনেমা কি আব্বাসের অপছন্দের কিনা। এর উত্তরে জানা গিয়েছিল চলচ্চিত্র বিষয়ে আব্বাসীয় দর্শন। তিনি বলেছিলেন, ‘সিনেমা তো আসলে বক্তব্য প্রচারের জায়গা না। একজন শিল্পী একটা কিছু সৃষ্টি করেন তার চিন্তা-ভাবনা-অনুভূতিকে প্রকাশ করার জন্য। এখানে ফারসি কবি রুমি- হাফিজকে আমরা ধরি, তাদেরকে আপনি যেকোনো সময়-অবস্থানে বসেই পাঠ করতে পারেন। শুধুই সাহিত্যিক, এরকম কোনো গণ্ডিতে তারা আটকে নেই। এটা আমাদের এখনকার কবি ফরোহ্‌ ফারোখযাদের বেলায়ও সত্যি।
যখন আমরা কোনো বিমূর্ত ছবিকে আমাদের মতো করে পাঠ করতে পারি, অথবা সংগীত আমরা হয়তো ঠিক অর্থটা বুঝি না, তারপরও আমরা শুনি, মুগ্ধ হই। কিন্তু সিনেমার বেলায় অনেকেই এসে অর্থ খোঁজে, মানে খোঁজে। কিন্তু সিনেমা তো আসলে একটা গান বা একটা ছবি কিংবা একটা কবিতার মতোই!’
১৯৪০ সালের ২২ জুন ইরানের রাজধানী তেহরানে জন্মেছিলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। ১৯৭০ সাল থেকে নিয়মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য, প্রামাণ্য এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য সব ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি। কোকের ত্রয়ী, টেস্ট অব চেরি এবং দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস এর মত সিনেমার জন্য আন্তর্জাতিক সুখ্যাতি অর্জন করেছেন, এর মধ্যে টেস্ট অব চেরি কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বোচ্চ পুরস্কার পাম দোর অর্জন করেছে। ২০১৬ সালে ৭৬ বছর বয়সে ক্যান্সারে মারা যান প্যারিসের একটি হাসপাতালে। প্রখ্যাত ফ্রেঞ্চ-সুইস চলচ্চিত্র নির্মাতা জ্যঁ লুক গদার একবার বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র শুরু হয়েছে ডি ডব্লিউ গ্রিফিতকে দিয়ে আর শেষ হয়েছে আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে দিয়ে।’
টোয়েন্টি ফোর ফ্রেমস্‌‌ (২৪ ঋৎধসবং) সম্ভবত: তাঁর সর্বশেষ চলচ্চিত্র। মিনিমালিজম সিনেমার একটা মাইলস্টোন এই সিনেমা। মৃত্যুর সময় আব্বাস কিয়ারোস্তামি জানতেন, তিনি কেবল তার পরিবার-বন্ধুদেরই শুধু নয় বরং নিজের সর্বশেষ কাজটিকেও রেখে যাচ্ছেন। ২০১৫ সালে মারাকেশ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এ-সিনেমার প্রিভিউ ফুটেজের ছোট্ট একটি প্রদর্শনী হয়েছিল। এর আটমাস পর কাজটা অসমাপ্ত রেখেই দুনিয়া ছাড়লেন, তখন তাঁর ছেলে আহমাদ কিয়ারোস্তামির উপর এই সিনেমা সম্পূর্ণ করবার দায়িত্ব বর্তায়। প্রতিটি প্রায় সাড়ে চারমিনিটের সংক্ষিপ্ত খন্ডচিত্র মিলিয়ে মোট ২৪ টি ফ্রেম নিয়ে এই সিনেমা তৈরি হয়েছে, এসব খণ্ডচিত্রগুলো তৈরি হয়েছে আব্বাসের পছন্দের আলোকচিত্র নিয়ে, যার অধিকাংশই তাঁর নিজের তোলা এবং ৪০ বছরের সংগ্রহ। বেশীরভাগ আলোকচিত্রই প্রকৃতিঘনিষ্ঠ। এই প্রকল্পে তাঁর সঙ্গে খুব ঘনিষ্টভাবে কাজ করেছেন আলী কামালি, নিজের বাড়িতে কম্পিউটারে সবগুলো অ্যানিমেশন করেছিলেন তিনি।
এই সিনেমা খুব ধীর লয়ের। কোনও এক সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম তিনি বলছেন, আমি কখনই আমার দর্শকদের ঘুমের প্রশান্তিতে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইনি। আমি সেই সিনেমাগুলোকে পছন্দ করি যেগুলো সিনেমা হলে দর্শকদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় না, আবার সেই সিনেমাই হয়তো হঠাৎ করে রাতে জাগিয়ে তোলে কিংবা সকালবেলা ঘুমটা ভাঙ্গায়। সেই সিনেমার চিন্তা এবং সপ্তাহজুড়ে সেটাই মনকে আবিষ্ট করে রাখে। ২৪ ঋৎধসবং তেমনই একটি নির্মাণ, খুব ধীর লয়ের ২৪টি গল্প। তাঁর সিনেমা পরিচালক সত্তা এবং চিত্রগ্রাহক সত্তা এই দুটোকে একটা কথোপকথনের করিডোর তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি এই সিনেমার মাধ্যমে। প্রথমে সর্বমোট ৪০টি ছবি বাছাই করা হয়েছিল এই সিনেমার জন্য, পরবর্তীতে তার মধ্যে থেকে ২৪টি নির্বাচন করেন। শিল্পীরা একটা দৃশ্য আঁকেন, কিন্তু সেই দৃশ্যের আগে এবং পরে আসলে কী ঘটেছিল সেটাই আব্বাসের এই সিনেমার মূল উপজীব্য।
