জুম্‌’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

শুক্রবার , ৩ মে, ২০১৯ at ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ
47

তারাবীহ্‌ নামায বিশ রাক’আত
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর বান্দাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহ ও কল্যাণ দ্বারা ধন্য করেছেন। স্বীয় অনুকম্পা দিয়ে তাদের পাপারাশি মার্জনা করেন এবং তাদের অপকর্ম মিটিয়ে দেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি একক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কেন অংশীদার নেই। যিনি নভোমন্ডল-ভূমন্ডলের অধিপতি। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৃষ্টিকূলের শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। তাঁর উপর দরুদ-সালাম বর্ষিত হোক, তাঁর পবিত্র বংশধরগণ সম্মানিত সাহাবাগণ, কিয়ামত অবধি নিষ্ঠার সাথে তাঁর পদাঙ্ক অনুসারীদের উপর অসংখ্য করুণাধারা বর্ষিত হোক।
সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করুন! আপনাদের প্রভুর ইবাদত করুন, ফরজ নামায সমূহ আদায় করুন, রমজান মাসে রোজা পালন করুন, রাত্রিতে তারাবীহ আদায় করুন, নবীজির সুন্নাত অনুসরণ করুন। খোলাফায়ে রাশেদীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করুন, সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেনদের কথা ও আমল সমূহ অনুসরণ করুন। মহান আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, “ঈমান ও আমলে যেসব মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণ সকলের অগ্রগামী এবং পরবর্তীতে যারা যথার্থরূপে তাদের অনুসরণকারী তাদের সকলের প্রতি আল্লাহ পাক সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। আল্লাহ পাক তাঁদের জন্য এমনসব জান্নাত তৈরি করে রেখেছেন যে গুলোর নিম্নদেশে স্রোতস্বীনি প্রবাহিত। তাঁরা সেথায় অবস্থান করবেন এটা এক বিরাট সাফল্য” (সূরা: তাওবা, আয়াত: ১০০)
হে মানবমন্ডলী! জেনে রাখুন! আরবি তারবীহ শব্দটি তারবীহাতুন এর বহুচন এর অর্থ আরাম করা, বিশ্রাম করা। যেহেতু সালফে সালেহীন বুজুর্গানে দ্বীনের মতে তারাবীহ নামাযের প্রতি চার রাকাত অন্তর অন্তর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়া হয় এ কারণে একে তারাবীহ নামকরণ করা হয়। তারাবীহ নামায নারী পূরষ সকলের জন্য সুন্নাতে মোয়াক্কাদা। আর জামাতের সাথে আদায় করা সুন্নাতে কেফায়া। সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যমত হলো তারাবীহ নামায বিশ রাকাআত। হাদীস শরীফ ও সম্মানিত মুজতাহিদ ইমাম গণের মতামতের আলোকে তারাবীহ নামাযের ফজিলত ও তারাবীহ নামায বিশ রাকাত প্রসঙ্গে শরয়ী প্রমানাদি উপস্থাপন করার প্রয়াস পাচ্ছি। তারাবীহ নামাযের ফজিলত ও বিশ রাকাত হওয়া প্রসঙ্গে অসংখ্য হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে এ পর্যায়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস শরীফ সকলের জ্ঞাতার্থে পেশ করা হলো।
তারাবীর নামাযের ফজিলত: “হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের রাতগুলোতে ঈমান ও ছওয়াবের আশায় তারাবীহ আদায় করল আল্লাহ তা’য়ালা তার অতীত জীবনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।” (বোখারী শরীফ, হাদীস নং ২০০৯)
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’য়ালা রমজানের রোজা ফরজ করেছেন, আমি রমজানে তোমাদের জন্য তারাবীহ সুন্নাত করেছি। অতএব যে ব্যক্তি রমজানে সিয়াম পালন করবে এবং বিশ্বাস ও ছাওয়াবের নিয়তে তারাবীহ আদায় করবে সে সদ্য নবজাত শিশুর ন্যায় গুনাহ থেকে নিষ্পাপ হয়ে যাবে (নাসাঈ শরীফ, হাদীস নং ২৫২০)
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করতেন :
“হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে বিতর ছাড়া বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করতেন”
(মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা খ.২,পৃ: ১৬৪)
তারাবীহ বিশ রাকাত হওয়ার হিকমত : দৈনিক বিতরসহ পঞ্জেগানা ফরজ নামাযের সংখ্যা ২০ রাকাআত। ফজর ২ রাকাআত, জোহর ৪ রাকাআত, আসর ৪ রাকাআত, মাগরীব ৩ রাকাআত এবং এশা ৪ রাকাআত। ফরজ নামাযের পরিপূর্ণতা দানের জন্য তারাবীহর রাকাআত সংখ্যাও ২০ রাকাআত নির্ধারণ করা হয়েছে। (ইবনে নজীম মিসরী: আল বাহরুর রায়ীক শরহে কানযুদ দাকায়িক ২/৭২)
মহল্লার সকলে যদি তারাবীহর জামাত ছেড়ে দেয় সবাই সুন্নাত পরিত্যাগকারী হিসেবে গণ্য হবে। মহিলাদের জন্য তারাবীহ নামায জামাত ছাড়া নিজগৃহে একাকী পড়া উত্তম।
( দুররে মুখতার খন্ড ১, পৃ: ৫২০)
হযরত ফারুকে আজম (রা.)’র খিলাফতে ২০ রাকাআত তারাবীহ :
হযরত সায়িব ইবনে ইয়যিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমিরুল মুমেনীন খলিফাতুল মুসলেমীন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)’র যুগে সাহাবায়ে কেরাম ২০ রাকাআত তারাবীহ পড়তেন। (বায়হাকী শরীফ, খন্ড ২, পৃ: ৬৯৯, হাদীস নং ৪২৮৮)
