জ্ঞানানন্দ সিদ্দিক আহমেদ

সাখাওয়াত টিপু

মঙ্গলবার , ৩০ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ
55

‘আমরা যে সমাজে বসবাস করি সেটা চিন্তার দিক থেকে অনেকাংশে স্থবির সমাজ।’ কথাটা যত সহজে বলা যায়, ব্যাপারটা তত সহজ নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন? মনে হতে পারে কথাটা অবৈজ্ঞানিক! অপ্রগতিশীলও বটে! কিন্তু একবারও আমরা ভেবে দেখেছি কি আমরা যে সমাজ পরিবর্তনের আশা করেছিলাম, সেটা সুদূর পরাহত। অন্তত কুড়ি বছর আগে কথাটা আমাকে বলেছিলেন চট্টগ্রাম শহরের একজন খুব সাধারণ মানুষ সিদ্দিক আহমেদ। খুব সাধারণ বললাম কারণ তার ভেতরে গভীর বেদনা আছে, গভীর দুঃখ আছে, আছে ব্যক্তি মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে বুঝতে না পারার সামাজিক অক্ষমতা। কথাটা কত যে হাড়ে হাড়ে সত্য টের পাচ্ছি আজ। আমরা যখন উন্নয়নের কথা বলি, একবারও কি ভেবে দেখেছি, দালান যত উপরের দিকে উঠেছে, আমাদের দৃষ্টি থেকে হারিয়ে গেছে আকাশ, শহর যত প্রশস্ত হয়েছে রাস্তা ততো সরু হয়েছে, যানবাহন যত বেড়েছে খাল-নদী-নালা ততো নাই হয়ে গেছে। বস্তুত আমাদের পথ থমকে গেছে। উন্নয়ন আমাদের ডোবাতে বসেছে। স্বাভাবিক প্রকৃতি থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। শাসন-কাঠামোর কথা নাইবা বললাম, আর!
সত্যি, এমন সময়ে দেশের কোনো বুদ্ধিজীবীর নাম মনে রাখা কঠিন! মানুষ কেনইবা মনে রাখবে? সাধারণ মানুষ যার কাছে প্রাপ্তির আশা রাখে তাকেই মনে রাখে। তাও সীমাবদ্ধ গণ্ডি আর প্রয়োজনের কারণেই। বস্তুত সাধারণের উপযোগিতার বাইরে মানুষের আশা খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফলে ব্যক্তি ব্যক্তিকে ভুলে যায়, মানুষ মানুষকে ভুলে যায়। আমাদেরও হয়তো স্মৃতির পাতা খানিকটা ধুলো জমতে জমতে ম্লান গেছে! আমরাও ভুলে যাচ্ছি সিদ্দিক আহমেদের কথা! চট্টগ্রামের ছোট্ট শহরে আমরা এই সাধারণ ব্যক্তিকে দেখেছিলাম হয়তো! পোশাকে কোনো জৌলুশ ছিল না তার। অপব্যয়ী জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন না। কখনো কথাতে কটু খই ফোটাতেন না। খ্যাতির মোহ ছিল না কখনো। মায়াবী, হাসিমুখো এই উজ্জ্বল মানুষটি ছিলেন সাধারণে অতি আপন । একজন অতি সাধারণ সিদ্দিক আহমেদ। আমাদের প্রিয় সিদ্দিক ভাই।
আমাদের বিকাশের কালে এই সাধারণ মানুষটির অবদান অনেক। ছাত্র রাজনীতি করার কারণে ওনাকে দূর থেকে চিনতাম বেশ আগে থেকে। প্রথমাবস্থায় ছিল অল্প পরিচিত মানুষের মতো সাধারণ সম্পর্ক । প্রায়শ দেখতাম নানা বইয়ের দোকানে মাথা গুজে খুব নিরবে বই খুঁজছেন কিংবা মাথাটা নিচের দিকে একটু হেলিয়ে বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টাচ্ছেন তিনি। একদিনের ঘটনা খুব মনে পড়ছে। রিয়াজউদ্দিন বাজারের সেই বিখ্যাত পুরনো বইয়ের দোকান অমর বইঘরে বই খুঁজছেন। আমিও পাশের শেলফে বই দেখছিলাম। জ্যাক লন্ডনের হোয়াইট ফ্যাক্স বইটা নাড়াচাড়া করছিলাম। বইটির মৃদু সংস্করণের কভার আর ইলাস্ট্রেশন এতো সুন্দর চোখ সরাতে পারছিলাম না। অমুদ্রা জনিত কারণে কিনবো কি কিনবো না বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সিদ্দিক ভাই বার দুই কি তিন আমার মুখের দিকে তাকালেন। আর মুখ ফিরিয়ে নিলেন বইয়ের দিকে। প্রায় মিনিট ১০ চলে গেল। সিদ্দিক ভাই আমাকে ডাকলেন। আর বললেন, বইটি আপনার মনে হয় খুব পছন্দ হয়েছে! আমি বললাম, হ্যাঁ! বললেন, বইটা আমি আপনাকে উপহার দিতে চাই! আমি ঠিক কি করবো বুঝতে পারছিলাম না, বইটা নেবো নাকি নেব না! স্বল্প চেনা সিদ্দিক ভাই খুব আপন করে বললেন, আপনাকে চিনি! এমন কি আপনার বাবা-চাচাকেও চিনি! আমি খানিক থতমত খেয়ে বললাম, জ্বী! দেখলাম, তিনি আমার ঠিকুজি নিয়ে কথা বলছেন। আমি সেদিন আর সেই বই নিলাম না। তাকে ধন্যবাদ জানালাম। উনি একটা বই কিনলেন। যদ্দুর মনে পড়ে বইটার নাম ‘দ্য আউট লাইন অফ লাতিন লিটারেচর’। লায়ন সিনেমা হলের পাশের গলিতে চা খেয়ে সেদিন আমরা যে যার মতো বিদায় হলাম। তবে এটুকু বলেছিলাম, আপনি আমাকে তুমি সম্বোধন করলে খুশি হবো। সিদ্দিক ভাই মিটিমিটি হাসলেন!

