জীবন সংগ্রামী পাঁচ জয়িতার গল্প

আকাশ আহমেদ : রাঙ্গুনিয়া

সোমবার , ২৯ জুলাই, ২০১৯ at ৪:২৫ পূর্বাহ্ণ
133

দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে একাগ্রতা ও পরিশ্রমে সফলতা পেয়েছেন রাঙ্গুনিয়ার পাঁচজন নারী। সমাজের নানা বঞ্চনা, অবহেলা, নির্যাতন প্রতিহত করে তারা এখন এলাকায় অনুকরণীয়। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক দপ্তরের ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সম্প্রতি এই ৫ সফল নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। সম্মাননা পাওয়া সংগ্রামী এই ৫ নারীর জীবন কাহিনী একেক জনের আলাদা আলাদা।
শিপ্রা বড়ুয়া : শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী এক নারীর নাম শিপ্রা বড়ুয়া। রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড সৈয়দবাড়ি গ্রামের শৈবাল তালুকদারের স্ত্রী শিপ্রা বড়ুয়া। ৫ ভাই ৩ বোনের সংসারে দারিদ্রতার কারণে মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও শিপ্রাকে এইচএসসি পড়ালেখাকালীন সময়েই বিয়ে দেয় তার মা-বাবা। কিন্তু শ্বশুর বাড়িতেও দারিদ্র্যতা তার পিছু ছাড়েনি। সেখানে ৭ বোন, ২ ভাই ও বিধবা মায়ের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল তার স্বামী শৈবাল। পুলিশ কর্মকর্তা বাবার মেয়ে হয়েও শ্বশুর বাড়িতে এসে পাতা কুড়ানো, জ্বালানি সংগ্রহ করা, ধান শুকানো, বাটনা বাটা, গোবর লাঠি বানানো সেরে জমিতে বীজ বপন করা, সেলাই কাজ করা সহ এমন কোন কাজ নেই যেটা তাকে করতে হয়নি। সারাদিন ধরে এসব করে সন্ধ্যায় ছোট দেবর-ননদদের পড়াতেন তিনি। এরপরেও শ্বশুর বাড়িতে নানা গঞ্জনা শুনতে হতো তাকে। এত প্রতিকূলতার মাঝেও সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন। বি-এড ট্রেনিং করেন এবং এমএ পাস করেন। কর্মজীবনের শুরুতেই নিজের মেধা দিয়ে তিনি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরিতে যোগদান করেন। সংসারে বড় মেয়ে বর্তমানে ইংরেজিতে এমএ এবং ছোট মেয়ে গণিতে এমএ পাস করে শিক্ষকতা করছেন। শিপ্রা বড়ুয়া চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। অদম্য এই নারী শ্বশুর বাড়ির নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে নিজের স্বপ্ন সত্যি করে জীবনে সফল হয়েছেন।
মদিনা বেগম : জীবন যুদ্ধে সফল এক নারী মদিনা বেগম। উপজেলার হোছনাবাদ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড খিলমোগল গ্রামের কৃষক পরিবারে তার জন্ম। ১৯৭৩ সালে এসএসসি পাস করেই দারিদ্র্যতার কারণে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় তার। এর আগে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে রান্না-বান্না, বাজার করা ও খবরাখবর সংগ্রহ করার কাজ করেছেন। ১৯৭৪ সালে রাঙ্গুনিয়ার ইছাখালীতে একটি আরডিপি’র মহিলা কর্মসূচিতে মহিলা পরিদর্শক পদে যোগদান করেন। ১৯৭৬ সালে রাঙ্গুনিয়ার মরিয়মনগর এলাকার আইয়ুব আলীর সাথে তার বিয়ে হয়। তার সংসারে রয়েছে ২ ছেলে ও ২ মেয়ে। ১৯৭৭ সালে স্বামীর আপত্তির মুখে চাকরি ছাড়লে পরিবারে অভাব-অনটন ও নানান মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে তার স্বামী তাদের রেখে নিরুদ্দেশ হলে সন্তানদের চালাতে গিয়ে শুরু করেন নানান কাজ। সেলাই কাজ, বাঁশ-বেতের কাজ করা, জাল বোনা, কৃষি কাজ ইত্যাদি করে সংসারের হাল ধরেন তিনি। পাশাপাশি সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত করতে নিরলস পরিশ্রম করে যান। এর মধ্যে কাজ করেছেন বিভিন্ন বেসরকারি এনজিও সংস্থায়। নানা পরিশ্রম করে সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলেন তিনি। তার বড় ছেলে আবু মনছুর চট্টগ্রাম ওয়াসায়, মেঝ ছেলে আবু বকর এমকম পাস করে চট্টগ্রামের হেড অব এপারেল মার্চেন্ডাইজিয়ে, মেয়ে মালেকা নাসরিন বানু স্মাতক পাস করে শিক্ষকতা ও ছোট মেয়ে মালেকা শিরিন বানু এইচএসসি পাস করেন। ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলা ছাড়াও সমাজের বিভিন্ন সেবামূলক কাজে জড়িত থাকার স্বীকৃতি স্বরূপ পর পর ২ বার হোছনাবাদ ইউনিয়নে ইউপি সদস্যা নির্বাচিত হয়েছিলেন। এছাড়াও হোছনাবাদ ইউনিয়নের প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, ব্রাক সংস্থার সহযোগিতায় ৩টিরও অধিক ব্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষাক্ষেত্রে রাখেন বিশেষ অবদান। গ্রামীণ পিছিয়ে পড়া ছেলে-মেয়েদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই, বাটিক-বুটিক, কার্পেন্টার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এভাবে জীবন যুদ্ধে নানান ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন মদিনা বেগম।
রাশেদা আকতার : রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড তিনচৌদিয়া গ্রামের আহমদ শুক্কুর ও আনোয়ারা বেগমের কন্যা রাশেদা আকতার। অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী এই নারী তার পিতা-মাতার ৭ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। পাহাড় থেকে লাকড়ি কাটার টাকায় সংসার চলতো তাদের। অভাব অনটনের কারণে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে ইতি টানেন পড়ালেখার। সংসারের দারিদ্র্যতা গুছাতে তিনিও মায়ের সাথে পাহাড় থেকে লাকড়ি কাটা এবং গ্রামের ছোট বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন। একসময় তিনি সেলাইয়ের কাজ শেখেন এবং টিউশনির টাকা জমিয়ে প্রথমে একটি সেলাই মেশিন এবং পরবর্তীতে ৩টি মেশিন কিনে একটি সেলাইয়ের দোকান দেন। তার দোকানে সেলাইয়ের কাজের পাশাপাশি তিনি অন্যান্য নারীদেরও প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ করেন। আর এই উপার্জন দিয়ে তিনি সংসার চালানো ও ছোট ভাই-বোনদের পড়ালেখার খরচ চালাতেন। রাশেদার সেলাই দোকানে গ্রামের অনেক মেয়ে কাজ শিখে নিজেরাও হয়েছেন স্বাবলম্বী। বর্তমানে রাশেদার দোকানে ২ জন পুরুষ ও ১০ জন মহিলা কর্মচারী রয়েছে। এভাবে জীবন সংগ্রামে দারিদ্র্যতাকে পেছনে ফেলে এবং সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতাকে পেরিয়ে তিনি এখন সফল নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তার হাত ধরেই আসে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা। তার অক্লান্ত পরিশ্রমে এখন তার ভাই এইচএসসি, ছোট বোন এসএসসি পাস করে এবং অন্য বোন ১০ম শ্রেণিতে পড়ে।
শেলী দাশ : রাঙ্গুনিয়ার পার্শ্ববর্তী রাউজান উপজেলার পূর্ব গুজরা গ্রামের তপন দাশ ও মনজু মহাজনের ৩ কন্যা ও ১ পুত্র সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান শেলী দাশ। বিয়ের পর এখন তিনি রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড ঠাণ্ডাছড়ি গ্রামের স্বামীর বাড়িতে থাকেন। তিনি শ্বশুর বাড়ি এলাকার আশেপাশের লোকদের বিভিন্ন সমস্যায় দিনরাত পাশে থেকে সাহায্য করতেন। