জুতা কাহিনি

আলী আসকর

শুক্রবার , ২৩ আগস্ট, ২০১৯ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ
48

সাত বছর পর বাজারে নেমে বেশ অবাক হলো আবু হাসান। কোথাও কাদামাটির ছিঁটে ফোঁটা নেই। একতলা দ্বিতলা বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে সবখানে। চায়ের দোকানগুলো রঙ পাল্টিয়ে বড় আকার আকৃতির রূপ নিয়েছে। সাত বছর আগে বেশির ভাগ দোকানই ছিল কুঁজো ঝুপড়ি আর টিনের চালের। এখন এরকম একটি দোকানও কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
দাদা কালেকশন সেন্টার। বিরাটাকার চেহারা নিয়ে কাস্টমারের দিকে তাকিয়ে আছে। বিদেশের দোকানের মতো চেহারা। দেশের এই অভাবিত পরিবর্তনে আবু হাসান আপাদমস্তক পুলকবোধ করে।
এক জোড়া জুতোর জন্য এসেছে আবু হাসান। বিদেশ থেকে সব কেনা যায়, কিন্তু জুতা কেনা যায় না। জুতোর মাপের চেয়ে কঠিন জিনিস পরণের আরেকটি জিনিসেও নেই।
রূপা সু বিতানে ঢুকল আবু হাসান। হাঁটুভাঙা বাজারের সবচে’ বড় দোকান রূপা সু বিতান। সব জুতা সেন্ডেলে রূপা স্টিকার মারা। বাটা টাটা জুতোর মতো। দেশীয় প্রোডাক্টের ওপর গভীর সমীহ বাড়তে থাকল আবু হাসানের।
এক জোড়া জুতা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চোখ বুলাতে থাকল আবু হাসান। একজন সেলসম্যানের কাছে পৌছে বলল, ‘কতো দাম?’
‘বাইশ শ টাকা।’
‘কম কতো?’
‘এক দাম।’
একদাম বলার সাথে সাথে আবু হাসান এদিক ওদিক তাকাল, ‘একদাম’ একথাটা কয়েক জায়গায় লেখা আছে। এক ফালি লজ্জিত হলো নিজে নিজে।
বেশ যত্ন করে জুতার পেকেট করে দিল সেলসম্যান। হাসি ফোটালো মুখে। হাত তুলে ছোট করে একটা সালামও দিল।
‘তোমাকে আমি খুঁজে খুঁজে একসা। কখন গেলে বাজারে?’ ইসরাত আরা প্রশ্ন করে প্যাকেটটা হাতে নিল।
‘ঘুরতে ঘুরতে চলে গেলাম। হাঁটুভাঙা বাজার এখন আর হাঁটুভাঙা বাজারের মতো নেই। অনেক সাজ সাজ হয়েছে।’
‘রূপা কোম্পানির জুতা ভালো। বছর চলে যায়। কতো নিয়েছে দাম?’
‘বাইশ শ টাকা।’
‘দাম একটু বেশি। টেকসইও বেশি। বাটা কোম্পানি হেরে যাচ্ছে রূপার কাছে। আমার আগের জোড়াও রূপা থেকে কেনা।’
প্যাকেট খুলে জুতা নিচে রাখল ইসরাত আরা। পা কষাকষি করে দু’পায় জুতায় ঢুকাল। দুই পা হাঁটতে চেষ্টা করল। কিন্তু বেশ কষ্ট হলো।
‘এক সাইজ বড় হলে ভালো হতো।’ ইসরাত আরা বলল।
‘বিকেলে গিয়ে বড় সাইজ নিয়ে আসব।
‘যাবে?’
‘বাইশ শ টাকার জুতো, যাবো না?’
কোত্থেকে রবিন এসে হাজির হলো। ছেলেটা বাপের মতো হয়নি। বাপ নিমরাজি নিমরাজি স্বভাবের, ছেলে চঞ্চল, চটপটে।
‘গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেবো আব্বু।’
‘নাও। কাজ দেবে।’
‘আম্মু বললে শুধু গণিতের ওপর জোর না দিতে। এতো মজার সাবজেক্টে জোর না দিয়ে পারা যায়?’
