জ্যোতির্ময়ী জননী

জেসমিন ইসলাম

শনিবার , ২২ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ
437

একজন প্রবীণ নাগরিক একটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সংস্কার, সমাজ চেতনার বাহক হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। জাতিগতভাবে আমরা পারিবারিক প্রথায় বিশ্বাসী, প্রবীণজনের এক সময়ের কর্ম এবং ত্যাগেই নির্মিত হয়ে থাকে আমাদের বর্তমান, অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে আমরা প্রবীণজনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে থাকি। সেই প্রেক্ষাপটে আমরা শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি নব্বই বছর বয়স্ক এই চট্টগ্রামের একজন প্রবীণ নারী ব্যক্তিত্বকে। তিনি সালিমা করিম। চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার তাঁর বাসার ড্রইংরুমে যখন তাঁর সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, ধীরে হেঁটে এসে বসলেন। চৌকষ উজ্জীবিত দুটি চোখ, সুসংহত শারীরিক অবয়ব আমাকে মুগ্ধ করল। মুগ্ধতা নিয়ে বললাম কেমন আছেন? উত্তর করলেন ‘ভালো আছি’। এই বছর নভেম্বর মাসের দুই তারিখ নব্বইতম জন্মদিন পালিত হয়েছে আপনার, আমাদের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ভালোবাসা গ্রহণ করুন। আপনার কর্মমুখর দীর্ঘ জীবন। সেই কর্মমুখর জীবনবোধের গতিময়তা এই দীর্ঘ বয়সকেও স্তিমিত করতে পারেনি, আপনাকে জেনে আমরা ঋদ্ধ হব, সেই অভিপ্রায়ে বিগত যাপিত জীবন সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি শৈশব সম্পর্কে জানালেন, ব্রিটিশ শাসন আমলে উন্নিশ শ আটাশ সালে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গীবাজার নানার বাড়িতে জন্ম হয়। মাতা জামিলা খাতুন ছিলেন চট্টগ্রামের ইতিহাস খ্যাত জব্বরমিয়ার বলীখেলার প্রবর্তক জব্বরমিয়ার সৎ বোন। পিতা সুলতান আহমেদ। পারিবারিক প্রয়োজনে ফিরিঙ্গীবাজার থেকে স্থানান্তরিত হয়ে মাদারবাড়ি এলাকায় চলে এলে তিনি মাদারবাড়ি প্রাইমারী স্কুলে মেয়েদের শাখায় লেখাপড়া করেন। আপনি সংসার জীবনে কখন প্রবেশ করেছিলেন? উত্তরে বললেন, পনের বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়। আমার স্বামীর নাম মোঃ ফজলুল করিম। তৎকালীন সময়ে তিনি বি,এ পাস করেছিলেন, চাকরিজীবী ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিদ্যানুরাগী, অক্লান্ত পরিশ্রমী, নীতিবান মানুষ।
আপনি রত্নগর্ভা পুরস্কার প্রাপ্ত একজন জননী। আপনার সন্তানদের সম্পর্কে সগৌরবে বলুন। তিনি জানালেন এক এক করে, বড় ছেলে চিকিৎসক, দ্বিতীয় ছেলে সিটি গ্রুপের কর্মকর্তা, তৃতীয় ছেলে প্রকৌশলী, চতুর্থ ছেলে মাস্টার মেরিনার, পঞ্চম ছেলে অতিরিক্ত সচিব, ষষ্ঠ ছেলে পরিচালক পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ড। বড় মেয়ে গৃহিণী, ছোট মেয়ে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। আটজন সন্তানদের লেখাপড়ার পাশাপাশি আমরা অভিভাবক হিসাবে সুবিধা অপ্রাপ্ত আত্মীয়দের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য আমাদের বাসায় থাকার যাবতীয় ব্যবস্থা করেছিলাম। সুবিধা বঞ্চিত আত্মীয়স্বজনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। আমার স্বামী আমার সমর্থন পেয়ে এইসব দায়িত্ব পালন করতেন। আমাদের সন্তানদেরকেও অনেক ত্যাগ করতে হয়েছে এইসব মানবিক কাজের জন্য। তবে আমি আনন্দিত মানুষকে সাহায্য করার মানসিকতা তাদেরকে প্রভাবান্বিত করেছে।