আমি সিদ্দিক ভাই সম্পর্কে বিশেষ জানতাম না। জানতাম উনি লেখক ও সাংবাদিক। একজন ছাপোষা মানুষ। আমার ভুলটি ভাঙল অন্য আরেকদিন। একদিন দুপুরের দিকে কথাকলি বইয়ের দোকানে দেখি সিদ্দিক ভাই বই দেখছেন। সদালাপী সিদ্দিক ভাই কুশল বিনিময় করলেন। বই কিনে দুজন চেরাগি পাহাড়ের দিকে আসছিলাম। কথায় কথায় উনি নানা প্রসঙ্গ তুললেন। বললেন, কি পড়ছো? বললাম, প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ও লেখক রণেশ দাশগুপ্ত অনূদিত উর্দু কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতা পড়ছি। পরে জানলাম উনি রণেশ দাশগুপ্তের সহকর্মী ছিলেন। রণেশ দাকে নিয়ে অনেক গল্প বললেন। পুরাণ ঢাকার বংশাল রোডের ওনার জীবন কাহিনী। সেদিন অনেকক্ষণ সিদ্দিক ভাইয়ের সাথে সময় কাটিয়েছি। সিদ্দিক ভাই সেদিন আশ্চর্য এক পরামর্শ দিলেন। বললেন, তোমাদের ‘যুগান্তর’ পত্রিকার পত্রিকায় রণেশ দার লেখা আনতে পারো কিনা দেখো। উনি কলকাতায় থাকেন। আমি বললাম, চেষ্টা করব ভাই। সত্যিই একদিন আমরা ছাত্র আন্দোলনের সেই বিখ্যাত বুলেটিনে রণেশ দাশগুপ্তের লেখা পত্রস্থ করেছিলাম। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পর সমাজতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে রণেশ দার তাত্ত্বিক লেখা ছিল সেটা। সম্ভবত সেটাই ছিল রণেশ দার জীবনের শেষ লেখা। রণেশ দার মৃত্যুর পর ঢাকার দু-তিনটা সংকলনে লেখাটি ছাপা হয়। কিন্তু কোথাও লেখাটির সেই সূত্র উল্লেখ করেনি কেউ।
যাই হোক, দুপুরে একসঙ্গে খেলাম। পরে ছোট্ট কামরায় ওনার বইয়ের জৌলুশ দেখাতে নিয়ে গেলেন। চার দেয়ালে মাটি থেকে ছাদ, বিছানার আশপাশে, টেবিলে বইয়ের স্তূপ। খেয়াল করলাম আধভাঙ্গা চকির নিচেও কিছু বই শুয়ে আছে মহাশান্তিতে। যেন মনে হলো বইগুলো শুভ্র সুন্দর এক সাধারণ ব্যক্তির সঙ্গে আত্মীয়তা করে আছে। সিদ্দিক ভাই মাঝে মাঝে রসিকতা করতেন। সেদিনও তাই করলেন, শোনো বুদ্ধিজীবী আজ তোমাকে আমি বুদ্ধিজীবী নিয়ে একটা কবিতা শোনাবো। দেখলাম, হেলান দেওয়া দেয়ালের সারি থেকে একটা বই বের করলেন। পড়তে পড়তে বইটির মলাট নাই হয়ে গেছে। ধুলোমলিন একটা আধছেঁড়া কবিতার এন্থোলজি। কথা বলতে ওনার মুখে বাঁধত। কিন্তু পড়ার সময় দেখলাম, সুললিতভাবেই খুব সুন্দর সুরে কবিতা পড়ে গেলেন। সেদিন তার মুখে শুনলাম ওত্তো রনে কস্তেইয়োর সেই বিখ্যাত কবিতা। কবিতার নামটি বাংলা দাঁড়ায় ‘অরাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীগণ’। অনেক পরে সিদ্দিক ভাইকে দিয়ে সেই কবিতার অনুবাদ করিয়েছিলাম। আর ছেপেছিলাম খানিকটা বিখ্যাত, ঢাকা থেকে প্রকাশিত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পত্রিকা ‘কাগজ’-এ। এখনো মনে হয় তার সেই কণ্ঠ আজও কানে লেগে আছে।
