ঝুঁকিপূর্ণ সেতু মেরামতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর এক বিন্দু কালক্ষেপণও কাম্য নয়

রবিবার , ৩০ জুন, ২০১৯ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ
76

নড়বড়ে সেতু চিহ্নিত করতে রেল ও সড়কপথের সব সেতু কালভার্টের ওপর জরিপ চালাতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু তাই নয়, ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো বর্ষার আগেই মেরামত করতে বলেছেন তিনি। অতি সম্প্রতি রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। গত ২৩ জুন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় উপবন এক্সপ্রেসের লাইনচ্যুত পাঁচটি বগি খালে পড়ে হতাহতের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন নির্দেশনা পাওয়া গেল। একনেক সভা শেষে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান প্রধানমন্ত্রীর এসব নির্দেশনার বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান। পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, রেল ও সড়কের সব সেতু ও কালভার্টের সার্ভে করতে হবে। বর্ষার আগেই নড়বড়ে সেতু ও কালভার্ট চিহ্নিত করে সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া সারাদেশে সমন্বিতভাবে সরকারি অফিস স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশগুলো সবই দেশের মানুষ ও যানবাহন চলাচলের জন্য খুবই জরুরি এবং প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের বেশিরভাগ সেতু ব্রিটিশ আমলেই নির্মিত হয়েছে। এর অধিকাংশই পরবর্তী সময়ে সংস্কার বা মেরামত করা হয় নি। প্রায় ভেঙে পড়া সেতুগুলো কোন রকমে বাঁশ কাঠ দিয়ে ঠেকিয়ে রেখে ট্রেন চলাচলের কাজ চালানো হচ্ছে। এমন একটি সেতুর ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় সম্প্রতি ঢাকা-সিলেট লাইনে উপবন এঙপ্রেস দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, যাতে চারজন নিহত ও শতাধিক আহত হয়। ঘটনাটি দুর্বল রেল ব্যবস্থা ও যাতায়াত ঝুঁকি সামনে এনেছে। আশার কথা, সম্প্রতি নড়বড়ে সেতু চিহ্নিত করতে রেল ও সড়কপথের সব সেতু কালভার্টের ওপর জরিপ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো বর্ষার আগেই মেরামত করতে বলেছেন তিনি। বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বলতে হবে উদ্যোগটি অবশ্যই ইতিবাচক। আমরা আশা করি, রেল মন্ত্রণালয় আর কালক্ষেপণ না করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
তথ্যমতে, গত দেড় বছরে ঢাকা-সিলেট, সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে নয়টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সিলেটে রেল সেতু ভেঙে দু’দিন ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার ঘটনাটিও। ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ একই পথে রেল সেতু ভেঙে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ট্রেন। এতে সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল পাঁচ দিন। বস্তুতঃ ৭০ থেকে ১০০ বছরের পুরনো সেতুগুলো শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয় চরম আতঙ্কেরও। কারণ নির্মাণের ৫০ থেকে ৫৫ বছরের পর সেতুর আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যায়। তাই প্রায় ৯০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ, জরাজীর্ণ ও জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলছে। এতদিন ধরে পুরনো সেতুগুলো কেন সংস্কার বা পুনঃনির্মাণের কাজ করা হলো না, এ প্রশ্নের জবাব দাবি করে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এর দায় এড়াতে পারে না। তাদের এমন গাফিলতি ও জনজীবনকে নিশ্চিত ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই আর দেরি না করে ঝুঁকিপূর্ণ ও মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া সেতুগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সংস্কার করতে হবে। নতুবা দুর্ঘটনা বন্ধ করা যাবে না। তাছাড়া সেতুগুলো সময়োপযোগী করে পুনঃনির্মাণ করাটাও অত্যাবশ্যক। একশ-দেড়শ বছরের পুরনো জরাজীর্ণ সেতুর দিকে এতদিন নজর দেওয়া হয় নি কেন তাও খুঁজে দেখা দরকার। এক্ষেত্রে রেলের দুর্নীতি, শতাধিক প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুঠপাট, অসাধু রেল কর্মকর্তা, কথিত কর্মচারী নেতা ও ঠিকাদার মিলে প্রকল্পের টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়ার বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখতে হবে।
দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম মাধ্যম রেলওয়ে। দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমের চেয়ে যাতায়াত ভাড়া অপেক্ষাকৃত কম বিধায় ট্রেনে যাতায়াত করে থাকেন। এক্ষেত্রে ট্রেনে যাওয়া আসা যদি ঝুঁকিপূর্ণ ও আতঙ্কের হয়ে ওঠে তাহলে তো দেশের জনসংখ্যার বিশাল অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাব দেশের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সুপরিকল্পিত কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে সময়মতো রেলের উন্নয়ন জরুরি। রেলকে ঘিরে পরিকল্পিত বিনিয়োগের বিকল্প নেই। কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো দিন দিন আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। জনজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে এসব সেতু মেরামত করা প্রয়োজন। তা না হলে আবারো দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকে যায়। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উত্তমরূপে কার্যকর করার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।

x