জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রটিকে উর্বর করতে হবে

চট্টগ্রামে বাংলা একাডেমির একক বইমেলা

মঙ্গলবার , ২৪ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
65

চট্টগ্রামে বাংলা একাডেমির একক বইমেলা শুরু হয়েছে। আট দিনব্যাপী বই মেলার প্রথম দিনেই জেলা শিল্পকলা একাডেমির আর্ট গ্যালারি ভবনে ছিলো বইপ্রেমীদের ভিড়। বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে জানানো হয়, চট্টগ্রামের বইপ্রেমীরা অনেক সময় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ঢাকায় গিয়ে বাংলা একাডেমির বই সংগ্রহ করতে পারেন না। মূলত তাদের সুবিধার্থে ও চট্টগ্রামের মানুষকে বই পড়তে উৎসাহিত করতেই এই মেলার আয়োজন।

বাংলাদেশের প্রান্তবর্তী জনপদের নাম চট্টগ্রাম। একে বলা হয়ে থাকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনুপম আধার। এর ভূখণ্ডগত অবস্থান যেমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, তেমনি ‘সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি অর্থনীতিধর্মভাষাসাহিত্যসর্বক্ষেত্রে এখানকার জনগোষ্ঠীর কর্মকৃতি স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত’ এবং স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, চট্টগ্রাম সর্বাগ্রে। নানাক্ষেত্রে তাঁর এ কথার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পেও চট্টগ্রাম পালন করেছে অগ্রণী ও অবিস্মরণীয় ভূমিকা। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, চট্টগ্রামের মুদ্রণ শিল্পের বিকাশ ও অবদানের তুলনায় প্রকাশনা শিল্পের বিকাশ তেমন ঘটেনি। প্রচুর সম্ভাবনা সত্ত্বেও চট্টগ্রামের প্রকাশনা শিল্প এখনো ভিত্তি তৈরির সংগ্রামে তৎপর। আশার কথা, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাই অনেক উদ্যোমী মানুষকে, যাঁরা চট্টগ্রামের প্রকাশনা শিল্পে কিছু ভূমিকা রাখার প্রত্যয় নিয়ে আগমন করেছেন। এঁদের কেউ লেখক, কেউ সংগঠক, কেউ গবেষক। এঁরা শিল্পমানস সম্পন্ন মানুষ। এঁদের পরিচালনায় চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা। তবে তাঁদের বেশিরভাগই শখের বশে সনিষ্ঠ আন্তরিকতায় এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনো তাঁদের ভিতর তৈরি হয় নি পেশাদার মনোভাব, আসেনি পেশাদারত্ব। চট্টগ্রামে একুশের বইমেলা, স্বাধীনতার বইমেলাসহ নানা সময়ে অনুষ্ঠিত হয় ভিন্ন ভিন্ন নামের বইমেলা। এর মধ্যে রয়েছে : বৈশাখী বইমেলা, বর্ষাকলীন বইমেলা, শরৎকালীন বইমেলা, নববর্ষের বইমেলা ও ছোটোদের বইমেলা। এতো মেলার পরও চট্টগ্রামের পাঠকের মনে বিরাজ করছে হাহাকার। অতৃপ্তি ও তৃষ্ণায় কাতর তাঁরা। বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলার আদলে একটা বইমেলা চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হোকণ্ড সেটাই তাঁরা চান।

মানুষকে বইমুখী করে তোলার জন্য বইমেলার রয়েছে অসামান্য ভূমিকা। সকল বয়সের মানুষের জন্য এখানে থাকে উপযুক্ত বইয়ের পর্যাপ্ত কালেকশন। বাঙালি নাকি জাতিগতভাবে আরাম ও প্রমোদপ্রিয়। জ্ঞানান্বেষণের উদ্দেশ্যে লাইব্রেরিতে গিয়ে বইপড়া ও বই সংগ্রহ করার ইচ্ছা ও সুযোগ অনেকেরই হয় না। মেলা উপলক্ষ্যে প্রমোদ ও বইকেনা দু’টোই একসাথে হয়ে যায়। মেলায় যেসব দুর্লভ বই হাতের নাগালে পাওয়া যায়, অন্য অনেক সময়েই তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। যে কোনো মেলায় সমবেত হওয়ার মননগত প্রবণতা আছে বাঙালির। মেলায় মিলিত হওয়ার যে আনন্দ তা অন্যত্র পাওয়া যায় না। মাহমুদুল বাসার তাঁর এক প্রবন্ধে বলেন, বইমেলায় বই কেনার গরজেই শুধু মানুষরা আসে না, আসে সাংস্কৃতিক পীঠস্থানে, উৎসবে মিলিত হওয়ার আনন্দে। তারপর বইও কেনেন। যাঁরা মেলা থেকে বই কেনেন, তাঁরা কেউ কেউ হয়তো কোনোদিনও বই বিপণিতে গিয়ে বই কিনতেন না। এইটা বইমেলার গুরুত্ব।

বাংলা একাডেমির এই আয়োজনকে আমরা স্বাগত জানাই। এই মেলার মাধ্যমে চট্টগ্রামের পাঠকরা একাডেমির গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনার সঙ্গে পরিচিত হতে পারছেন এবং বিশেষ কমিশনে সংগ্রহ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এক সময়ে চট্টগ্রামে বাংলা একাডেমির বিক্রয়কেন্দ্র ছিল। এখন যেহেতু সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সেহেতু একাডেমি থেকে প্রকাশিত বইগুলোর প্রাপ্তি সহজলভ্য করার জন্য এই বইমেলার আয়োজন খুবই জরুরি। একাডেমির মহাপরিচালক লোকসাহিত্যবিজ্ঞানী অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানও বলেছেন, ‘বাংলাদেশে ঢাকার পরেই চট্টগ্রামের অবস্থান। চট্টগ্রামের বইপ্রেমীদের হাতে বাংলা একাডেমির মানসম্মত বই তুলে দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা এই মেলার আয়োজন করেছি। এই আয়োজন প্রতি বছর অব্যাহত থাকবে।’

আমরা তাঁর এ বক্তব্যকে স্বাগত জানাই এবং প্রতি বছর যেন এই মেলার আয়োজন হয়সেটাই কামনা করছি। এ ধরনের মেলার আয়োজন যত বেশি হবে, তরুণ প্রজন্ম ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশকালকৃষ্টি ইতিহাসঐতিহ্যসংস্কৃতিসমাজনৃতত্ত্ব সম্পর্কে তত বেশি ধারণা পাবে। এই প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও মননে যথার্থ অর্থে আধুনিক ও শিক্ষিত হয়ে গড়ে তুলতে হলে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রটিকে উর্বর করে তুলতে হবে।

x