ঝের্‌ফা, বেডি বা মাইয়্যে ফোঁয়া: রোহিঙ্গা নারী নিগ্রহের সামান্য কথা

মাহমুদা খাতুন

শনিবার , ৬ এপ্রিল, ২০১৯ at ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ
89

শুরুতেই একটু গল্পগাছা হোক। যে গল্পটা শোনাতে চাইছি, তা আমি এতবার এত ফর্মে শুনেছি যে তা মুখস্থ হয়ে গেছে। গল্পটা এক বিবাহযোগ্য কন্যার পিতার জবানীতে। গল্পের বাবা, বিয়ের দিন কাজী সাহেব বিয়ে পড়িয়ে দেয়ার পর বরের হাত চেপে অনুরোধ করছেন ‘অ ফুত্‌…আঁর ঝের্‌ফারে অনর আমানত গরি দিয়্যি। আঁর মাইয়্যের ফেট খনঅদিন খালি না রাখিবেন অনে!’ বর কথার মাজেজা ধরতে পেরে মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো, ‘অনে আঁরে আমানত দিঅন, আঁই খনোদিন এই আমানতর খেয়ানত ন গইজ্জম।’ এবং তারপর ইতিহাস! পরবর্তী দশ বছরে সেই কন্যা বা নারীর পেট খালি থাকেনি, পর পর দশটি সন্তান পেটে ধরে সে!
গল্পটিকে আমরা ইরোটিক, অশিষ্ট, অবাস্তব, অবান্তর ইত্যাদি অভিধা দিতে পারি। কিন্তু সত্য এই, যে, গল্পটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পুরুষ সদস্যদের কাছে অত্যন্ত চালু এবং হাস্যরসাত্মক একটি গল্প। বিভিন্ন চায়ের আড্ডায় এই গল্প ফিরে ফিরে আসে এবং সেই বোকা বরের বোকামি নিয়ে হাসির ফোয়ারা ছোটে। কিন্তু গল্পটি যে বার্তা দেয় তাকে আমরা উপেক্ষা করব কোন উপায়ে? কিংবা গল্পটি যে এই জনগোষ্ঠীর পুরুষ সদস্যদের মর্মে গেঁথে গেছে এবং তার এস্তেমালও তারা করছে, তা-ই বা উড়িয়ে দেবো কোন যুক্তিতে? বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোয় যারা গেছেন বা যারা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন যে এই জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে নির্যাতিত প্রতিনিধি হচ্ছেন নারীরা। যাদের জন্য মানবিকতার নুন্যতম বরাদ্দও রাখেন না তাদের বাবা-ভাই বা পরিবারের পুরুষ সদস্যরা।
শরণার্থী শিবিরগুলোতে নারী নির্যাতন বা মানবিকতা লুণ্ঠনগুলো আসলে কেমনভাবে ঘটছে? গল্প না বলে স্রেফ এক লাইনেই বলে যাই পরপর। এবং বলে রাখা ভাল, এই তথ্যগুলো সমর্থিত-অসমর্থিত-প্রকাশিত-প্রত্যক্ষদর্শী এরকম বিভিন্ন সূত্র হতে পাওয়া। ক্যাম্পগুলোর পুরুষ সদস্যরা একাধিক নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ‘ক’ ক্যাম্পের একজন ‘ঘ’, ‘চ’, ‘ট’ ক্যাম্পে গিয়ে প্রায় কাছাকাছি সময়ে ভিন্ন তিনজনকে বিয়ে করছে। এবং এটি তারা জেনেবুঝে করছে, ক্ষেত্রবিশেষে তা সেই পুরুষদের কাছে শৌর্যবীর্য প্রকাশের মতোই। উগ্র মৌলবাদী ধর্মীয় নেতা এবং বক্তারা তাদের বক্তব্যে বা প্রচারে নিয়মিত এ-বিষয়ক হাদিস বা মাসলা পরিবেশন করে আসছেন যা পুরুষ সদস্যরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন বৈকি! রোহিঙ্গা বাবা-মায়েরা-ও এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে কোনোমতে বিবাহযোগ্য বা কিশোরী (বিয়ের বয়স হয়নি এমন) কন্যাটিকে বিদায় করে দায়মুক্ত হতে চান বটে! দুঃখজনক হলেও সত্য, এই জনগোষ্ঠীর সোমত্ত নারী সদস্যরাও এইসব ফেনাটিক হুজুরদের ‘দেবতা’ জ্ঞান করার পাশাপাশি তাদের বক্তব্যকে বিশ্বাস করে। এবং বহুবিবাহকে হালাল ভেবে