বিশ রাকাআত তারাবীহ সম্পর্কে হযরত আলী (রা.)’র অভিমত : “হযরত আবু আবদুর রহমান আসসুলামী সৈয়্যদানা আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, যে, তিনি (হযরত আলী) রমজান মাসে হাফেজদের কে ডাকলেন এবং তাঁদের মধ্য থেকে একজন হাফেজকে বিশ রাকাআত তারাবীহ পড়ানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।
(বায়হাকী শরীফ খ ২, পৃ: ৬৯৯, হাদীস নং : ৪২৯১)
হযরত আ’মশ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত যায়িদ বিন ওহাব (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ (রা.) রমজান মাসে আমাদের ইমামতি করতেন, আর হযরত আমশ বলেন, তিনি বিশ রাকাআত তারাবীহ এবং তিন রাকাআত বিতর পড়াতেন (ওমদাতুল কারী, শরহে সহীহিল বুখারী, খন্ড ২)
বিশ রাকা’আত তারাবীহ তাবিঈদের আমল: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কায়স, হযরত শুতাইর ইবনে শাকাল (রা.) থেকে বর্ণনা করেন তিনি রমজান মাসে বিশ রাকাআত তারাবীহ এবং বিতর নামায পড়তেন। (বায়হাকী শরীফ, হাদীস নং ৪৮০৩)
পাঁচ তারাবীহতে বিশ রাকাআত তারাবীহ হযরত আলী বিন রাবীআ (রা.) এর আমল : হযরত সাঈদ বিন ওবায়দ (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত আলী বিন রাবীআ (রা.) রমজান মুবারকে মুসলমানদেরকে পাঁচ তারবীহাতে বিশ রাকাআত তারাবীহ পড়াতেন এবং তিন রাকাআত বিতর পড়াতেন। (মুসান্নাফ আবু শায়বা খন্ড ২, পৃ: ২৮৫, হাদীস : ১১)
বিশ রাকাআত তারাবীহ খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত :
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজ যে ভাবে সুন্নাত সাহাবায়ে কেরামের আমলও সুন্নাত। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
“তোমরা আমার সুন্নাত ও আমার খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতের অনুসরণ করবে।” (মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল, হাদীস নং ১৭১৪৪)
বিশ রাকাত তারাবীহ সম্পর্কে ইজমা প্রতিষ্ঠিত :
ইসলামের সোনালী যুগ থেকে হাজার বছর ধরে বিশ রাকাআত তারাবীহ প্রচলিত আছে। এ প্রসঙ্গে হযরত ওমর (রা.)’র খিলাফত কাল থেকে বিশ রাকাআত তারাবীহ’র উপর সকল সাহাবায়ে কেরাম এর ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত। মযহাবের ইমামগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। হযরত ইমাম আবু হানিফা (রা.), হযরত ইমাম শাফেয়ী (রা.), হযরত ইমাম মালেক (রা.), হযরত ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (র.) প্রমূখ প্রত্যেকে বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করেছেন, অন্যদেরকে বিশ রাকাআত তারাবীহ আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে এক শ্রেণির তথাকথিত ইসলামের অপব্যাখ্যা কারীরা বিশ রাকাআত তারাবীহ শুধু অস্বীকার করছেনা আট রাকাআত তারাবীহ প্রমাণ করার জন্য মনগড়া ভিত্তিহীন বর্ণনা উপস্থাপন করে মুসলিম সমাজে প্রতিনিয়ত ফিত্‌না ফাসাদ সৃষ্টি ও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে যাচ্ছে। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি মক্কা শরীফ মদীনা শরীফ, বাগদাদ, কুফা, বসরা, শাম, সিরিয়া, আরব আজমসহ মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে সর্বসম্মতিক্রমে জামাত সহকারে বিশ রাকাআত তারাবীহ এর আমল চালু রয়েছে। সুতরাং অধিক সওয়াব অর্জনের লক্ষ্যে সহীহ হাদীসের উপর আমলের মাধ্যমে বিশ রাকাআত তারাবীহ আদায় করুন। আট রাকাআত প্রচারকারী ও বিশ রাকাআতকে বিদআত আখ্যাদানকারীদের বিভ্রান্তি থেকে নিজকে রক্ষা করুন। মুসলিম সমাজকে ইসলামের সঠিক তথ্য প্রচার করুন।
তারাবীহ নামাযকে উত্তম আমল হিসেবে নবীজির স্বীকৃতি: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন, লোকেরা এ সময়ে রমজান মাসে মসজিদের এক প্রান্তে নামায পড়ালেন, তিনি বললেন এরা কী করছে? বলা হলো এ লোকেরা কুরআনের কিছু জানে না, ওবাই বিন কাব নামায পড়ছে তাঁরাও তাঁর পিছনে নামায আদায় করছে রসুলুল্লাহ এরশাদ করছেন তারা সঠিক কাজ করছে, এটি খুবই সুন্দর কাজ (আবু দাউদ শরীফ হাদীস নং ১৩৭৯)
আল্লাহ আমাদের আপনাদের সকলকে কুরআনের বরকত দান করুন। পবিত্র কুরআনের আয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ দ্বারা আমাদের নাজাত দান করুন। আমি বিতাড়িত শয়তানের অনিষ্টতা হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। রমজান মাস যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানব জাতির জন্য এটি পথ প্রদর্শক ও সত্যের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য মিথ্যার পার্থক্য কারী। (সূরা বাক্বারা, আয়াত: ১৮৫)
লেখক : খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

x