টাকার খনিতে র‌্যাব-পুলিশের অভিযান

স্থিতধী বড়ুয়া

মঙ্গলবার , ৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ
240

অপরাধ বিজ্ঞানে ‘মুডাস অপারেন্ডি’ বলে একটি ইংরেজি শব্দ আছে যার বাংলা আভিধানিক অর্থ- ‘ক্রিয়া পদ্ধতি’। সহজ বাংলায় ‘অপরাধীদের জীবন ধারণ পদ্ধতি বলা হয়’। অপরাধ বিজ্ঞানের এই সংজ্ঞা অনুযায়ী পেশাগত অপরাধীরা যে যে অপরাধে পারদর্শী এর বাহিরে অন্য কোনো অপরাধ করে না। যারা ডাকাতি করে, তারা কখনো চুরি করে না। এমনকি, রাস্তা-ঘাটে, নির্জন স্থানে কাউকে বাগে পেলেও তার সর্বস্ব লুট করে না। পেশাগত খুনীরা টার্গেট খুন ছাড়া বাধাগ্রস্ত না হলে আর কাউকে খুন করে না। ডাকাতরা ডাকাতির সময় অকুস্থলে অসহায় সুন্দরী গৃহবধূ কিংবা যুবতী মেয়ে বাগে পেলেও তাকে ধর্ষণ করে না। এইসব পেশাগত অপরাধীরা নৈতিক চরিত্রের স্খলনজনিত কোনো অপরাধের ধারে কাছেও যায় না। এখনকার ক্ষমতাশালী এবং সম্পদশালী ভদ্রবেশী অপরাধীদের ধারে কাছে এরা অসহায়। একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান সময়ের বাংলাদেশে অপরাধ বিজ্ঞানের এই সংজ্ঞা এখন অচল। এখন যে ডাকাতি করে সে ছিনতাইও করে, ধর্ষণ করে এবং গণধর্ষণে সহায়তাও করে। সে খুনও করে এবং ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্বও দেয়। তাকে আবার সুসজ্জিত পোশাক-আশাকে ভদ্র সমাজে মেলামেশা করতেও দেখা যায়।
নগর সভ্যতার ক্রমবিকাশ এবং অতিদ্রুত দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সাথে অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে একবিংশ শতাব্দীর এই বাংলাদেশে দুষ্ট ক্ষতের মত সমাজে গঁজিয়ে উঠা এক শ্রেণির নব্য সর্ববিদ্যায় পারদর্শী রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাশালী অপরাধীদের অপকৌশলের কাছে মার খেয়ে আগের দিনের অপরাধীরা তাদের খানদানী পেশা- চুরি, ডাকাতি এবং ছিনতাই ছেড়ে শ্রমনির্ভর পেশা এখন বেছে নিয়েছে বলে জানা যায়। ক্ষমতাবানদের আশীর্বাদপুষ্ট এইসব অপরাধীরা বিগত এক দশকের মধ্যে রাস্তা থেকে উঠে এসে অঢেল সম্পদ, গাড়ি-বাড়ি এবং ঢাকার অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছে। আগের দিনের অপরাধীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে এখনকার অপরাধীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের এখন কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
এখনকার ক্ষমতাবান অপরাধী চক্র অপরাজনীতির সুশীতল ছত্রছায়ায় ব্যাংক লুট, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, বিদেশে অর্থ পাচার, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, ক্যাসিনো জাতীয় অত্যাধুনিক জুয়ার আসর সহ অন্ধকার জগতের সব ধরণের অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িত এমন সংবাদ গণমাধ্যম হতে প্রতিনিয়ত পাওয়া যায়। এদের কার্যকলাপে অসহায় সাধারণ দেশপ্রেমিক জনগণের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী এবং পরগাছা এসব নেতার অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা খর্ব করতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে র‌্যাব, পুলিশ ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট সহ সারা বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে নামী-দামী ঐতিহ্যবাহী সব ক্লাবগুলোতে গত কয়েকদিন যাবৎ অভিযান পরিচালনা করে অত্যাধুনিক জুয়ার আসর ক্যাসিনো সহ সব ধরণের জুয়াখেলা বন্ধ করে দেন। এই অবৈধ জুয়ার আসরের মধ্যমণি যুবলীগ নেতা জি.কে শামীম গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও কৃষকলীগ নেতা শফিকুল আলম সহ আরো কয়েকজন গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ গ্রেফতার হয়। তাদের কাছে অত্যাধুনিক ক্যাসিনো বোর্ড সহ জুয়াখেলার বিভিন্ন সামগ্রী, মদ এবং বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও কয়েক কোটি টাকার এফডিআর পাওয়া যায়। গণমাধ্যম হতে আরো জানা যায়- পুলিশের হাতে গ্রেফতারের ভয়ে আরো অনেক রাঘববোয়াল ইতিমধ্যে গা ঢাকা দিয়েছে এবং অনেকেই এখন গ্রেফতারের আতঙ্কে রয়েছে। বর্তমান সময়ে এই সংবাদ টক অব দি কান্ট্রি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর উপর প্রতিদিন বিভিন্ন চ্যানেলে টক-শো হচ্ছে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র প্রশংসায় সবাই এখন পঞ্চমুখ। এই শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকুক এটা সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা। গত মঙ্গলবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু এবং রুপম ভূঁইয়ার বাড়ি থেকে ৫ কোটি ৫ লাখ টাকা, ৮ কেজি স্বর্ণ ও ৬টি আগ্নেয়াস্ত্র র‌্যাব তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করেছে। যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট এবং তার স্ত্রী, এম.পি নুরুন্নবী শাওন ও তার স্ত্রীর ব্যাংক একাউন্টস্‌ জব্দ করতে ইতিমধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে (দৈনিক কালের কণ্ঠ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। দুদকও এর মধ্যে ক্যাসিনো মালিক এবং টেন্ডারবাজদের সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমেছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। দুর্নীতি সহ অপরাধের তথ্য থাকায় ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট সহ ১৪ নেতার বিরুদ্ধে দেশত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে (দৈনিক প্রথম আলো ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ অনলাইন)।
