ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা হোক

বৃহস্পতিবার , ২৫ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ
88

দেশের ১১টি শিল্পখাতের ৩১৩টি কারখানায় ৮৫৬ শিশু শ্রমিক কাজ করছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরএর (ডিআইএফই) সাম্প্রতিক পরিদর্শন কর্মসূচিতে এ ধরনের শিশুশ্রমের প্রমাণ মিলেছে। অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক খবরে প্রকাশ। খবরে বলা হয়, জানা গেছে, ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ খাতকে শিশুশ্রমমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্য পূরণে শিল্পকারখানায় শিশুশ্রম শনাক্ত করার জন্য গত আগষ্টে বিভিন্ন জেলার পরিদর্শকদের নির্দেশনা দেয় ডিআইএফই। নির্দেশনা অনুযায়ী নভেম্বর পর্যন্ত ১১টি খাতের ৩১৩টি কারখানায় মোট ৮৫৬ শিশুশ্রমিক শনাক্ত করেছে ডিআইএফই। অধিদপ্তরের সূত্রমতে, উল্লিখিত ১১টি খাত হলো, অ্যালুমিনিয়াম, তামাক/বিড়ি, সাবান, প্লাস্টিক, কাঁচ, স্টোন ক্রাশিং, স্পিনিং, সিল্ক, ট্যানারি, শিপ ব্রেকিং ও তাঁত। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর কর্মরত শিশু শ্রমিকদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় অ্যালুমিনিয়াম, তামাক/বিড়ি, প্লাস্টিক ও স্টোন ক্রাশিংয়ের মতো খাতগুলোয় সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার পাবে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

জাতীয় শিশুনীতি২০১১ অনুসারে ৫ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সের শিশু কোনো কাজ করতে পারবে না। ৫ থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুশ্রম নিয়োগকর্তার জন্য দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এ আইন শুধু কাগজেকলমে সীমাবদ্ধ। অথচ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে দেখা যাচ্ছে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন করে দেখা গেছে যে, দেশের ১১টি শিল্পখাতের ৩১৩টি কারখানায় ৮৫৬ শিশু শ্রমিক কাজ করছে। খবরটি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। যদিও সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ খাতকে শিশুশ্রম মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ। শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের এই উদ্যোগ গ্রহণ আইএলও কনভেনশনেরই প্রভাব। সত্যিকারভাবে সরকার শিশুশ্রম নিরসন করতে চায় কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকার আন্তরিক হলে প্রথমত, এভাবে সময় নষ্ট করতো না; দ্বিতীয়ত, একটি পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করতো। আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজেদের সমস্যার সমাধান করা যায় না। সরকার পরিকল্পনা করে বসে আছে। এখন কে কত ঋণ দেবে তার ওপর বাস্তবায়ন নির্ভর করলে শিশুশ্রম নিরসন আকাশকুসুম কল্পনাই থেকে যাবে। কারণ আইএলও কত টাকা যোগাড় করে দেবে, এনজিওগুলো কত টাকা সাহায্য আনবে তা নিয়ে বসে থাকলে আর যাই হোক, শিশুশ্রম নিরসনের মতো বিশাল বিষয়ের সমাধান আশা করা যায় না। বিষয়টির গুরুত্ব ও প্রয়োজন বিবেচনা করে সরকারকে অর্থের সংস্থান করতে হবে। শিশুশ্রম নিরসনে কারখানায় চাকরি প্রদান বন্ধ করলেই শুধু হবে না, শিশুদের বিকাশে যথাযথ পরিবেশেরও নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান শিশুশ্রমিকদের পুনর্বাসন করতে হবে।

সাধারণত দারিদ্র্যের কারণেই শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হয়। শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে অল্পবয়সী এসব শিশু অমানুষিক পরিশ্রম করছে। সরকারিবেসরকারি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য উন্নয়নমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই কম। তাই শিশুশ্রমিকের সংখ্যা উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়ে গেছে। আবার শিশুশ্রম বন্ধে কঠোর আইন থাকলেও তার প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নেই। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুশ্রম বন্ধ না হওয়ার মূল কারণ আসলে দারিদ্র্য। কেন না অনেক শিশু শ্রমিকের আয়ে চলে তাদের পরিবার। অভাবের তাড়নায় নিরুপায় হয়ে শিশুরা এসব কাজে যুক্ত হচ্ছে। সস্তা শ্রমের কারণেও মালিকপক্ষ সুযোগ নিচ্ছে। এমনিতর অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ ও অঝুঁকিপূর্ণ উভয় শ্রমে শিশুদের নিরস্ত করা কঠিন। দেশে যতদিন দারিদ্র্য ও বেকারত্ব থাকবে ততদিন এসব কাজ থেকে শিশুদের বিরত রাখা সম্ভব হবে না। এজন্য সেসব শিশুর পিতামাতা অভিভাবকদের কর্মসংস্থানসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রয়োজন। এছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে বিধবা দুস্থ ভাতার মতো এই শিশুদের জন্যও বিশেষ ভাতা চালু করার চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। মোট কথা, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

x