জেলেপাড়া থমথমে

কুমিরায় সংঘর্ষের ঘটনায় ওসিসহ গুলিবিদ্ধ ১০ আহত অর্ধশতাধিক, আটক ১১

সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি

বুধবার , ২২ মে, ২০১৯ at ৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ
903

সীতাকুণ্ডের কুমিরায় গত সোমবার রাতে ‘ইয়াবা ব্যবসায়ী’ এক যুবককে আটকের জেরে পুলিশ-গ্রামবাসী সংঘর্ষের পর জেলেপাড়া এখন থমথমে। সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ ১১ জনকে আটক করেছে। গ্রেপ্তার আতংকে জেলেপাড়া পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় ওসিসহ ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে গতকাল খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া জেলেপাড়ার নারী-পুরুষসহ আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। পাড়ার দোকানপাট ও বসতঘরে ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার রাত ১১টার দিকে কুমিরা ইউনিয়নের বড় কুমিরা ঘাটঘর জেলেপাড়ায় রুবেল জলদাশ নামে এক যুবককে ঘুম থেকে তুলে আটক করেন সীতাকুণ্ড থানার এসআই জাহেদ হোসেন জসীম। এসময় এলাকার এক বৃদ্ধাসহ অন্য যুবকরা তাকে গ্রেপ্তারের কারণ জানতে চেয়ে বাধা দিলে জসীম ও সাথে থাকা ফোর্স তাদেরকে মারধর করে বলে জেলেরা অভিযোগ করেন।
এসময় বিলাম্বু দাসী (৬৫) নামে এক বৃদ্ধা আতংকে মারা যান। পুলিশের হামলায় ওই বৃদ্ধা মারা গেছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। এরপর জেলেরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এসআই জসীমসহ পুলিশ সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখে। খবর পেয়ে সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. দেলওয়ার হোসেন ও চট্টগ্রাম থেকে অতিরিক্ত ফোর্স ঘটনাস্থলে যায়। পাশাপাশি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোরশেদ হোসেন চৌধুরী ও ইউপি সদস্যসহ অন্যরা সেখানে পৌঁছান। কিন্তু রুবেলকে আটক ও বিলাম্বু দাসীর মৃত্যুর ঘটনায় উত্তেজিত জেলেরা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে। ইউপি চেয়ারম্যান ও সীতাকুণ্ড থানার ওসি (তদন্ত) মো. আফজাল জেলেদের শান্ত হতে বলেন এবং ঘটনার সাথে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু উভয় পক্ষের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ শুরু হলে পুলিশের সাথে জেলেদের সংঘর্ষ শুরু হয়। জেলেরা বোতল, ইট ছুঁড়তে থাকলে পুলিশ গুলি চালায়। এসময় অন্তত শতাধিক রাউন্ড গুলি চলে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। এতে ওসি (তদন্ত) আফজাল হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক সুমন বণিক, এসআই আলীম ও সেকেন্ড অফিসার সুজায়েত ও এসআই জাহেদ হোসেন জসীম আহত হন।
অন্যদিকে জেলেপাড়ার শিশু ও নারী-পুরুষসহ ৪০জন আহত হন। আহতরা হলেন রাজু দাস, সুফল দাস, প্রকাশ দাস, সঞ্জয় দাস, সামিত্রী দাস, সৌরব দাস, রীমা দাস, নিশি দাস, পরিমল দাস, কৃষাণ দাস, সাজু দাস, প্রদীপ দাস, মিন্টু দাস, দীপালী দাস, রূপা দাস. আঙ্গুরি দাস, লক্ষী দাস, পুতুল দাস, শিল্পী দাস, যমুনা দাস, মতিলাল দাস, ননী গোপাল, রত্না দাস, উত্তম দাস, শিপু দাস, শিশু তন্ময় দাস, রূপা দাস, নিশিথা দাস, রাসনা দাস, মমতা দাস, পরানী বালা দাশ, শুকতারা দাশ, পাখি দাশ ও শেলি দাস।
স্থানীয় বাসিন্দা বলরাম দাশ জানান, পুলিশ নিরপরাধ রুবেল জলদাশকে ঘর থেকে নিয়ে যাচ্ছিল। এর কারণ জানতে চাইলে বৃদ্ধাকে মারধর করে। এতে তিনি মারা যান বলে জানা যায়। ফলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ঘটনার রাত থেকে এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ১১ ব্যক্তিকে আটক করে। আটককৃতরা হলেন পরিমল দাশ, সৌরব দাশ, কৃঞ্চ দাশ, সঞ্জয় দাশ, বাসন দাশ, রাজিব দাশ, দিলিপ দাশ, সমীরণ দাশ, রুপম দাশ, সুধির দাশ ও নারায়ণ দাশ।
কুমিরা দক্ষিণ জলদাস পাড়ার সর্দার নতুন জলদাস অভিযোগ করেন, গত কয়েকদিন ধরে সাদা পোশাকে পুলিশ জেলেপাড়ায় এসে ইয়াবা আছে বলে কোনো কোনো যুবককে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। আবার থানায় নেওয়ার আগে ওই যুবকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। এতে এলাকাবাসী আতংকে আছে। গত সোমবার রাতেও নিরপরাধ রুবেলকে একই কায়দায় ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এতে গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের প্রতিরোধ করে। পুলিশ নির্বিচারে গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালায়। পুলিশের সাথে কিছু বহিরাগত যোগ দিয়ে জেলেদের বাড়িঘর ও দোকানপাট ভাঙচুর করে, এলাকার নারী-শিশুদের ওপর হামলা চালায়।
কুমিরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মোরশেদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ইয়াবা ব্যবসায়ী রুবেলকে গ্রেপ্তারে বাধা দেওয়ায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয়। এসময় এক বৃদ্ধা পুলিশের হামলায় নিহত হয়েছে-এমন গুজব ছড়িয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হয় জেলেরা। জেলেদের হামলায় অনেক পুলিশ আহত হয়েছে। পুলিশও পাল্টা গুলি চালিয়েছে। এক পক্ষ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তুলেছে। তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. দেলওয়ার হোসেনের জানান, রুবেলের কাছে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা ছিল। এই তথ্য নিশ্চিত হয়ে পুলিশ তাকে আটক করলে জেলেরা এসআই জসীম ও সঙ্গীয় ফোর্সের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেয়। খবর পেয়ে তারা সেখানে গেলে জেলেরা তাকেসহ অন্তত ১৫ জন পুলিশকে অবরুদ্ধ করে হামলা চালায়। সেই সময় রাস্তার লাইট নিভিয়ে দেয় তারা। ফলে অন্ধকারে তারা কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। জেলেদের মদের বোতল, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এসআই আলীম ও সেকেন্ড অফিসার সুজায়েত আহত হন। এছাড়া ওসি (তদন্ত) মো. আফজাল হোসেন, কনস্টেবল কামরুলসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি অনেকেই আহত হয়েছেন। এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা করে জেলেরা ইয়াবা ব্যবসায়ী রুবেলকে ছিনিয়ে নেওয়ায় এসব ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে, সীতাকুণ্ড হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও সীতাকুণ্ড উপজেলা পুজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ গতকাল কুমিরায় আহত জেলেদের দেখতে জেলেপাড়ায় যান। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জেলেদের বাড়িঘর ভাঙচুর এবং নারী-পুরুষের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন ঐক্য পরিষদ নেতা পংকজ কুমার নাথ, সঞ্জীব কুমার দে, মানিক লাল বড়ুয়া, পূজা কমিটির বিমল চন্দ্র নাথ, স্বপন কুমার বণিক, স্বপন নাথ ও সুমন দাশ।

x