জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে গ্রামগুলো সাজাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে

বৃহস্পতিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ
36

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে সব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে গ্রামগুলোকে সাজাতে হবে। সে লক্ষ্যে তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে। গত ২৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেঙ সংলগ্ন ‘জমি অধিগ্রহণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা’ শীর্ষক উপস্থাপনা প্রত্যক্ষকালে এসব কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেবল উপজেলা পর্যায়ে নয়, ইউনিয়ন ওয়ার্ড এমন কি সব গ্রামে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে। আবাদি জমি রক্ষার কথা মাথায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতেও তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) ৩৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ভূমি অধিগ্রহণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা’ শীর্ষক চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। দেশব্যাপী ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে যে চলমান জরুরি নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়) চলছে, তার অংশ হিসেবে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
অতি সাম্প্রতিককালে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বেশ খানিকটা গতি সঞ্চার হয়েছে। বর্তমানে অনেক গ্রামেই আধুনিক বিভিন্ন অনুষঙ্গ দেখা যাচ্ছে। স্মার্ট সিটির পাশাপাশি উন্নত গ্রাম তৈরির কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। বিশাল এই কর্মযজ্ঞ সচেতনভাবে মনে রাখা একান্ত প্রয়োজন যে, গ্রামীণ বাস্তু বা ভৌত চেহারা পুরোপুরি বজায় রেখেই উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। আধুনিকীকরণের অর্থ মোটেই গ্রামীণ পরিবেশ প্রতিবেশ বিঘ্নিতকরণ নয়, বরং গ্রামীণ বৈচিত্র্য অটুট রেখে উন্নত রাস্তাঘাট, যোগাযোগ, সুপেয় পানি, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, কম্পিউটার ও দ্রুত গতি সম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ মানসম্পন্ন ভোগ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামের মানুষের কাছে উন্নত ও আধুনিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। আশার কথা, প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে গ্রামগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সাজানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আবাদি জমি রক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আশা করবো প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। দেশের উন্নয়নের ধারা বেগবান করতে আধুনিকীকরণের আওতায় গ্রামের সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি। এ প্রক্রিয়ায় ভূপ্রাকৃতিক বিন্যাস ও নৈসর্গিক বৈচিত্র্য যাতে বিনষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মহানগরী ও তাদের আশেপাশে উন্নতকরণের নামে বৃক্ষ নিধন ও নদী ভরাটের মতো অব্যবস্থাপনার চিত্র প্রকট। গ্রামকে আধুনিক করার নামে বৃক্ষনিধন ও নদী ভরাটে, খাল-বিল ভরাটের মতো বিষয়গুলো যেন না ঘটে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইদানীং কালে পৃথিবীতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিশেষ করে উন্নত গ্রাম তৈরির ক্ষেত্রে। কাজেই উন্নয়ন কার্যক্রমে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলোকে আমলে নিতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে গ্রামীণ পরিবেশ, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যকে। মনে রাখা দরকার, প্রতিটি উন্নয়নের একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে, আর অদূরদর্শী উন্নয়নের প্রথম বলি হয় পরিবেশ। বাংলার গ্রামগুলো একদিনে তৈরি হয়নি। হাজার হাজার বছর লেগেছে এই পরিবেশ-প্রতিবেশ তৈরি হতে, এই জীববৈচিত্র্য সৃষ্টি হতে। তাই গ্রামগুলো সাজাতে খুবই বুদ্ধিমান, ধীশক্তিসম্পন্ন, সৃজনশীল পরিকল্পনাবিদের প্রয়োজন। এছাড়া সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার বিষয়েও সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার।
বৈদ্যুতিক লাইন যাবে, কিন্তু এর তারগুলো কিভাবে নেওয়া হবে, বিদ্যুতের খুঁটিগুলো কোথায় বসবে, কৃষিজমির ক্ষতি কিনা, এসব কিছু দেখতে হবে। সৌরবিদ্যুতের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। গ্রামকে গ্রামই রাখতে হবে। এক্ষেত্রে শহরের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করাটাই আসল কথা্‌ অর্থাৎ গ্রামেই বন্দোবস্ত করতে হবে নাগরিক বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়োনিষ্কাশন ও বিশুদ্ধ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা। উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ নির্মাণের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। দেশে কৃষিজমি সংক্রান্ত কিছু নিয়ম আছে, যেমন তিন ফসলি চাষের জমি কোন অবস্থাতেই পরিবর্তন করা যাবে না। এমন কি দুই ফসলি কৃষি জমি চাষের জন্য রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত কোনো অবস্থাতেই জলাশয়, পুকুর, নদী-খাল-বিল ভরানো ভরাট করা যাবে না। নিতান্তই করতে হলে পরিকল্পনা মাফিক করতে হবে। পাহাড় কাটা যাবে না। এ সংক্রান্ত আইন রয়েছে। আইনগুলো মেনে চলতেই হবে।
কেবল অবকাঠামোগত পার্থক্য নয়, গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য বিদ্যমান। এ বৈষম্য কোন এলাকায় কেমন পর্যায়ে আছে, কোন কোন ক্ষেত্রে আছে এমন কি শহরের মধ্যে কতটা আছে-সবই আগে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এ জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি। কর্মসূচি বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের তদারকি একান্তই আবশ্যক। গ্রামভিত্তিক উন্নয়নে সরকারের সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্যোগ আছে, তবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি দেশের সব জায়গায় সুষমভাবে পৌঁছাতে হলে তা ডিজিটাল মাধ্যমেই নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় দূরশিক্ষণ বা অনলাইন স্কুর, চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যে টেলিমেডিসিন সেবা হতে পারে উত্তম বিকল্প। যদিও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোর (ইউডিসি) মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ মানুষ জীবন বীমা পলিসি প্রণয়ন, পল্লী বিদ্যুতের বিল পরিশোধ, সরকারি ফরম পূরণ পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রাপ্তি, অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফরম পূরণ, অনলাইন জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ভিজিএফ-ভিজিডি তালিকা, নাগরিক সনদ প্রাপ্তি কৃষি তথ্য ও স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রাপ্তি প্রভৃতি সেবা গ্রহণ করছে এসবই ইতিবাচক সন্দেহ নেই। আমরা মনে করি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে গ্রাম আধুনিকীকরণ এবং বৈষম্যমুক্ত একটি গ্রামীণ সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যথাযথ অর্থে আমরা মাধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম হবো।

x