জীবন সংকেত নাট্যগোষ্ঠী’র ‘ন-বৃত্তীয়’ দৃশ্যকাব্যে গ্রাফিতির সুবোধ

পাভেল আল মামুন

মঙ্গলবার , ১ অক্টোবর, ২০১৯ at ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
78

“প্রিয় হবিগঞ্জবাসী আজ ১২ সেপ্টেম্বর ও আগামীকাল ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭.৩০ ঘটিকায় স্থানীয় টাউনহল মিলনায়নে অনুষ্ঠিত হবে জীবন সংকেত নাট্যগোষ্ঠী’র ৩৬তম প্রযোজনা নাটক- ‘ন বৃত্তীয়।’ রচনায় হবিগঞ্জের খ্যাতনামা নাট্যকার রুমা মোদক, পরিচালনায় ফজলুর রহমান পলাশ। আপনারা সবাই আমন্ত্রিত।” হবিগঞ্জ টাউন হলের ছাদে বাঁধা মাইক থেকে কিছুক্ষণ পর পরই আসছিল ঘোষণাটা । দলটির সাথে কথা বলে জানা গেল নাটক শুরুর আগে হলে এবং পুরো শহরে এভাবেই মাইক বাজিয়ে প্রচার চালানো হয়েছে। এই পদ্ধতিতে নাটকের প্রচার চালানো দলটির প্রথা এবং ঐতিহ্য। নাটক শুরুর কিছু আগে দলের একজন সদস্যকে প্রবেশ দরজায় গিয়ে বলতে শোনা গেল- “টিকেটবিহীন বয়স্কদের কেউ ঢুকতে চাইলে টিকেট ছাড়াই ঢোকাবে”। ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরের নাট্য শিল্পী এবং দর্শক- জেলা শহরের এই স্বাদের সাথে অনেকাংশেই অপরিচিত। তৃণমূলের নাট্যচর্চার বৈচিত্র ও সীমাবদ্ধতার অনেক গল্পই তাদের অচেনা। উদ্বোধনী মঞ্চায়নের প্রারম্ভিকতায় মাইক্রোফোন হাতে নাট্যকার রুমা মোদক সেই অচেনা পাঠের এক সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপস্থাপন করলেন নিজেই।

