টিনেজ সন্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন

রুহি আফরোজ

রবিবার , ১ জুলাই, ২০১৮ at ৮:১০ পূর্বাহ্ণ
56

অবশ্যই অভিভাবক সন্তানের ভাল চান, কিন্তু তাঁদের চাওয়াটা যখন সন্তানের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় অথবা অভিভাবকের চাওয়াটা যখন সন্তানকে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য করে, ঠিক তখনি হিতেবিপরীত হয়।

টিনেজার বলতে আমরা ১৩১৯ বছরের বাচ্চাদের বুঝি। ৬৭ ঘণ্টা একটা টিনেজার স্কুল/ কলেজে থাকছে এবং এখানে বিভিন্ন পরিবেশপরিবার থেকে আসা ছেলেমেয়েদের সাথে মিশছে। আবার এই বাচ্চাটিই যাচ্ছে গানের, নাচের, ছবি আঁকার অথবা ক্যারাটে ক্লাসে। এই প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে আপনার সন্তানটি কিছু না কিছু শিখছে। যাদের সাথে মিশছে তাদের কাছ থেকেও কিছু না কিছু শিখছে। বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে যা যা শিখছে সব যে ভাল তা কিন্তু নয় , আবার সব যে খারাপ শিখছে তাও কিন্তু নয়।

প্রতিষ্ঠানগুলো তাকে সঠিক শিক্ষা দেবার চেষ্টা করে। কিন্তু সব বাচ্চা এক রকম নয়, কেউ হয়তো খুব সাবলীলভাবে সব উপদেশ গ্রহণ করছে ও কাজে লাগাচ্ছে। কেউ বা পারছে না , কারো বা ইচ্ছে করছে না করতে। কখনো কি ভেবে দেখেছেন কেন এমন হচ্ছে আপনার সন্তানটির সাথে? কেন সে পরীক্ষায় খারাপ করছে অথবা আগে যেই কাজটি করতে ভালবাসত, আপনার সন্তানটি এখন কেন আর সেই কাজে আগ্রহ পাচ্ছে না? আদৌ কি কাছে বসিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেছেন, কোথাও কি কোন সমস্যা হচ্ছে তার? হয়তো করেছেন উত্তর পান নি, হয়তো ভেবেছেন করবেন কিন্তু সময় হয়ে ওঠে নি জিজ্ঞেস করার।

আমাদের আজকের লেখাটি সেইসব বাবামায়ের জন্য যারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, কিভাবে আপনার টিনেজ সন্তানের সাথে দৃঢ় করবেন মানসিক সম্পর্ক।