‘আমি গণিতে ভালো ছিলাম। সব সময় স্টারমার্ক পেতাম।’
‘মায়ের কাছে শুনেছি।’
‘তোমার মা আমাকে নিয়েও গল্প করে তাহলে।’
‘ওমা, রাতদিন তো শুধু তোমার গল্প শুনি। তুমি দাদুর অমতেই বিয়ে করেছিলে, এই গল্পও শুনি।’
‘এবার গ্রামে গিয়ে অনেকদিন থাকব।’
‘দাদু তো এখন মাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। দুই টাকার সিদ্ধান্ত নিতেও মায়ের কাছে হাজির হয়।’
‘তোমার মায়ের মস্তিষ্কের নিউরনগুলো বেশ সচেতন।’
‘আমাদেরগুলো কি অসচেতন?’
‘অসেচতন না ঠিক, কম সচেতন।’
‘আবু হাসান বাথরুমে ঢুকে গেলেন। বাথরুম থেকে পানির শব্দ আসছে। দুনিয়ায় পানি পড়ার শব্দটাই বোধ হয় সবচেয়ে সুন্দর।
বিকেল বেলা জুতো নিয়ে বের হলো আবু হাসান। সূর্যটা লাল রঙ ছড়িয়ে ডুবতে শুরু করেছে। রাস্তার আশেপাশের লোকজন বেশ মশগুল কথাবার্তায়। কেউ কেউ বাজার থেকে ফিরছে থলেভর্তি কেনাকাটা নিয়ে।
সবার মাঝে তাড়াহুড়ো, যান্ত্রিকতা কাজ করছে।
জুতো নিয়ে ঢুকল আবু হাসান। কোনোকিছু ফেরত দিলে মনটা ছোট হয়ে থাকে। শরীরে লাজ-লজ্জা কাজ করে। আবু হাসানেরও তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেল না।
ম্যানেজার বারবার তাকাচ্ছে আবু হাসানের মুখের দিকে। বারবার তাকাচ্ছে প্যাকেটের দিকে। লোকটার চেহারায় বেশ মেজাজী মেজাজী ভাব। কেমন অসহিষ্ণু ঘোলাটে রেখায় ভরপুর।
‘কী চান ভাই?’
কথার জড়তা কেটে আবু হাসান বলে, ‘জুতা জোড়া বদলাতে এসেছি। এক সাইজ বড় হলেও চলবে।’
‘কখন কিনেছেন?’
‘সকাল বেলা।’
‘সাইজ কতো।’
‘এক চল্লিশ।’
‘মহিলাদের জুতা একচল্লিশের ওপর সাইজ থাকে না। জুতা কার জন্য কিনেছেন?’
‘ম্যাডামের জন্য।’
‘আপনার ম্যাডামের পা তো নৌকার পাটাতনের চেয়েও বড়। এসব পায়ের জুতা স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানাতে হয়। আমার ফ্যাক্টরিতে এত বড় ফর্মার কাজ এখনো হয় নি।’
‘এখন কী করি?’
‘করার কিছুই নেই। আমাদের এখানে ফেরতের কোন সিস্টেম নেই। থাকলে ফেরত নিতাম।’
আর এখানে থাকা যায় না, এক মুহূর্ত ভাবল আবু হাসান। তিনি দ্রুত বের হয়ে গেলেন দোকান থেকে। পাশে একটা চায়ের হোটেলে ঢুকলেন। পরপর দু’কাপ চা খেলেন। মাথায় মেজাজ চাপলে আবু হাসান এভাবে চায়ের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।
বাসায় ঢুকেই সোফায় গা এলিয়ে দিলেন আবু হাসান। জুতার প্যাকেটটা সোফার একপাশে অবহেলায় পড়ে আছে। ইসরাত আরা ঘরে ঢুকলে তার পা দুটো চুকচুক করে বারবার দেখতে থাকলেন আবু হাসান।
‘কী দেখছো?’
‘তোমার পা।’
‘আমার পা নতুন করে দেখার কী আছে?’
‘তোমার পা দুটো নৌকার পাটাতনের মতো কিনা দেখছি।’
‘মানে? মানেটা কী?’
‘দোকানের মালিক বললে নৌকার পাটাতনের মতো পায়ের জুতা তাদের কাছে নেই।’
ইসরাত আরা নিজের পায়ের দিকে একবার নজর দিল। তার পায়ের দুর্নাম সে কোনোদিন কারোর কাছ থেকে শোনেনি। দোকানের মালিকের ওপর তাবৎ রাগ মাথায় জমা হতে শুরু করল ইসরাত আরার।
‘জুতা ফেরত নেয়নি?’