বর্তমানে আপনার যাপিত জীবন সম্পর্কে বলুন। উত্তরে তিনি বললেন, আমার প্রতিবেলার খাওয়ার বিষয়টি পরিচারিকার সহায়তায় আমি নিজে তদারকি করি, প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াত করি, নামাজ পড়ি, দৈনিক পত্রিকা পড়ি, বই পড়ি, টেলিভিশনে খবর, নাটক, আলোচনা দেখি। আমার চোখের সফল অস্ত্রোপচার হয়েছিলো, তাই চোখের সমস্যা হয় না। আর আমার স্বজন, পরিজন প্রায়ই আমার সাথে দেখা করতে আসে।
শুরুতেই বলেছি আপনাকে জেনে আমরা ঋদ্ধ হব, আপনার এই বয়সে শারীরিক সক্ষমতার সুস্থতার জন্য আপনি কি বিশেষ ধরনের পরিচর্যা অনুশীলন করতেন আমরা জানতে আগ্রহী। তিনি বললেন, আমার স্বামীর কাছ থেকে আমি শৃঙ্খলাবোধ শিখেছি। তাঁর চাকরির নির্ধারিত অর্থ দিয়ে নিজেদের পরিবারের এবং সমাজের উপকার করার জন্য আমাদের দুজনকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমার বিশ্বাস পরিশ্রম এবং পরিমিত খাদ্য অভ্যাস স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করেছে। আর আপনার মানসিক স্মৃতিশক্তি সাবলীলতা সম্পর্কে বলুন। হেসে তিনি উত্তর করলেন, আমি প্রতিদানের আশায় কখনও কাজ করিনি, এটা আমার স্বামীর কাছ থেকেই শিক্ষা, যেটা আমাকে অনেক মানসিক শান্তি দিয়েছে। আমি ধর্মভীরু, তবে গোড়ামী পছন্দ করি না, ধর্মের অনুশাসন মেনে চলি। ১৯৯৫ সালে হজ্ব পালন করেছি। সময়ের সঠিক ব্যবহার করে থাকি, সহনশীলতা এবং সহযোগিতায় বিশ্বাসী, সর্বোপরি আমি নিজেকে অনেক ভালোবাসি।
বর্তমান দেশ সমাজ রাজনীতি সম্পর্কে আপনার অনুধাবন কি রকম। একটু চিন্তা করে বললেন, সব আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে, অর্থ সম্পদ ভোগের প্রতি সবার নজর। ব্রিটিশ আমলে আমরা হিন্দু মুসলমান মিলে মিশে থাকতাম। শিক্ষার মান বাড়াতে হবে, শিক্ষিত মানুষকে রাজনীতিতে আসা উচিৎ। পত্রিকায় পড়ি সমাজে পরপোকারী কাজ হয়, ভালো লাগে, পত্রিকায় টেলিভিশনে ভালো কাজগুলো বেশি প্রচার করা উচিৎ।
ডিসেম্বর মাস আমাদের বিজয়ের মাস, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা বলুন। উত্তরে বললেন, ‘আমার চিকিৎসক ছেলে মুক্তিযুদ্ধের সময় আহতদের চিকিৎসা করেছে, মেজ ছেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো। আমি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। আপনি এখন কি বাইরে বেড়াতে যেতে পারেন প্রশ্ন করলাম, তিনি জানালেন, বাপের বাড়ি আনোয়ারা উপজেলার বটতলী গ্রামে এবং নিজের বাড়ি পটিয়ায় ছেলেরা নিয়ে যায়, নিয়মিত ডাক্তারের কাছে চেকআপের জন্য নিয়ে যায়, ২০১৭ সালে বুকে পেইচমেকার স্থাপন করা হয়েছে, ডাক্তার চেকআপ করে সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
আপনাকে দেখে স্বস্তি এবং সুখবোধ হচ্ছে তবুও আপনার জীবনের কোনো দুঃখবোধ আমাদের কাছে উল্লেখ করা যাবে? তিনি জানালেন, আমার স্বামীর ২০০৮ সালে মৃত্যুর দেড় বছর পর আমার তৃতীয় ছেলে অকস্মাৎ ক্যান্সারে মৃত্যু বরণ করে, আর আমার বড় বউমা সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর থেকে স্বর্ণপদক প্রাপ্ত সমাজকর্মী ২০১৭ সালে ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করে। অশ্রুসিক্ত চোখ দুটি মুছে স্বাভাবিক হলেন। তখন তাঁকে শেষ প্রশ্নটি করলাম নারী সমাজের প্রতি আপনার কোনো উপদেশ আছে? তিনি বললেন, পুরুষকে প্রতিদ্বন্দ্বি ভাবা নারীদের উচিৎ নয়, নারীর প্রতি সহিংসতা সমাজের সকলে মিলে আটকাতে হবে। সমাজের ভালো করতেই হবে। তাঁর শততম জন্মদিন পালনের আশা রেখে বিদায় নিলাম।

x