মেনে নিচ্ছে। কিন্তু এটিই টেনে আনছে নারী পাচারের মতো আরেকটি ভয়ঙ্কর বিষয়কে। ক্যাম্পের মসজিদ থেকে বা এমনি মাইকে হররোজ শোনা যায় নারী এবং কিশোরীদের নিখোঁজ সংবাদ। পাচার হয়ে যৌনপল্পি বা গৃহকর্মীর কাজে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রক্রিয়ায়ও শুরু হয়ে গেছে। আবার একজন পুরুষের ভিন্নভিন্ন ক্যাম্পে থাকা স্ত্রীদের একের পর এক সন্তান জন্মদানও ঘটছে। সহজেই অনুমেয় যে ২০১৭ সালে আসা এই জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যার সাথে গত দেড়/দুই বছরে আরও যোগ হয়েছে প্রায় তিনলক্ষ শিশু। এটির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি ভয়াবহ সমস্যা, এইডস। ধরা যাক, বিদেশ ফেরত কোনো এক রোহিঙ্গা পুরুষ বা নারী সদস্য তা বহন করে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ফ্রি মিক্সিং-এর হাত ধরে তা এখন এতটাই বিস্ফোরণোন্মুখ যে যে-কোনো মুহূর্তে তা মূল ভূখন্ডেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ওদিকে পাচার হয়ে যাওয়া নারীদের কেউ কেউ ফিরেও আসছেন ক্যাম্পে। যারা বিভিন্ন ট্রমায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। অত্যধিক শিশু জন্মদান বাড়াচ্ছে নারীদের পুষ্টিহীনতায় ভোগা থেকে শুরু করে অন্যান্য জটিল রোগ, বাড়িয়ে দিচ্ছে মাতৃমৃত্যুর হার, বাড়িয়ে দিচ্ছে শিশু অকালমৃত্য হার। বলাবাহুল্য রোহিঙ্গা নারীরা মিয়ানমারে তো বটেই, শরণার্থী হয়ে ভিনদেশে আসার পরও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় আক্রান্ত। তাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। এবং তাদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানোর চেষ্টাও খুব একটা দৃশ্যমান নয়।
পাঠক, আমাদের কেউ কেউ বা অনেকেই এইবেলা ভাবতে পারেন যে বাংলাদেশের মূল জনগোষ্ঠীর নারী সদস্যরাই যেখানে সংখ্যাতীত নির্যাতন আর অবমাননার শিকার সেখানে একটি আশ্রিত জনগোষ্ঠীর নারী সদস্যদের নিয়ে এই মায়াকান্না কেনো? সহজ একটা যুক্তি দিই। যখন কোনো রাষ্ট্র মানবিকতা প্রদর্শন করে বহিরাগত কোনো জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয় তখন সেই আশ্রিত জনগোষ্ঠীর সদস্যরাও নানা জরিপ, নানা সূচকের অংশ হয়ে ওঠে যা উপেক্ষা করার জো নাই। ফলে বিশ্বব্যাপী নারী বিষয়ক নানা সূচক যেমন: নারী পাচার, ধর্ষণ, অত্যধিক গর্ভধারণে বাধ্য হওয়া, গুম, খুন, শারীরিক নির্যাতন ইত্যাদি ইত্যাদি যখন প্রকাশিত হয় তখন এই রোহিঙ্গা নারী সদস্যরা সেই সূচকের হার বাড়াতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি দেশভিত্তিক সূচক প্রকাশের ক্ষেত্রেও তা বাংলাদেশের অবস্থানকে আশঙ্কাজনকভাবে উপরের দিকে ঠেলে দেয়। আর ঠিক এ-কারণেই, সরকারের অনেক সাফল্য’র পরেও নারী বিষয়ক বিভিন্ন পরিসংখ্যানে আমরা পিছিয়ে রইবো। আমাদেরকে এখনই এ-বিষয়ে ভাবা শুরু করতে হবে, এসবের একটি কাম্য অবস্থান নির্ধারণে পরিকল্পনা নিতে হবে। আর আশ্রয়দাতা দেশ হিসেবে সেটি বাংলাদেশকেই করতে হবে। দেশিয় বা আন্তর্জাতিক বেসরকারি সাহায্যসংস্থাগুলো এক্ষেত্রে সহযোগীর ভূমিকায় অংশগ্রহণ করতে পারে।

x