জুমা’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

শুক্রবার , ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:২৯ পূর্বাহ্ণ
42

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। যিনি আমাদেরকে বিভিন্ন প্রকার সম্পদরাজি দ্বারা অনুগ্রহ করেছেন। সৃষ্টির যাকে ইচ্ছে হালাল পন্থায় সম্পদ উপার্জনের তাওফিক দিয়েছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি একক, অদ্বিতীয় তাঁর কোন অংশীদার নেই। যিনি মহা মহিমান্বিত শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় বান্দা ও প্রিয় রাসূল। যিনি পরিপূর্ণ শরীয়তের ধারক ও সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী হিসেবে প্রেরিত। তাঁর উপর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক। তাঁর পবিত্র বংশধরগণ ও সম্মানিত সাহাবাগণ এবং কিয়ামত অবধি নিষ্ঠার সাথে তাঁর পদাঙ্ক অনুসারীদের প্রতি অসংখ্য সালাম ও করুণাধারা বর্ষিত হোক।
সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা! আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করুন। জেনে রাখুন! সমুদয় সম্পদরাজি যা আপনাদের হস্তগত আছে আল্লাহ তা’য়ালা তা আপনাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ দিয়েছেন। সম্পদ অর্জনে ও সম্পদ ব্যয়ে পরীক্ষা নিহিত রয়েছে। সম্পদ অর্জনে পরীক্ষা হলো মানুষের মাঝে সাম্য ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ তা’য়ালা এমন ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা ও উপায়ে সম্পদ উপার্জনের বিধান প্রবর্তন করেছেন। যে বিধানে কোন প্রকার অবিচার ও সীমালঙ্ঘন থাকবে না। দ্বিতীয় প্রকার হলো, সম্পদ উপার্জনে খোদাভীতি না থাকা সম্পদ অর্জনে উত্তম পন্থা অনুসরণ না করা। হারাম-হালাল ন্যায় অন্যায় যেভাবেই হোক সম্পদ উপার্জনে মোহবিষ্ট থাকা। এ প্রকারের অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন তথা ব্যয় করলে কোন বরকত হবে না। এ প্রকারের হারাম উপার্জন দ্বারা দান সাদকা করা হলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের জন্য এ প্রকারের সম্পদ হবে জাহান্নামের পাথেয়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা মহা গ্রন্থ আল-কুরআনে এরশাদ করেছেন। “হে মানব মন্ডলী! তোমরা পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু সামগ্রী ভক্ষণ করো, আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিঃসন্দেহে শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা : আল বাকারা, আয়াত: ১৬৮)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা আরো এরশাদ করেছেন, “হে মুমীনগণ! আমি তোমাদের কে যেসব পবিত্র বস্তুসামগ্রী রিযক হিসেবে দান করেছি তা হতে ভক্ষণ করো এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করো। যদি তোমরা একান্তভাবে তাঁরই ইবাদত করো। (সূরা: আল বাক্বারা, আয়াত: ১৭২)
হালাল উপার্জনের গুরুত্ব ও হারাম বর্জন করা প্রসঙ্গে :
বর্ণিত বিষয়ে পবিত্র কুরআন মজীদে অসংখ্য আয়াত ও প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসংখ্য হাদীস শরীফ এরশাদ হয়েছে।
সুপ্রিয় মুমীন ভাইয়েরা !
মানব জাতির জন্য প্রবর্তিত আল্লাহর শরয়ী বিধান-কেবলমাত্র পঞ্জেগানা ইবাদতে নির্দিষ্ট নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ব্যবহারিক জীবনের লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিষ্টাচারিতা ও চারিত্রিক পূর্ণতা বিধানে ইসলামী জীবন বিধানের উপযোগিতা সর্বকালে সর্বযুগে মানব কল্যাণ সংরক্ষণে এক নিয়ামক ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। আল্লাহ তা’য়ালা বান্দার উপর হালাল উপার্জন করাকে তেমনিভাবে ফরজ সাব্যস্ত করেছেন, যেমনিভাবে ইসলামে নামায, রোজা, হজ ও যাকাতকে ফরজ করা হয়েছে। হালাল উপার্জন ছাড়া কোন প্রকার ইবাদতই আল্লাহ তা’য়ালা কবুল করেন না, যেমন হাদীস শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াসল্লাম এরশাদ করেছেন, হালাল রুজি-উপার্জন করা ফরজের পর একটি ফরজ। (রায়হাকী শরীফ, মিশকাত শরীফ-পৃষ্ঠা: ২৪২)
হারাম উপার্জনে দুআ কবুল হবেনা
হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াসল্লাম এরশাদ করেছেন, আল্লাহ মুমীনদেরকে সেই নির্দেশ দিয়েছেন যা তিনি দিয়েছেন সম্মানিত রাসূলদেরকে। আল্লাহ বলেন! হে রাসূল গণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে খাবার গ্রহণ করো এবং সৎকর্ম সম্পাদন করো, আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেন, হে মুমীনগণ! তোমাদের প্রতি আমার প্রদত্ত পবিত্র রিযক ভক্ষণ করো। অত:পর রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াসল্লাম এমন এক ব্যক্তি প্রসঙ্গে উল্লেখ করলেন, যিনি দীর্ঘপথ অতিক্রম করে ধূলিবালি অবস্থায় দু’হাত আসমানের দিকে উত্তোলন করে দুআ করে বলে হে আল্লাহ! অথচ তার খাদ্য পানীয় ও পোশাক পরিচ্ছদ সবকিছুই হারাম উপার্জনের, এমনকি সে হারাম খাদ্য দ্বারাই জীবন ধারণ করেছে সুতরাং তার দুআ কি করে কবুল হবে? (সহীহ মুসলিম শরীফ)