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের বিপদে পাশে থাকার কারণে সবার ভালবাসায় বর্তমানে রাজানগর ইউনিয়নের ৪, ৫, ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যা নির্বাচিত হন। মহিলা মেম্বার হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার আগে ও পরে তিনি এলাকার মহিলাদের পারিবারিক বিবাদ মিটানো সহ নারী নির্যাতন, বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে মহিলাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করেছেন। এছাড়া বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড প্রাপ্তিতে এলাকার দরিদ্র, অসহায় জনগণকে সহযোগিতা করেন। এলাকার মহিলাদেরকে আত্ম-নির্ভরশীল করার জন্য তিনি তাদেরকে উৎপাদনমুখী বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণে পরামর্শ দান ও ঋণ গ্রহণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন। তিনি রাণীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঠাণ্ডাছড়ি হাকিমনগর স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য। এছাড়াও তিনি উদ্যোগী হয়ে স্যানিটেশন সচেতনতা সৃষ্টি সহ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, বহুবিবাহ রোধ ও যৌতুক সহ বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে এলাকায় তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন।
মনজুরা বেগম : সংসার জীবনে নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা সফল এক নারীর নাম মনজুরা বেগম। রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড ফকিরখীল গ্রামের আহমদ মিয়া ও মাহমুদা খাতুনের সন্তান তিনি। মনজুরার বিয়ে হয় ১৯৭৪ সালে। তার স্বামী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। বিয়ের পর থেকে সুখেই সংসার চলছিল তার। পরিবারে চার ছেলে, চার মেয়ে নিয়ে মনজুরার সংসার। কিন্তু তার কপালে এই সুখ বেশিদিন সইলো না। সংসার জীবনের এক পর্যায়ে তার স্বামীর জীবনে চলে আসে অন্য এক নারী। এরপর থেকেই স্বামী মনজুরাকে তালাক দেওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করে। এদিকে ছোট ৮ সন্তানকে নিয়ে কোথায় যাবেন সেই চিন্তাই তালাক পেপারে স্বাক্ষর না করায় স্বামী তার উপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করে। নির্যাতনের এক পর্যায়ে ছোট ৮ সন্তান সহ তাকে ঘর ছাড়া করেন তার স্বামী। সংসার হারা মনজুরা স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেন, যখন তার মামলা সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না। একদিকে সংসারে অভাব অন্যদিকে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ, সাথে আবার মামলা চালাতে গিয়ে একেবারে দিশেহারা অবস্থা তার। এক পর্যায়ে তাকে আলোর পথ দেখালো বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড। উক্ত সংস্থার সহায়তা পেয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিয়ে তিনি গ্রাম্য কুটির শিল্পের কাজ শুরু করেন। একসময় মামলাতেও জয়ী হন তিনি। কুটির শিল্প থেকে উপার্জিত টাকায় তিনি ছেলেমেয়ে নিয়ে অবশেষে সুখের জীবনের সন্ধান পান। তার মতো অসহায় ও নির্যাতীত নারীদের সাহায্য করতে গিয়ে ২০১১ সালে রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি।
এখন তার চার ছেলেমেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর ১ ছেলে প্রবাসে থাকেন, এক ছেলে সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন, ১ জন ব্যবসায়ী ও একজন অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। নিজের ৮ সন্তানকে নিয়ে মনজুরা বেগম জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়ে এখন খুব সুখী। স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়েও হতাশাগ্রস্ত না হয়ে নতুন উদ্যমী নারী হিসেবে জীবনের দুঃখ গুছিয়েছেন তিনি।

x