ঝুঁকিপূর্ণ ১৭ পাহাড় এক মাসের মধ্যে দখলমুক্ত করার নির্দেশ

অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার হুমকি ।। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা

আজাদী প্রতিবেদন

বুধবার , ১৭ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৩৪ পূর্বাহ্ণ
126

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সরকারি সংস্থা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও চট্টগ্রাম ওয়াসা, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা ও দুর্বৃত্তায়নের সাথে জড়িত জনপ্রতিনিধিদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করলে উল্লেখিত সরকারি সংস্থা এবং অবৈধ সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বল প্রয়োগকারী রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের হুমকি দেওয়া হয়। তাঁরা এক সুরে বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে এমন নেতৃত্বকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ১৯তম সভায় এ হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়। সভায় ঝুঁকিপূর্ণ ১৭ পাহাড় আগামী এক মাসের মধ্যে অবৈধ দখলমুক্ত করতে মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ওইসব পাহাড়ে বসবাসকারীদের মধ্যে অবৈধভাবে দেওয়া গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সভায়। সভায় বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, দুর্যোগে অকাল মৃত্যু ঠেকানো প্রশাসনের কাজ। একজন মানুষও যাতে মাটি চাপা না পড়ে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে সংশ্লিষ্ট সকলকে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে কিছু ‘মাস্তান’ পাহাড়ে বসবাসকারীদের নানা অভয় দেখিয়ে বসবাস করায়। তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেয়। যেসব মাস্তান বা দুর্বৃত্ত পাহাড়ে বসবাস করতে প্ররোচনা দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। যত বড় নেতা হবে হোক, তালিকা করে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এরা দেশের ক্ষতি করছে। মানবিক দিক বিবেচনায় প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন চাইলে প্রকল্প নিতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, যারা রাজনীতির নামে এ ধরনের কাজ করবেন তাদেরকে চিহ্নিত করে কারাগারে ঢোকাতে হবে। এ দুর্বৃত্তরা প্রেসার দিয়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির লাইন দেয় পাহাড়ে। তাদের ধরে ফেলতে হবে। পাহাড়ের হালনাগাদ তালিকায় এসব দুর্বৃত্তের নাম অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, আজকের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে নির্বাচনের (মেয়র) আগে আমি এসব লোককে আবাসনের জন্য বলেছিলাম। উনি আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা এগুতে পারিনি।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা ৩০ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু করছি, রূপপুর পরমাণু কেন্দ্র করছি, টানেল করছি চট্টগ্রামে। তাঁর জন্য এসব মানুষকে আবাসনের আওতায় আনা কোনো ব্যাপার নয়।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, ইউটিলিটি সার্ভিস প্রোভাইডার (কেজিডিসিএল-পিডিবি-ওয়াসা) যারা আছে, তাদের কিন্তু এখন থেকেই কাজ শুরু করতে আমরা চিঠি দিয়েছি। তারা যদি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের কাজ শুরু না করে, এসব পাহাড়ে যদি দুর্ঘটনায় কারো প্রাণহানি ঘটে, তাহলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আমি বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করব। এক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই।
তিনি আরো বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ১৭টি পাহাড়ের মধ্যে ১০টি পাহাড় ব্যক্তি মালিকানাধীন। দুর্যোগকালীন ছাড়া এসব পাহাড়ে জেলা প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে পারে না। তাই ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়গুলো রক্ষণাবেক্ষণের, সেখানে অবৈধ স্থাপনা সরানোর দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মালিকদের। মালিকরা যদি তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন না করেন তাদের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, চসিক, গণপূর্ত বিভাগ, রেলওয়েসহ সরকারি মালিকানাধীন যে পাহাড়গুলো আছে তা রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্টদের আরো তদারকি প্রয়োজন। এসব পাহাড়ে যারা অবৈধভাবে ঘর তৈরি করে ভাড়া দেয়, তাদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাহাড়ে অবৈধভাবে বাস করা কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তারাই দায়ী থাকবে। মানুষের জীবন নিয়ে কাউকে আমরা খেলা করতে দেব না।
তিনি জানান, বর্ষার সময় আমরা যেকোনো মূল্যে উচ্ছেদ করলাম। বর্ষার পরে আবার তারা ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করল। এভাবে করতে থাকলে স্থায়ী সমাধান আসবে না। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো বছরের পুরোটা সময় অবৈধ স্থাপনামুক্ত রাখতে হবে। যাতে সেখানে কেউ বসবাস করতে না পারে। এ জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা আমরা দেব।