হারাম খাদ্যে গঠিত দেহ জাহান্নামে যাবে:
হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াসল্লাম এরশাদ করেছেন, যে মাংস হারাম খাদ্য দ্বারা গঠিত তা জান্নাতে প্রবেশ করবেনা। হারাম খাদ্যে গঠিত দেহের জন্য জাহান্নামের আগুনই উত্তম। (মুসনাদে আহমদ ও বায়হাকী)
অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ ও আর্থিক উপকারিতা গ্রহণ সবই হারাম উপর্জনের নামান্তর। মানব জাতির জীবন চলার পথে যা কল্যাণকর তা গ্রহণ করা বাঞ্চনীয়, যা কিছু অপবিত্র, ক্ষতিকর অকল্যাণকর তা বর্জন করা অপরিহার্য। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে।“ মানুষের নিকট এমন এক জমানা আসবে যখন তারা হালাল-হারাম, বাচ-বিচার না করে উপার্জন করবে। (বুখারী শরীফ)
নিজ হাতে উপার্জিত অর্থ উত্তম রিযক:
হযরত মিকদাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্য অপেক্ষা অধিক উত্তম খাদ্য কেহ কখনো ভক্ষণ করে না। আল্লাহর নবী হযরত দাউদ (আ:) নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্য ভক্ষণ করতেন। (বোখারী শরীফ, হাদীস নং ২০২৫)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি দশ দিরহামের বিনিময়ে একটি কাপড় ক্রয় করলো, যার মধ্যে একটি হারাম উপার্জিত দিরহাম রয়েছে যে পর্যন্ত ঐ কাপড় পরিধানে থাকবে আল্লাহ তার নামায কবুল করবেন না।(মুসনাদে আহমদ)
সম্মানিত মুসল্লীবৃন্দ!
আল্লাহকে ভয় করুন! উত্তম আমল করুন, হালাল রিযক অন্বেষণ করুন। অর্থ উপার্জনে উত্তম পন্থা অবলম্বন করুন।
হারাম উপার্জন জাহান্নামের পাথেয়:
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াসল্লাম এরশাদ করেছেন, যে বান্দা হারাম সম্পদ উপার্জন করে যদিও সে সাদকা করে তা কবুল করা হবে না। আর যদি ব্যয় করে তাতেও কোন বরকত হবেনা। আর যদি রেখে মারা যায় তা জাহান্নামে যাওয়ার পাথেয় হবে। আল্লাহ তা’য়ালা মন্দ কাজ দ্বারা মন্দকে মিটিয়ে দেন না, হ্যাঁ ভাল কাজ দ্বারা মন্দকে মিঠিয়ে দেন। নিংসন্দেহে নাপাকীকে নাপাকী দূরীভূত করতে পারেনা। (মুসনাদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ২য় খন্ড পৃ: ৩৬৭২, হাদীস নং ৩৮৭)
হালাল উপার্জনের লক্ষ্যে ব্যবসা করা সুন্নাত:
হালাল উপায়ে অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য করা সম্মানিত নবী রাসূলগণের সুন্নাত। হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, সত্যবাদী বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী নবীগণ, সিদ্দিকগণ ও শহীদগণের সাথী হবেন। (তিরমিযী শরীফ ১ম খন্ড, হাদীস নং ২২০৭)
অনেক অসাধু ব্যবসায়ী জাহান্নামে যাবে। “প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াসল্লাম এরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন ব্যবসায়ীদেরকে পাপী হিসেবে উঠানো হবে। অবশ্য যারা খোদাভীতি, ন্যায় নিষ্ঠা ও সততার সাথে ব্যবসা করেছে তাদের কথা ভিন্ন। মিশকাত শরীফ, পৃ: ২৪৪)
এই পার্থিব জীবনে অর্থ নৈতিক কর্মকান্ডের মধ্যে ব্যবসা-বানিজ্য হচ্ছে জীবন ধারনের বড় মাধ্যম। সভ্যতা সংস্কৃতির অগ্রগতির উপকরনাদির মধ্যে হালাল এবং পূত:পবিত্র উপকরণ।
(সূত্র: কিতাবুল ফিকহ আলাল আযাহিবিল আরবা’আ, ২য় খন্ড, পৃ: ৩০২)
হে আল্লাহ আমাদেরকে হারাম থেকে দূরে রেখে হালাল দ্বারা যথেষ্ট করুন এবং আপনি ভিন্ন অন্য কারো থেকে বিমুখ করে আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আমাদের ধন্য করুন। হে আল্লাহ আমাদের হালাল পবিত্র, বরকত পূর্ণ, রিযক দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বোত্তম রিযকদাতা। হে আল্লাহ আমাদের খাদ্য পানীয়, ফলফলাদি ও বৃক্ষরাজিতে বরকত দান করুন। হে আল্লাহ আমাদের কথা, কাজে আমলে উত্তম নিয়তে আপনার ভালবাসা ও সন্তুষ্টি দান করুন। নিশ্চয়ই হে আল্লাহ আপনি সর্বশক্তিমান। আল্লাহ! আমাদের আপনাদের সকলের জন্য মহাগ্রন্থ কুরআনের বরকত দান করুন। কুরআনের আয়াত সমূহ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ দ্বারা আমাদের নাজাত দান করুন। আমাদের আপনাদের বিশ্বের সকল মুসলমানের জন্য আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। বিতাড়িত শয়তানের অনিষ্ট হতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। মহান আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন হে মানব মন্ডলী! তোমরা পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু সামগ্রী ভক্ষণ করো, আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিংসন্দেহে শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা : আলবাক্বারা, আয়াত: ১৬৮) আমীন।
লেখক : খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

Advertisement