টিনের ঘর থেকে রাজধানী গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও রূপম ভূইয়া গত তিন বছরে ১৫টি বাড়ির মালিক হয়েছে এমন সংবাদও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আরো এক যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন হোটেল বয় থেকে এখন কয়েকশত কোটি টাকার মালিক। সে এখন ৩টি বাড়ি ও বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাটের মালিক এমন সংবাদও গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। শুদ্ধি অভিযান চলমান থাকলে যুবলীগের আরো অনেক নেতার থলে থেকে আরো অনেক টাকার অবৈধ সম্পদের হিসাব বের হয়ে আসবে এতে সন্দেহ থাকার কোনো কারণ নাই। আরব্য উপন্যাসের আলাদিনের প্রদীপের ছোঁয়া পেলেও বোধহয় এতো দ্রুত অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া যেতো না। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদে আরোগ্য লাভের প্রয়োজন ব্যতীত মদ, মাদক জাতীয় পানীয় এবং ১৮ (২) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী গণিকাবৃত্তি এবং জুয়াখেলা বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এসব অনৈতিক কাজের ঘোর বিরোধী ছিলেন। অথচ এক শ্রেণির যুবলীগ নামধারী পরগাছা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আবাহনী, মোহামেডান, আরামবাগ, দিলখুশা, মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াচক্র সহ অনেক নামী-দামী ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে দিনরাত ক্যাসিনো সহ মদ, জুয়ার আসর বসিয়ে ঐতিহ্যবাহী এইসব ক্লাবের গায়ে কলঙ্কের কালিমা লেপন করে দিয়েছে। শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে এসব ক্লাবের ঐতিহ্য পুনরায় ফিরিয়ে আনার এই মুহূর্তে একান্ত প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই শুদ্ধি অভিযান কিন্তু থেমে নেই। তিনি জুয়ার আসরের শুদ্ধি অভিযানের কয়েকদিন আগে ছাত্রলীগের মধ্যেও শুদ্ধি অভিযান শুরু করেন। তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানীকে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ মাদক সম্পৃক্ততা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে সংগঠনের ১নং সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং ১নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য্যকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন (দৈনিক কালের কণ্ঠ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম ছাত্র সংগঠন। ১৯৪৮ সালে ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলী হলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ছাত্রলীগের জন্ম হয়। ছাত্রলীগের একটি গৌরবোজ্জ্বল সোনালী অতীত রয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে আরম্ভ করে শিক্ষা আন্দোলন, আইয়ুবের বিরুদ্ধে ৬৯ এর গণঅভ্যূত্থান, স্বাধিকার আন্দোলন এবং সর্বশেষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রলীগের একটি প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে। ৬০ থেকে ৮০ দশকে যারা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছিলেন তারা আজ প্রায় সবাই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ। মুক্তি সংগ্রামের সময় এসব নেতৃত্বের অবদান জাতি কোনোদিন ভুলতে পারবে না। অথচ স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের এই অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগের কার্যকলাপ আজ সবার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই সংগঠনের অনেক নেতা আজ দলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি সহ নানা অপকর্মের সাথে জড়িত এমন সংবাদ গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এখনকার মত ঢালাও ভাবে দুর্নীতির অভিযোগ কারো বিরুদ্ধে তখন শোনা যেতো না। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে থাকাকালীন সময়ে ছাত্রলীগ নেতাদের দেশপ্রেম স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়েছে। তারা প্রায় সবাই আজ বৃহত্তর সিলেটে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সেই ছাত্রলীগ আর এই ছাত্রলীগের মাঝে আজ যোজন যোজন ব্যবধান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ছাত্রলীগের বর্তমান বর্ষীয়ান নেতারা এদের কার্যকলাপে লজ্জিত না হয়ে পারে না। শুধু কোমল ছাত্রদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। স্কুল-কলেজ এবং দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে যারা শিক্ষকতা করছেন তাদের অনেকে এখন অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত এমন সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। গুরু যদি অনৈতিক কাজে জড়িত থাকে শিষ্যরা কার কাছে নৈতিকতা শিখতে যাবে? এই প্রশ্নের কি কোনো উত্তর আমাদের শ্রদ্ধেয় মানুষ গড়ার কারিগররা দিতে পারবেন?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি দমনে যখন শুদ্ধি অভিযানে যখন একবার হাত দিয়েছেন তখন দুর্নীতিতে ছেয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ঘুণে ধরা সমাজের সব সেক্টরের দুর্নীতি বন্ধ করতে সচেষ্ট হবেন জনগণ এমনটা প্রত্যাশা করে। মানুষ লোভ-মোহের ঊর্ধ্বে নয়। সব সমাজে দুর্নীতি আছে এবং থাকবে। ইংল্যান্ড-আমেরিকার মত উন্নত বিশ্বেও দুর্নীতি আছে। তবে সহনীয় মাত্রার মধ্যে থাকলে মানুষের মনে কোনো ক্ষোভ থাকে না। বাংলাদেশে টাকা এখন আকাশে উড়ছে। নব্য টাকাওয়ালাদের দাপটে সাধারণ জনগণের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এখনই এর রেশ টেনে ধরার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে এই মুহূর্তে এটা সম্ভবপর হবে এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

লেখক : কলাম লেখক, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা

x