‘না।’
‘আমি যাবো?’
‘তুমি গিয়ে কী করবে? বেশ শক্ত লোক। ফেরত নেবে না।’
ইসরাত আরা মুহূর্তে কী ভেবে যেন একটা কূলে এসে পৌঁছল। তার চোখেমুখে প্রতিশোধের একটা নরম বাতাস বইয়ে গেল।
রবিন পাশের সবগুলো সিঁড়ি উতরে গেল সবাইকে অবাক করে। এসএসসি, এইচএসসি পাস করল গোল্ডেন মার্ক ছুঁয়ে দিয়ে। এমএসসি পাস করল ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে। তিনদিন না যেতেই লেকচারার পদ পেল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছেলের পেছনে বেশ ঝাঁকুনি গিয়েছে ইসরাত আরার। এই ঝাঁকুনির ওপর এখন ফুল চন্দন পড়ছে সকাল বিকাল।
সংসারের বোঝা কিছুটা হালকা করতে চাইছে ইসরাত আরা। একদিন আবু হাসান বললেন রবিনকে বিয়ে দেয়ার কথা। আবু হাসান একপায়ে খুশি। ছেলের বউ দেখার জন্য দু’জনই একসময় এক জায়গায় ্‌ এসে গেলেন।
আবু হাসান বললেন, ‘একটা ভালো মেয়ে পাওয়া বড়ই মুশকিল। শালা বাবুকে বলা যায় না?’
‘বউ দেখা আছে।’
‘কোথায়, কী নাম, বাড়ি কোথায়?’
‘মেয়ের নাম রূপা। ফোর্থ ইয়ারে পড়ে। সুন্দরী মেয়ে।’
‘রবিন কি জানে?’
‘রবিন আমার পছন্দের বাইরে যাবে না।’
‘একবার জেনে নিলে ভালো হতো না?’
‘তুমি সবকিছু আমার ওপর ছেড়ে দাও।’
‘আচ্ছা, আচ্ছা, ছেড়ে দিলাম।’
‘দুই মিনিট বসো, চা বানাচ্ছি।’
একটা ম্যাগাজিন টেনে নিলেন আবু হাসান। নিয়ে ওটাতে মনোযোগী হলেন।
ইসরাত আরার কথায় বড় বোন ইসমাত আরা অবাক হলেন। কথাবার্তা ছাড়া কি এভাবে মেয়ে দেখা যায়? প্রস্তাব দেয়া যায়? যদি মেয়ে পক্ষ না করে দেয়? এই অদ্ভুত সিদ্ধান্তে ইসমাত আরা কোন কূল খুঁজে পান না।
ইসমাত আরা বললেন, এভাবে কেউ কোথাও মেয়ে দেখতে যায় না। এটা একদম ছেলেমানুষি।
‘ছেলেমানুষি হোক আর মেয়েমানুষি হোক, আমি কিন্তু হারবো না’ ইসরাত আরা বলল।
‘তোর মনের এই জোর কোত্থেকে আসে, এ্যাঁ?’
‘ছেলে থেকে। চাঁদের কাছে সবাই একদিন হেরে যায়।’
রবিন মায়ের এই দৃঢ়চেতা অভিব্যক্তির দিকে একবার তাকায়। মায়ের এই দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের জন্য তার বুকটা ফুলে ওঠে।
‘হাসান কি আমাদের সাথে যাবে?’ ইসমাত আরা জিজ্ঞেস করে।
‘না আপা, হাসান যাবে না।’
‘গাড়ি রূপপুর পৌছতে পঁয়ত্রিশ মিনিট গেল। তারা এক বিরাট বাড়ির সামনে এসে গেছে। গেটে একজন দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। অদ্ভুত চাহনি ঢেলে দারোয়ান তাদের আপাদমস্তক দেখছে।
‘কার কাছে এসেছেন?’ দারোয়োন জিজ্ঞেস করল।
‘জমির আলী সাহেবের কাছে এসেছি।’ ইসরাত আরা বলল। গেট হাঁ হয়ে খুলে গেল। ইসরাত আরা রাজহংসীর মতো সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
বিরাট ড্রয়িং রুম। বিরাট বিরাট ইরানি কার্পেট ঝুলানো দেয়াল। ড্রয়িং রুমের দক্ষিণ পাশে পাহাড়ি ঝর্ণার মতো কৃত্রিম ঝর্ণা। পানি পড়ছে পাথর খন্ডে। চমৎকার দৃশ্য।
ইসমাত আরা ক্ষীণকন্ঠে বললেন, ‘কথায় এসেছিস?’
