টাইফয়েড জ্বর ।। জেনে রাখুন

ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস

শনিবার , ৩ আগস্ট, ২০১৯ at ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ
109

আমরা খাবার খাই স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য, দেহ বৃদ্ধির জন্য আর রোগ প্রতিরোধের জন্য। সে খাবার চাই সুসম, রোগজীবাণুহীন আর স্বাস্থ্যসম্মত। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়ে উঠে না আর ফলশ্রুতিতে আমরা রোগাক্রান্ত হই। খাবার আর পানিবাহিত রোগের লিস্ট অনেক লম্বা। তার মধ্যে টাইফয়েড একটি অন্যতম প্রধান রোগ যা খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জীবাণুঘটিত সংক্রামক রোগের মধ্যে টাইফয়েড মানুষের হাসপাতালে ভর্তিরও অন্যতম প্রধান কারণ।
কেইস স্টাডি এক : জসিম; বয়স ১৬। গত সাত দিন ধওে তার জ্বর। জ্বরের প্রকোপ ধীরে ধীরে বাড়ছে। সঙ্গে খবারে অরুচি, খিধা মন্দা, বমি বমি ভাব। পেট ব্যথা পায়খানা হচ্ছে না। ডাক্তারের কাছে গেলে তাকে দেখে ডাক্তার বললেন তার টাইফয়েড জ্বর হবার সম্ভাবনা। তিনি কিছু টেস্ট দিলেন আর ওষুধ খেতে দিলেন।
কেইস স্টাডি দুই : সুমাইয়া; বয়স ৪২। গত ১৫ দিন ধরে জ্বর। জ্বরের শুরুর তিন দিনের মধ্যে ওষুদের দোকানে গেলে তাকে একটা প্যারাসিটামল আর অ্যাণ্টিবায়োটিক দেয়া হয়। জ্বর কিছুটা কমা শুরু করলে ওই অ্যান্টিবায়োটিক তিন দিন খেয়ে বন্ধ করে দেন। পরে দেখা গেল জ্বর আরো বাড়তে লাগলো। সাথে বমি, পাতলা পায়খানা ও পেট ব্যথা আর খাবারে অরুচি। ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে বললেন। ডাক্তার আরও বললেন, তাকে ইঞ্জেকশান দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।
সালমনেলা টাইফি আর প্যারাটাইফি দিয়ে টাইফয়েড জ্বর হয়। এই জীবাণু খাবার বা পানীয় জলের মাধ্যমে আমাদের খান্যণালিতে প্রথমে প্রবেশ করে। সেটা জীবনচক্রের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে অন্ত্রের লিম্ফগ্রন্থিতে জমা হয়। সেখানে বংশবৃদ্ধিকালে দেহে জ্বর চলে আসে, বমি হয়, খাবারে অরুচি তৈরি হয়, কোষ্টকাঠিণ্য বা পাতালা পায়খানা হয়। পেটে ব্যথা টাইফয়েড জ্বরের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষণ। টাইফয়েড জ্বরের বৈশিষ্ট্য হল এই জ্বর যতো দিন যায় ধিরে ধিরে বাড়েতে থাকে (স্টেপ ল্যাডার প্যাটার্র্ন) চিকিৎসা না নিলে বা দেরি করলে অন্ত্রে আলসার বা ক্ষত হতে পারে এমনকি অন্ত্রণালি ফুটো হয়ে জীবন সংশয় পর্যন্ত হতে পারে। বেশি দেরি হলে মনোবৈকল্যও হতে পারে। তবে অ্যান্টিবায়োটিকের সহজলভ্যতা আর রোগ নির্ণয়ের দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে অন্ত্র ফুটো হওয়া বা মনোবৈকল্য ইত্যাদি জটিলতা ইদানিং আর তেমন দেখা যায় না।
উপসর্গ দেখে আর রোগীর জ্বরের ধরন বুঝে ডাক্তাররা টাইফয়েড জ্বর ডায়াগ্নোসিস করেন। তবে বর্তমানে নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা পদ্ধতি চলে এসেছে। জ্বর আসার প্রথম সপ্তাহে সকল পরীক্ষার মান স্বভাবিক থাকতে পারে, তবে ব্লাড কালচার নামক পরীক্ষাটি এ সময়ে রোগ নির্ণয়ে অন্যতম সহায়ক।
টাইফয়েড রোগের চিকিৎসা হল নির্দিষ্ট গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক পূর্ণ মাত্রায় আর নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত সেবন করা। তা না হলে অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যক্ষমতা হারায় আর রোগ নিরাময় কঠিন হয়ে পড়ে। রোগের তীব্রতা ভেদে এরূপ অ্যান্টিবায়োটিক মুখে খাবার ওষুধ হিসেবে দেয়া যায় বা কখনো কখনো জ্বরের তীব্রতা, রোগীর দৈহিক অবস্থা বিবেচনায় রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে ইঞ্জেকশানের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়টিক দিতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক সেবন ডাক্তারের নির্দেশ মত না হলে ওষুধ প্রতিরোধী বা র‌্যাজিসটেন্ট জীবাণু তৈরি হয় যা পরবর্তিতে নির্মূল করা কঠিন হয়।
ফিরে দেখা : প্রথম আর দ্বিতীয় রোগী দুজনেরই টাইফয়েড হয়েছে। প্রথম রোগীর চিকিৎসায়, মুখে খাবার অ্যান্টিবায়োটিক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেবন করলে সুস্থ হয়ে যাবে। দ্বিতীয় রোগীর মাল্টিড্রাগ রেজিসস্ট্যান্ট টাইফয়েড হবার সম্ভাবনা। অ্যান্টিবায়োটিক স্বল্প সময়ে খেয়ে বন্ধ করে দেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি কও ইেঞ্জেকশানের মাধ্যমে ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে আর তা নির্দিষ্ট ডোজে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেবন করতে হবে।
সমাজিক সচেতনতা টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে সহায়ক। ফোটানো পানি খাওয়া, বাসি খাবার না খাওয়া, গরম করে খাবার খাওয়া ইত্যাদি অভ্যাস টাইফয়েড প্রতিরোধে কাজে লাগে। এই বর্ষায় খাবার ও পানি বাহিত রোগ টাইফয়েড থেকে বাঁচতে হলে সচেনতার বিকল্প নেই।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ

x