জুম’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজবী

শুক্রবার , ১৬ আগস্ট, ২০১৯ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ
103

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি অবিনশ্বর সত্ত্বা। জ্বীন ইনসান সকলেই নশ্বর সৃষ্টি। দরুদ-সালাম বর্ষিত হোক আমাদের সরদার মহান নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যিনি এরশাদ করেছেন “মৃত্যু হলো মুমীনের উপহার” (বায়হাকী) আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই যিনি একক অদ্বিতীয়, তাঁর কোন অংশীদার নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে নিশ্চয়ই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় বান্দা ও প্রিয় রাসূল। তাঁর পবিত্র বংশধরগণ, সম্মানিত সাহাবাগণ, নিষ্ঠার সাথে তাঁর পদাঙ্ক অনুসারীদের প্রতি অসংখ্য করুণাধারা বর্ষিত হোক।
হে মানব মণ্ডলী! আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করুন, জেনে রাখুন! মৃত্যু সত্য ও অনিবার্য বাস্তবতা। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। সৃষ্টি কূলের মুমিন, কাফির, নেককার, বদকার, ছোট, বড়, রাজা, প্রজা, ক্ষমতাবান ও সাধারণ, ধনী, দরিদ্র, সৎ, অসৎ, আস্তিক, নাস্তিক, সুস্থ, অসুস্থ, সবল, দুর্বল, সাধারণ, অসাধারণ, প্রত্যেক আত্মা মরণশীল। মহামহিম প্রভু স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টির প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।
পবিত্র কুরআনের আলোকে মৃত্যু :
মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অবশ্য তোমাদের কৃতকর্মের প্রতিদান কিয়ামত দিবসে প্রদান করা হবে। যাকে দূরে রাখা হবে জাহান্নামের অগ্নি থেকে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে কৃতকার্য, পার্থিব জীবন প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। মৃত্যু থেকে পালাবার কোন সুযোগ নেই” দেশে বিদেশে ঘরে বাইরে রক্ষিত অরক্ষিত পৃথিবীর দিগ-দিগন্তে যে কোন প্রান্তরে মানুষ অবস্থান করুক নির্ধারিত সময়ে মৃত্যু তার জন্য অনিবার্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, মৃত্যু তোমাদেরকে ধরবেই যদিও তোমরা সুদৃঢ় কিল্লায় বাস কর। (সূরা: নিসা, আয়াত: ৭৮)
এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা আরো এরশাদ করেছেন, হে রাসূল আপনি বলুন! যে মৃত্যু থেকে তোমরা পলায়ন করছ তা তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করবেই। অতঃপর তোমাদেরকে অদৃশ্য জগতের মহাজ্ঞানী আল্লাহর দরবারে প্রত্যাবর্তন করা হবে। তখন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের কৃত আমল সম্পর্কে অবহিত করবেন। (সূরা: জুমআ: আয়াত: ৮)
সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা জেনে রাখুন, হঠাৎ মূহুর্তের মধ্যেই মৃত্যুর আগমন ঘটে। এর জন্য কোন সময়, দিন, মাস, বৎসর নির্ধারিত নেই। মৃত্যুর জন্য অসুস্থ হতে হবে এমনও নয়। সুস্থ মানুষও আকস্মিক মৃত্যু বরণ করে। কখন কোথায় কিভাবে কার মৃত্যু হবে কেই জানেনা, এ কারণে সর্বদা মানুষের উচিত মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জন্যই আমাদেরকে মৃত্যুর কথা অধিক স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা স্বাদ, আনন্দ ধ্বংসকারীর অর্থাৎ মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করবে। (তিরমিযী শরীফ)