রূপা ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকের বাড়িতে।’
রূপা ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক?
হ্যাঁ,
জমির আলী ফিনফিনে ধূসর রঙের একটা পাঞ্জাবী পরে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। জুলফির দু’পাশটা একেবারে সাদা হয়ে গেছে। আশ্চর্য চেহারা নিয়ে জমির আলী রবিনদের দিকে তাকিয়ে আছেন।
‘আপনাদের চিনতে পারলে নিজেকে বুদ্ধিমান বলে মনে করতাম। কিন্তু আমি সে রকম বুদ্ধিমান ব্যক্তি নই। আপনারা কী কাজে এসেছেন জানতে পারলে খুশি হতাম।’
‘আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি। নিশ্চয় আপনি আমাদের কিছু সময় দেবেন।’ ইসরাত আরা বিনীত কন্ঠে বলল।
‘নিশ্চয় দেবো। কেন দেবো না?’
‘ও আমার ছেলে রবিন। গোল্ডেন বয়। রূপপুর থানার সবাই তাকে চেনে। এসএসসি, এইচএসসি, এমএসসি, বিসিএসসহ সবখানেই সে গোল্ডেন প্লাস। এই গোল্ডেন বয়ের জন্য আপনার মেয়ে রূপাকে প্রস্তাব রাখছি।’
জমির আলীর দু’চোখ চকচক করে উঠল। আট নয় বছর আগে এই ছেলের হাতে তিনি ক্রেস্ট তুলে দিয়েছিলেন। এখনো স্পষ্ট মনে আছে তাঁর। রূপার জন্য এমন একটি ছেলে মনে মনে কল্পনাও করেছিলেন জমির আলী? আজকের এই আপ্লুত চেহারা বলে দিচ্ছে তিনি হয়তো এরকম কিছু স্বপ্ন দেখেছিলেন।
মিসেস জমির আলী যোগ দিয়েছেন ইতোমধ্যে। রবিন ওঠে দাঁড়িয়ে সালাম করল এই মহিলাকে। মহিলা মুগ্ধদৃষ্টি ফেলে রবিনকে দেখল। রূপার সাথে ফাটাফাটি মানাবে এই ছেলের। তাঁর সমস্ত শরীরে আনন্দ বার্তা ছড়িয়ে গেল মুহূর্তে। মিসেস জমির আলী ফের ভিতরের দিকে চলে গেলেন।
‘আপনাদের কোন ডিমান্ড থাকলে বলতে পারেন।’জমির আলী বললেন।
‘কোন ডিমান্ড নেই, রূপাই আমাদের আসল ডিমান্ড।’ ইসমাত আরা বললেন।
মিসেস জমির আলীর পেছনে পেছনে রূপাও এসে গেল। তার চোখে মুখে লজ্জার চিহ্নগুলো বেশ কাজ করছে। ইসমাত আরা রূপাকে পাশে বসিয়ে দিলেন।
ইসমাত আরা বললেন, ‘তুমি সুন্দর জানতাম, তবে এতো সুন্দর জানতাম না।’
রূপা আরো লজ্জায় পড়ল। ও মাথাটা আরো নিচু করে ফেলল।
ইসমাত আরা আংটি বের করলেন ব্যাগ থেকে। ইসরাত আরাও বের করলেন একটি আংটি। রবিন প্যাকেটে হাত দিল। তিনটে আংটি রূপার তিন আঙুলে চকচক করতে থাকল।
রবিনের বিয়েটা যে এভাবে হয়ে যাবে আবু হাসান ভাবতে পারেননি। রূপা পুরো ঘরটা আলো করে দিয়েছে এই মেয়ে। আজ তিনদিন হলো এ ঘরে এসেছে রূপা। টুকিটাকি এটা ওটাও করছে নিজের গরজে। আবু হাসানের জন্য চা-বিস্কিট এনে দিচ্ছে কখনো কখনো। আবু হাসান আনন্দে ভেসে বেড়াতে থাকল চন্দ্র সূর্যের মতো।
ইসরাত আরা রূপাকে কাছে ডেকে বলল, ‘তোমার পছন্দের খাওয়ার চার্টটা আামকে দিবা। তোমার শ্বশুরকে আর বসিয়ে বসিয়ে রাখব না।
রূপা আবু হাসানের দিকে একচোখ তাকিয়ে এক চিলতে হাসল।
‘কাল তুমি বাড়িতে যাচ্ছ। রবিনও তোমার সাথে যাবে।’
রূপা চুপ হয়ে থাকল।
‘যাওয়ার সময় আমাদেরটাই নিয়ে যাবে। সোনা কাপড় সব। এটা আমাদের পারিবারিক নিয়ম।’
রূপা চুপ হয়ে শুনল।
‘এই ঘরের মালিক এখন তুমি। সবকিছুর মালিকও তুমি। আমরা মুসাফির।
রূপা এখনো নিরুত্তর।
‘কাল আমিই তোমাকে সাজিয়ে দেবো। আমার শাশুড়িও এই কাজটি যত্নের সাথে করতেন। একচাপ চা খাওয়াবে বউ-মা?’