সাধারণত বয়ঃসন্ধির সময় হরমোন এবং শারীরিক পরিবর্তনের কারণে ব্যক্তির ব্যবহারেও বেশ পরিবর্তন আসে। বয়ঃসন্ধির সময় যেসব শারীরিক পরিবর্তন ঘটে তাও বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটায়। চলমান শারীরিক পরিপূরক প্রক্রিয়া শিশুদের চাহিদা, আগ্রহ এবং মেজাজ পরিবর্তন করার জন্য সরাসরি শরীর ও মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। চিন্তা করে দেখুন আপনার ছেলেটি, যার ত্বক ছিল কোমল, গলার স্বর ছিল স্বাভাবিক। হঠাৎ তার গলার স্বর হয়ে গিয়েছে ভারী , মুখে দাড়ি অথবা আসলো আরও কিছু শারীরিক পরিবর্তন। ঠিক তেমনি শারীরিক পরিবর্তন হয়েছে আপনার মেয়ে সন্তানটিরও । যেই মেয়েটি আগে হয়তো খুব হইহুল্লোড় করে বেড়াতো, সেই মেয়েটি তার নিজের পরিবর্তন গুলোর সাথে খাপ খাওয়াতে পারছে না । শারীরিক পরিবর্তনটি আপনি চোখে দেখছেন, মানসিক পরিবর্তন কি দেখতে পাচ্ছেন? আপনি হয়তো দেখছেন আপনার সন্তানটি হঠাৎ করে লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে গিয়েছে, আপনার বেশিরভাগ কথাতে রিঅ্যাক্ট করছে, অনেক সময় মিথ্যা বলছে কিছু নিয়ে, লুকাচ্ছে কোন বিষয়, যেই বন্ধুদের সাথে হয়তো আপনি বলছেন কম মিশতে তাদের সাথেই বেশি মিশছে, তর্ক করছে কারণে অকারণে। এক বাড়িতে থেকে মানসিকভাবে যোগাযোগ বিন্নি হয়ে যাচ্ছে সন্তানের সাথে। পরিবার এবং সহকর্মীদের সঙ্গে আপনার সন্তানের সম্পর্কে নাটকীয় পরিবর্তন এবং বদল আপনাকে হয়ত ভাবাচ্ছে কিন্তু আপনিও হয়ত বুঝতে পারছেন না কি করবেন। আপনি হয়তো লক্ষ্য করবেন যে আপনার সন্তান তার পরিবারের সাথে কম সময় ব্যয় করতে চায় এবং তার বন্ধু এবং সহকর্মীদের সাথে আরও বেশি সময় কাটাতে চায়। কিশোর বয়সে বাবামায়েদের এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে কিছু দ্বন্দ্ব স্বাভাবিক, কারণ শিশুরা তখন আরও স্বাধীনতা চায়। কিশোর বয়সে অতিরিক্ত মেজাজ দেখানোর অন্যতম একটি কারণ হল যে, তাদের মস্তিস্ক ও শারীরিক পরিপক্বতা। শিশুদের ২০ বছরের মধ্যে যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের মস্তিষ্ক সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়, এই অসম্পূর্ণ মস্তিষ্কের উন্নয়নগুলো অনেক জ্ঞানীয় এবং মানসিক অস্পষ্টতার জন্য দায়ী। যার জন্য বাবামা সহজে হতাশ হতে পারেন। মাতাপিতাকে তাদের সন্তানদের এই অপ্রাপ্ত মস্তিষ্কের গঠন, ঘুম পরিবর্তন এবং পরিবর্তিত হরমোন এবং মানসিকতা বুঝতে হবে। আপনার হয়ত মনে হতে পারে যে আপনার সন্তান এখন আপনার থেকে ভিন্নভাবে কিছু দেখতে শিখছে। একটা ১৪/১৫ বছরের ছেলে বা মেয়ের কাছ থেকে আপনি কিন্তু পরিপূর্ণ বয়সের মানুষের ব্যবহার আশা করতে পারেন না। যে ছেলে/মেয়েটি নিজেই সন্দিহান তার পরিবর্তনগুলো নিয়ে , তার কাছ থেকে পরিপক্ক ব্যবহার আশা করাটা কি বোকামি না? পরিবার, মাবাবা কিন্তু সন্তানের সবচেয়ে আস্থার জায়গা। এই কথাটি আপনার কিশোর বয়সের সন্তানের কাছে বোধগম্য হবে না, এটাই স্বাভাবিক। শুধু কথায় না বরং কথায় এবং কাজের সংমিশ্রণে সন্তানকে বোঝান এই ব্যাপারটি। আপনার কিছু বন্ধু সুলভ আচরণই পারে আপনার প্রিয় সন্তানটির জীবনের এই কঠিন সময়টিকে সুন্দর করে তুলতে।

মনে রাখবেন, আপনিও কোন একসময় কিশোর ছিলেন। আপনার কিশোর আচরণের অনুভূতির অভাবনীয় ব্যাপারগুলো কল্পনা করুন এবং ভাবুন যে আপনার কিশোর সন্তানটি কেমন অনুভব করছে, তাদের দৃষ্টিকোণ বুঝতে চেষ্টা করুন। যখন আপনি সন্তানদের অনুভূতি অনুধাবন করেন, তারা মনে করে যে তাদের অনুভূতি, ধারণা এবং মতামতকে স্বাধীনভাবে আপনি ভাগ করতে ইচ্ছুক।

x