তিনি বলেন, এতগুলো পরিবারকে শহরের মধ্যে ঘর বানিয়ে পুনর্বাসন সম্ভব নয়। এভাবে করতে থাকলে অন্যরাও লোভে পড়ে এখানে চলে আসবে। গৃহহীনদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। দেশের একটি মানুষও যাতে গৃহহীন না থাকে সে জন্য একটি বাড়ি, একটি খামার, গুচ্ছ গ্রামসহ নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এখানে যারা উচ্ছেদ হবেন তারা এসব প্রকল্পের সুবিধা নিতে পারেন।
সভায় পাহাড়ে বসবাসকারীদের তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, নগরের সরকারি-বেসরকারি ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৭টি পাহাড়ে ৮৩৫ পরিবার বসবাস করছে। এর মধ্যে ৭টি সরকারি পাহাড়ে ৩০৪ পরিবার এবং ১০টি বেসরকারি পাহাড়ে ৫৩১ পরিবার বসবাস করছে। পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা তৈরিতে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ইন্ধন রয়েছে। এসব পাহাড়ে অবৈধভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সংযোগ নিয়ে ঘর তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি পাহাড়ে সরকারি টাকায় প্রকল্প নিয়ে সড়ক, ড্রেন নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। এসব কারণেই বারবার বাধাগ্রস্ত হয় উচ্ছেদ কার্যক্রম।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বিভাগীয় কমিশনার ও পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। তিনি ২০১৮ সালে পাহাড় ধসে প্রাণহানি এবং বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
রেল মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ইশরাত রেজা বলেন, ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে রেলওয়ে নিয়ন্ত্রণাধীন কনকর্ড এন্টারটেইনমেন্ট পাহাড়ে ১ শিশুসহ ৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ পাহাড়ে উচ্ছেদে গেলে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। আমরা উচ্ছেদ করলেও পরে দেখা যায় পুনরায় দখল হয়ে যায়।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) নুরুল আমিন বলেন, ওখানে রেলওয়ের লোকজন জড়িত রয়েছে। আগে তাদেরকে উচ্ছেদ করা হলে এমনিতেই উচ্ছেদ হয়ে যাবে।
জানা গেছে, ২০০৭ সালে রেলওয়ে, ক্যান্টনমেন্ট, জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন পাহাড় মিলিয়ে ৩০টি পাহাড় নির্ধারণ করা হলেও ২০১৫ সালে ইস্পাহানি পাহাড় ও জেমস পাহাড়কে বাদ দিয়ে ২৮টি পাহাড়ের তালিকা করা হয়। বর্তমানে নগর ও নগরের বাইরে ১৭টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় রয়েছে। এর মধ্যে ১০টা বেসরকারি, ৭টা সরকারি। এতে ৮৩৫টি পরিবার রয়েছে।
স্থানীয় সরকার পরিচালক দীপক চক্রবর্তী বলেন, সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১৫ মের মধ্যে সকল পাহাড়ে অবৈধ দখলদারকে সরিয়ে ফেলে খালি করতে হবে। অন্যথায় সংস্থার প্রধানকে দায়ী করা হবে। যেসব সংস্থার ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছে তারা স্বউদ্যোগে সরিয়ে নেবে। যাদের নেই তারা জেলা প্রশাসনের সহায়তা নেবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মহানগর) মোহাম্মদ আজাদুর রহমান মল্লিক বলেন, পাহাড় কাটা সংক্রান্ত বিষয়ে মামলার তদন্ত করতে আমরা সময় পাই না। কারণ, এমনিতে লোকবল কম। তার ওপর বিভিন্ন অপারেশনাল কাজ করতে গিয়ে নিবিড়ভাবে তদন্ত করার আর সময় হয় না। তিনি আরো বলেন, ব্যক্তি মালিকানার ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারি। কিন্তু সংস্থার ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে বিব্রত হতে হয়। তবে, সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনগত কোনো বাধা নেই বলে জানান তিনি।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুল আলম বলেন, বর্ষা মৌসুম আসার আগেই পাহাড়ে বসবাসকারী অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের উচ্ছেদ করা হবে। আমরা তাদেরকে পুনর্বাসিত করার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। তিন বছরের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রতিনিধি প্রকৌশলী মোহাম্মদ হারুণ জানান, ওয়াসা কোনো অবৈধ সংযোগ দিচ্ছে না। যেগুলো আছে উচ্ছেদে অভিযান চালাই। সমস্ত সংযোগ বন্ধ আপাতত।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিনিধি বলেন, মতিঝর্ণা এলাকা ছাড়া অন্যান্য জায়গায় জমির দলিল ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। ৭০০ বিদ্যুৎ সংযোগ আছে মতিঝর্ণা এলাকায়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের চাপে এসব সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
সভায় সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, বিজিবির ডেপুটি রিজিওনাল কমান্ডার কর্নেল আরেফিন, চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ক্যাপ্টেন জুয়েল, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামসুল আলম, র‌্যাব-৭ এর ডিএডি মনিরুজ্জামান এবং সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জোনায়েদ বক্তব্য দেন।

x