চা আনতে চলে গেল রূপা। ঝটপট চা বানিয়ে নিয়ে এল। দারুণ চা বানাতে পারে রূপা।
রূপাকে দেখে ভ্রু কোঁচকালেন জমির আলী। তাকে ঘিরে আছে এক দঙ্গল আত্মীয়-স্বজনেরা। উপস্থিত সবার চোখ কপালে উঠেছে। এতো বড় গলার সেট কেউ কখনো দেখেনি। কতো ওজন এই সেটের? কেউ আন্দাজ করতে পারছে না।
রূপা বলল, আমার গলা, হাতের, কানের সবগুলো আমার শাশুড়ির, আমার আঙুলেরটা হীরের। তাও আমার শাশুড়ির। ওটার দাম সাত লক্ষ টাকা। গলারটা বারো ভরির মতো। দুই হাতে এগারো ভরি। মাথার টিকলিটা পাঁচ ভরির। আমার শাশুড়ি এসবের মালিকানা ত্যাগ করে আমার মালিকানায় ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু জুতাগুলো আমার শ্বশুরের কেনা। এগারো বছর আগে কিনেছিলেন এই জুতা।’
উপস্থিত একজন চোখ কপালে তুলে বলল, ‘এগারো বছর?’
‘কিন্তু জুতাগুলোর একটু সমস্যা আছে। সাইজে একটু ছোট। শাশুড়ির দেয়া এনাম, ছোট হলেও আমি খুশি।
মেয়ের জুতার ওপর চোখ ফেললেন জমির আলী। তিনি চিনতে পারছেন এই জুতাগুলো। তাঁর নিজের ফ্যাক্টরির জুতা। এগারো বছর আগে সেই দৃশ্যপটটিও তাঁর চোখে ভেসে উঠল। পয়সার জন্য তিনি কতোই না নির্মম হয়ে গিয়েছিলেন।
নীরবে নিজের রুমে চলে গেলেন জমির আলী। মোবাইল হাতে নিলেন। একটা নামের ওপর আঙুল বসালেন।
‘বেয়াই আপনি? আমার মেয়ে পৌছেঁেছ তো? মেয়ে ছাড়া আমার একদম ভালো লাগছে না।’
আমি ক্ষমা চাইছি। বেয়াইকে বলবেন আমাকে ক্ষমা করে দিতে। টাকা পয়সা মানুষকে এক সময় অমানুষ করে দেয়। আমিও এই বৃত্তের বাইরে নই। ভালো থাকবেন।
বাইরে আকাশে চাঁদ উঠেছে। আজ রাতে পূর্ণিমা। চাঁদের জোছনা জানালা গলিয়ে মেঝেয় এসে ঠাঁই নিয়েছে। মাথাটা বেশ হালকা লাগছে ইসরাত আরার। যে অদৃশ্য বিশাল পাথর খন্ডটি এতদিন মাথায় চেপে ছিল, সেই পাথর খন্ডটি এখন আর নেই।
রূপা এখন কাছে নেই, রূপা কাছে থাকলে বলতো, বউ-মা, এক কাপ চা দেবে?

x