হাদীস শরীফের আলোকে মৃত্যুর বর্ণনা: মৃত্যু সম্পর্কে অসংখ্য হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে। অতএব ওহে আল্লাহর বান্দাগণ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। সকাল সন্ধ্যা, দিবা-রাত্রি, সর্বাবস্থায় মৃত্যুর ভয় অন্তরে ধারণ করুন, মৃত্যু পরবর্তী অনন্তকালীন চিরস্থায়ী সুখময় জান্নাত লাভের প্রত্যাশায় নিজের আমল সজ্জিত করুন এবং পরিবার পরিজন বন্ধু-বান্ধব প্রতিবেশী, দ্বীনি ভাইদের কল্যাণের স্বার্থে উপদেশ গ্রহণ করুন। আপনারা যা ভোগ করেছেন গতকাল পর্যন্ত তারাও আপনাদের সাথে সবকিছু ভোগ করেছেন, রকমারি সাজ-সজ্জা, পোশাক-পরিচ্ছদ যা আপনারা পরিধান করছেন, তারাও গতকাল পর্যন্ত আপনাদের অনুরূপ পরিধান করেছেন, অথচ তারা আজ আপনাদের ছেড়ে পরকালে কবরের বাসিন্দা। অতএব আমাদের কেও তাদের সাথে মিলিত হতে হবে। হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, দৈনিক পাঁচবার প্রত্যেক বাড়ির দরজায় মালাকুল মওত উপস্থিত হয়। যখন কোন মানুষকে এমতাবস্থায় পায় যে যার রিযিক শোষ হয়ে গেছে তার হায়াত নি:শেষ হয়ে গেছে তখন তার প্রতি মৃত্যু শোক নিক্ষেপ করেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন যতদিন জীবিত থাকবে ভালভাবে জীবিত থাকো, কারণ তুমি মরণশীল, যাকে ইচ্ছে দ্বীনি কারণে ভালবাস। কারণ তাকে ছেড়ে তোমাকে বিদায় নিতে হবে। তোমার ইচ্ছে অনুযায়ী আমল কর কারণ তুমি এর প্রতিদান পাবে।
মুসলিম ভাইয়েরা জেনে রাখুন, প্রত্যেক সুস্থতার সাথে অসুস্থতা আছে, যৌবনের সাথে বার্ধক্য এবং প্রত্যেক জীবনের সাথে মৃত্যু আছে। প্রত্যেক অস্তিত্বের সাথে নশ্বরতা আছে। অতএব ক্ষণস্থায়ী জীবনে উত্তম কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে স্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করুন।
আমরা দুনিয়াতে মুসাফির ও পরকালের যাত্রী: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাঁধ ধরে বললেন, দুনিয়াতে তুমি এমন ভাবে বসবাস করবে যেন তুমি মুসাফির বা পথ অতিক্রমকারী। একথার আলোকে হযরত ইবনে ওমর (রা.) বলতেন যখন তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হবে, সকালের আশা করবেনা। তোমরা সুস্থতার সুযোগ গ্রহণ কর অসুস্থতার পূর্বে, আর তোমার জীবনের সুযোগ গ্রহণ কর তোমার মরণের পূর্বে।(বুখারী শরীফ)
বিপদের সময় মৃত্যু কামনা করা নিষেধ: মানুষ অনেক সময় প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা, শত্রুতা ও জুলুম, নির্যাতনের শিকার হয়ে অস্থির হয়ে পড়ে এবং মৃত্যু কামনা করে। এসব কিছু পরীক্ষা স্বরূপ, ধৈর্য একমাত্র অবলম্বন। এমতাবস্থায় মৃত্যু কামনা করা নিষেধ। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমাদের কেউ যেন কখনো তার উপর অবতীর্ণ কোন বিপদ কষ্টের কারণে মৃত্যু কামনা না করে, যদি একান্তই মৃত্যু কামনা করতে হয় তাহলে সে বলবে হে আল্লাহ! যতক্ষণ আমার জন্য জীবন কল্যাণময় থাকবে ততক্ষণ আমাকে জীবিত রাখুন এবং আমার জন্য যখন মৃত্যু অধিকতর মঙ্গলময় হবে, তখন আমাকে মৃত্যু দান করুন। (বুখারী ও মুসলিম)
মৃতদেহ চাদর দিয়ে আবৃত রাখা উত্তম: মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর তারদেহ চাদর দিয়ে আবৃত রাখা উত্তম। এ প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) এরশাদ করেছেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাত হয় তখন একটি ডোরাকাটা চাদর দিয়ে তাঁর দেহ মোবারক ঢেকে দেয়া হয়। (বুখারী ও মুসলিম)