এমন অনেক ঘটনা আছে বলে শেষ করা যাবে না। সিদ্দিক ভাই আমাদের বালকবেলার দেখা শ্রেষ্ঠ একজন নীরব সাধক। বিশেষত আফ্রিকান আর লাতিন ধ্রুপদী সাহিত্য সিদ্দিক ভাইয়ের ঠোঁটস্থ ছিল। এমন এমন লেখক আর বইয়ের নাম শুনেছি, যা আগে কখনো কারো মুখে শুনিনি। সিদ্দিক ভাই আমাদের সাহিত্যচর্চা আর জ্ঞান ভাণ্ডারের একটা আশ্রয় ছিলেন। সব সময় ঝাঁপি খুলে দিতেন। অনেককে হয়তো সেই সন্ধান দিয়েছেন। চট্টগ্রামের একটা প্রজন্ম সিদ্দিক আহমেদের কাছে অনেক ঋণী। এই ঋণ মুদ্রার নয়, এই ঋণ জ্ঞানের। এই ঋণ জ্ঞানানন্দের। আমার উন্মাসিক স্বভাবের পরও অমায়িক সিদ্দিক ভাই সবসময় যোগাযোগ রাখতেন। একবার রসিকতা করে সিদ্দিক ভাইকে বলেছিলাম, আপনি আমাদের জ্ঞানানন্দ ভাই। সিদ্দিক ভাই প্রাণ খুলে হাসলেন। বললেন, টিপু মিয়া, শব্দটি বেশ মজার। তবে নিত্যানন্দের জগত থেকে আমরা অনেক দূরে! সেইটা তুমি ভালো বুঝবে। অনেক কথা। অনেক স্মৃতি। এমন পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না।
সিদ্দিক ভাই তুলনাহীন নির্বিবাদী মানুষ ছিলেন। পুরো জীবনটাই জ্ঞানের পেছনে সঁপে দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে মনে হতো বই ছাড়া হয়তো সিদ্দিক ভাইয়ের অন্য জীবনের পরিসর খুব ছোট ছিল। কিন্তু না, তিনি ছিলেন দায়িত্ববান পিতাও। তবে তিনি এমনভাবে চলাফেরা করতেন জ্ঞানের ভারিক্কিভাব কখনো চোখে পড়তো না। একজন নিরেট ধ্যানী মানুষ সিদ্দিক ভাই। কেউ কেউ বলবেন, যে কোন সমাজে ব্যক্তি সাধারণ মানুষের পর্যায়ে থাকেন। গড়পড়তা জীবন-যাপনই বা মৌলিক চাহিদার সঙ্গে তাল মেলানো জীবনাচরণের কারণে ব্যক্তিকে সাধারণ মনে হয়। প্রথাগত এই যে সমাজ-ব্যবস্থায় বলতে গেলে সিদ্দিক আহমেদ খুব সাধারণ মানুষ ছিলেন। সাধারণ জীবন-যাপন করতেন। সাধারণের সঙ্গে মিশে থাকতেন। খুব প্রথাগত জীবন ধারণ করতেন। আমাদের বালকবেলায় চট্টগ্রাম শহরে যে ক’জন জ্ঞানী মানুষের সন্ধান পেয়েছিলাম সিদ্দিক আহমেদ তাদের অন্যতম। কোনো বিশেষণ হয়তো সিদ্দিক ভাইয়ের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ সিদ্দিক ভাই সকল বিশেষণের উর্ধ্বে থাকা একজন সাধারণ মানুষ। সেলাম সিদ্দিক ভাই।

x