এই সিনেমার প্রথম শটটি শিল্পী পিটার ব্রুগেলের ‘দ্য হান্টারস ইন দ্য স্নো’ চিত্রকর্ম দিয়ে শুরু হয়েছে। পর্দায় ভেসে উঠে একটা গ্রামের স্থির দৃশ্যপট। একটু পরেই স্থির ছবিটি জীবন্ত হতে শুরু করে। বাড়িগুলোর চিমনি থেকে ধীরে ধীরে বেরুতে শুরু করে ধোঁয়া, তাঁর কিছুক্ষণ পর শুরু হয় তুষারপাত, একটি পাখির বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকা এবং একটি কুকুর হঠাৎ পর্দা ফুঁড়ে উদয় হয়ে খানিক এদিক-সেদিক ঘুরে একটা গাছের গোড়ায় প্রাকৃতিক কাজ সম্পন্ন করে চলে যায়। এটা একটা অদ্ভুদ উদ্যোগ, কিয়ারোস্তামী চাইলেই স্থির চিত্র বাদ দিয়ে এসবের মুভি-শ্যুট করতে পারতেন। শতাব্দী আগেই স্থির একটা চিত্রকে সচল করার ম্যাজিক টেকনিক দেখানো হয়ে গেছে। তবু কামালিকে নিয়ে তিনি ভিন্ন লেয়ার তৈরি করে এনিমেশন যোগ করে এই ছবিটি বানিয়েছেন যা একটা গভীর ভাবনায় দর্শককে নিয়ে যায়। এই যে একটা স্থির ছবির আগে এবং পরে কী ঘটেছিল এমন একটা দ্যোতনার মধ্যে দর্শককে ডুবিয়ে দেয়া এটাই আব্বাসের মতোন একজন মাস্টার চলচ্চিত্র পরিচালকের ক্রাফস্‌‌ম্যানশীপ। একটা ফ্রেম আছে এইরকম, কয়েকটা পাখি বসে আছে, তাঁর মধ্যে একটা পাখিকে গুলি করা হয়, এরপর দীর্ঘ নীরবতা, পাখিগুলোর শোক, এরপর পাখিগুলো আবার উড়তে শুরু করে। এই ফ্রেমটা নাকি তিনি তৈরি করেছিলেন তাঁর এক বান্ধবীর স্মরণে, যিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন।
ছবিটিতে পশু-পাখির এবং প্রকৃতির তুলনায় মানুষের উপস্থিতি খুবই গৌন। আহমাদ কিয়ারোস্তামিকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল এই সিনেমায় মানুষের ভূমিকা কী? মানুষকে কি ধ্বংসাত্মক শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে? উত্তরে জুনিয়র কিয়ারোস্তামি বলেছিলেন, বাবা কখনো মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। আমার মনে হয় তিনি মানুষের বিরুদ্ধে কখনো কিছু বলেননি। বরং তিনি প্রকৃতিকে ভালোবাসতেন। বাবা বলতেন, ‘প্রকৃতি দেখে তিনি তার চোখ পরিষ্কার রাখেন।’ তিনি একা একা ঘুরতে ভালোবাসতেন। গাড়ি নিয়ে পার্বত্য এলাকায় চলে যেতেন এবং ছবি তুলতেন।
সিনেমা বানানোর চাইতে তিনি ফটোগ্রাফিতে বেশি আনন্দ পেতেন শেষদিকে। কারণ ফটোগ্রাফির জন্য তাকে বাজেট নিয়ে ভাবতে হতো না, বড় একটা টিম সামলানোর ঝামেলা নেই। শেষ এই কাজটিতে তিনি নিজেই অর্থলগ্নি করেন এবং শুধু একজন সহযোগী নিয়ে কাজ করেন। তিনি দিনে ১০, ১২ এমনকি ১৪ ঘণ্টা কাজ করেছেন। একটা দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবতেন। এমনও হয়েছে ঘণ্টা ছয়েক একটা ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি বলেছেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে। ক্লান্ত লাগছে। এবার ছবিগুলো নিয়ে কাজ শুরু করা যাক।’
পারহামিকে দেয়া সেই সাক্ষাৎকারে – শিল্প-দর্শন-সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি ইত্যাদি আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করে? এই প্রশ্নের উত্তরে আব্বাস কিয়ারোস্তামি যা বলেছিলেন সেই কথাগুলো দিয়ে এই আলোচনা আজ শেষ করা যেতে পারে –
‘যে কেউই যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে আসে, তার আগেই তার জানা- শোনাকে শরীরে মিশিয়ে নিয়ে তবেই আসে। সে যদি সত্যি সত্যিই তত্ত্ব-দর্শন এসব বুঝে থাকে, তবে তার কাজে তা পানির মতোন মিশে থাকবে। ভেসে উঠবে না। আর রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনার প্রতিক্রিয়াগুলো যখন খবরের কাগজ বা নিউজে মৃত ঘোষিত হয় তখনই তা আস্তে আস্তে সিনেমায় ঢোকা শুরু করে। আর যদি এর উল্টোটা হয়, অর্থাৎ কোনোরকম পরিপক্ক হওয়া ছাড়াই যদি তা সিনেমায় চলে আসে তবে তা লিফলেট-স্লোগান ছাড়া কিছুই হয় না।
আমি মনে করি শিল্প হবে সময়উন্মুক্ত। যেমন এই ইরানের কথা ধরো এখানকার সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুগুলো মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। এখন এটা, আরেকটু পর আরেকটা। এখন শিল্পী যদি এই সময়টাকে ধরতে চায় অথবা ধরো, একদম মৌলিক যে বিষয়গুলো যেমন মনুষ্যত্ব, মানবতা ইত্যাদির দিকে তাকায় কোনটার আবেদন দীর্ঘস্থায়ী হবে?

x