মৃতব্যক্তির চেহারা কিবলামুখী করা: মুসলমানদের কিবলা ঈমান ইসলাম ও হেদায়তের কেন্দ্র বিন্দু। জীবদ্দশায় ও মৃত্যু পরবর্তী কিবলার প্রতি সম্মানার্থে কিবলা মুখী করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আবু কাতাদা রাদ্বিয়াল্লহু তা’য়ালা আনহু এরশাদ করেন, যখন হযরত বারা ইবনে মারুর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু যখন ইন্তেকাল করেন তখন তিনি তাঁকে কিবলামুখী করে দেওয়ার ওসীয়াত করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তিনি প্রকৃতি সম্মত ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছেন। (হাকিম)
মৃত ব্যক্তির সমালোচনা করা নিষেধ: মৃত ব্যক্তির দোষ চর্চা করা সমালোচনা করা গুনাহের কাজ। তার দোষক্রটি বর্ণনা থেকে বিরত থাকুন, মৃতব্যক্তিকে গালমন্দ করে নিজের গুনাহের বোঝা ভারী করা থেকে বিরত থাকুন।
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা মৃতদের কে গালমন্দ করবেনা। কারণ তারা যে কর্ম করেছিল সেগুলোর কাছে তারা পৌছে গেছে। (বুখারী শরীফ)
মৃতব্যক্তির উত্তম কাজগুলো স্মরণ করুন। তার পরকালীন নাজাতের জন্য দুআ মাগফিরাত করুন, হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহ তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা তোমাদের মৃতদের সুন্দর উত্তম বিষয়গুলো স্মরণ করবে। তাদের মন্দ বিষয়গুলো আলোচনা থেকে বিরত থাকবে। (তিরমিযী শরীফ)
মৃতদের মাগফিরাত কামনায় যিয়ারত করা সুন্নত: হযরত বুরায়দা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম এখন তোমরা কবর যিয়ারত করতে পার কেননা কবর যিয়ারত আমাদের কে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। (মুসলিম শরীফ)
হযরত ওসমান ইবনে আফফান রাদ্বিয়াল্লাহুত’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃতের কবর দেওয়া সমাপ্ত হলে তার পাশে দাঁড়াতেন এবং বলতেন তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য মাগফিরাত কামনা করো এবং তার জন্য দৃঢ় থাকার তাওফিক প্রার্থনা কর, কারণ তাকে এখন প্রশ্ন করা হচ্ছে। (আবু দাউদ শরীফ)
জানাযায় অংশ গ্রহণ করার সওয়াব: হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হয়ে সালাতুল জানাযা আদায় করবে তার জন্য এক কীরাত পরিমাণ সওয়াব। কবর দেওয়া পর্যন্ত যে উপস্থিত থাকবে তার জন্য দুই কীরাত সওয়াব রয়েছে, জিজ্ঞেস করা হলো, দুই কীরাত কতটুকু? নবীজি এরশাদ করেন, বিশাল দুইটি পাহাড় পরিমাণ সওয়াব। (বুখারী ও মসলিম)
হে আল্লাহ! আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন! আমাদের পাপসমূহ মোচন করে দিন। নেককার বান্দাদের মত আমাদের মওত দান করুন। হে আল্লাহ দ্বীনের উপর আমাদের দৃঢ়তা ও ইসলামের উপর মৃত্যু নসীব করুন। হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক, মহান আল্লাহ আমাদের আপনাদের সকলকে কুরআনের বরকত দান করুন, পবিত্র কুরআনের আয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ দ্বারা আমাদের নাজাত দান করুন। নিশ্চয়ই তিনি মহান দানশীল, সৃষ্টি জগতের মালিক, পুণ্যময়, অনুগ্রহশীল, দয়ালু। আমীন।
লেখক : খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

x