ন বৃত্তীয় নাটকের মঞ্চে প্রথম প্রদর্শিত হবার কথা জানুয়ারিতে ভারতের তিনটি উৎসবে। ভিসা জটিলতায় যাওয়া হলো না। নাটক মঞ্চে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত। পরিকল্পনা হল হবিগঞ্জেই শো করার। কিন্তু দুটি হলই অকেজো। একটিমাত্র বিকল্প শিল্পকলা একাডেমিতেও সংস্কার কাজ তখনই শুরু হলো । সেপ্টেম্বরে খুলে দেয়া হয়েছে হবিগঞ্জ পৌর মিলনায়তন। নাট্য উপযোগী নয় একেবারেই- আলো বাঁধার আর্চ নেই, পর্দা নেই- তবু নিজেদের উদ্যোগে সেটাকে গড়ে নেয়া হল। খরচটাও একটা প্রশ্ন হয়ে সামনে দাঁড়ায়। তবে সামান্য হলেও পাশে থাকার মানুষ পাওয়া যায়। সব যখন প্রস্তুত তখন গুরুত্বপূর্ণ একজন শিল্পী পায়ের আঙুল ভেঙে তিনমাসের জন্য বিছানায় বন্দী। তারপরও ‘ন বৃত্তীয়’ মঞ্চে। নাট্যকারের বর্ণনায় নেপথ্যের পাঠ নিয়ে দর্শক হলেন নাট্যমুখী।
‘ন বৃত্তীয়’ এক সমকালীন জীবনের ক্যানভাস। সমকালীন দ্বান্দ্বিক আর হতবিহ্বল চরিত্র সুবোধ এর নায়ক। সুবোধের জন্ম এক গৃহস্থ পরিবারে। বাবা মায়ের নির্মল প্রেম তার জন্মের প্রারম্ভিক পরিবেশ। যেখানে অল্পে তুষ্ট এক নারীর প্রতি পরিপূর্ণ আসক্ত এক যুবক প্রবল সুখের বাতাসে ভাসতে থাকে সর্বক্ষণ। তবু নির্মল প্রেম দূষিত হয় সন্দেহের বিষবাষ্পে। আসক্তির বদলে বাড়তে থাকে বিরক্তি। শুরু হয় নারীটির প্রতি চিরায়ত নির্যাতন। বিষাদময় জীবন থেকে মুক্তির স্বপ্নে সুবোধের মা ঘর ছেড়ে পালায় অন্যের হাত ধরে। মায়ের গন্ধে সুবোধও আসে সেখানে। সময়ের ব্যবধানে সুবোধ অবলোকন করে মায়ের একই জীবনের পুনরাবৃত্তি। নির্যাতিত মাকে বাঁচাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু নিজে বাঁচতে পালিয়ে আসে শহরে। শহরের আর গ্রামের অবরুদ্ধ ব্যবস্থায় বড় হয় সুবোধ। চাকরির প্রচেষ্টায় ক্রমাগত ব্যর্থ আর দশজন বেকারের মত তারও অবলম্বন হয় গৃহশিক্ষকতা। নবম শ্রেণির ছাত্রী যখন প্রেম আর কাম নিবেদন করে- তার বিবেক বলে এ অন্যায়। তবু রক্তমাংসের সুবোধের মনে প্রেম-কাম দুটোই নাড়া দেয়। সেই নাড়ায় সাড়া দেয় সুবোধ। একান্ত অভিসারে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ধরা পড়ে মাস্তানদের হাতে। মায়ের দুর্দশা দেখে পালিয়ে আসা সুবোধ সেখানেও নিজেকে বাঁচাতে আবার পালায়- প্রেমিকাকে তুলে দেয় তাদের হাতে। এর জন্য সে ব্যথিত হয়। নিজেকে কাপুরুষও মনে হয় তার। তবু সে নিরুপায় ভেবে নিজেকে গুছিয়ে নেয় । এবার সুবোধের চাকরি হয়। দুএক দিনেই বুঝতে পারে- এক নিষিদ্ধ জগতে মাদক কারবারির অধীনে পা দিয়েছে সে । আবারও বিবেক নাড়া দেয়। পালাতে থাকে সুবোধ। এর মাঝে সে স্বাক্ষী হয়- প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাঝে এক হত্যাকান্ডের । মৃত ব্যাক্তির চেহারাটা হুবহু তার মতো। চূড়ান্তে সে প্রতিবাদী হয়ে উঠে। এখানেই সমাপ্তি ‘ন বৃত্তীয়’র উপস্থাপনের।
গল্পের এই সুবোধের জন্ম রাজপথের গ্রাফিতিতে। ঢাকার রাজপথে বছর দুয়েক আগে কে বা কারা সুবোধ চরিত্র বানিয়ে এঁকেছিল নিয়মিত কিছু গ্রাফিতি। যেখানে লিখা ছিল- ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, সময় এখন পক্ষে না’, ‘সুবোধ এখন জেলে, পাপবোধ নিশ্চিন্তে বাস করছে মানুষের মনে’, ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, তোর ভাগ্যে কিছু নেই’ এরকম কিছু কথা আর সাথে দেয়ালে আঁকা সুবোধ এর ছবি- কখনো হাতে বাঙবন্দী সূর্য নিয়ে পালাতে উদ্যত, কখনো জেলে বন্দী, কখনো হতাশায় ঝুঁকে পড়া এক মানুষের প্রতিমূর্তি । গত শতাব্দীর মাঝামাঝিতে জন্ম নেয়া প্রতিবাদের অভিনব শিল্প আধুনিক এই গ্রাফিতির সাথে এ-দেশের মানুষের প্রথম পরিচয় নব্বই’র দশকে। ‘কষ্টে আছি আইজুদ্দিন’ অথবা ‘অপেক্ষায় নাজির’- দেয়াল লিখনগুলো অনেকের কাছেই পরিচিত। এদের উত্তরসূরী চরিত্র গ্রাফিতির সুবোধ। সুবোধ নিয়ে হয়েছে নানা বির্তক। তৈরি হয়েছে পক্ষ-বিপক্ষ।
বির্তকিত এই সুবোধকে অনেকখানি ভর করে রুমা মোদক ২০১৮ সালের নভেম্বর এ রাইসিং বিডিতে একটি গল্প প্রকাশ করেন । গ্রাফিতির সুবোধ নাগরিক মনে যে অনুরণন তৈরি করেছিল এবং তৎকালীন যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল তার এক পিঠ- মানবিক মূল্যবোধের বিপর্যয়ের উপস্থাপন ছিল গল্পটিতে। অপর পিঠের রাজনৈতিক শঙ্কা এবং বিতর্ক এর বাইরে বেরিয়ে ছিল সুবোধের নতুন এক রূপ। যেখানে প্রাধান্য পেয়েছে সমকালীন ব্যাবস্থার সংকট এবং বর্তমান দশকে তৈরি হওয়া স্বার্থপর নাগরিক মানসিকতা । সুবোধ চরিত্রে ভর করে গল্পটিতে যে সমকালীন মানুষ এবং মনস্তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়েছে তার অস্তিত্ব কুড়ি বছর আগের সমাজেও বিদ্যমান ছিলনা । এক কথায় সুবোধ সমকালীন বাস্তবতার গল্প। শুধু পরিণতির যে প্রতিবাদী সুবোধ তা লেখিকার ইউটোপিয়া যা মার্ক্স এর প্রলেতারিয়েত বিপ্লবের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা- এই সময়ের বিক্ষিপ্ত নাগরিক সুবোধদের মাঝে।
এই গল্প থেকেই দৃশ্যকাব্যের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছেন নাট্যকার রুমা মোদক। আর তা মঞ্চে সঞ্চালন করেছেন নির্দেশক ফজলুর রহমান পলাশ। সাহিত্যে এই রূপান্তর নতুন কিছু নয়। অনেক কবিতার অন্তর্গত ভাব এর নির্ভরতায় নির্মিত হয়েছে সফল নাটক, চলচ্চিত্র। তবে গ্রাফিতির প্রাণ এই প্রথম অবলোকন। জীবন সংকেত নাট্যগোষ্ঠী যে সুবোধের উপস্থাপন করেছে তাও পুরোপুরি গ্রাফিতির সুবোধ নয়। সুবোধকে এমনরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে- যা কোন বির্তকের জন্ম যেন না দেয়। গ্রাফিতির সুবোধকে নিয়ে নানা পর্যায়ে যে বিতর্ক হয়েছে সে বির্তকে তারা পড়তে চাননি। বলা যেতে পারে সুবোধের এই উপস্থাপন তাকে অসাধু তৎপরতার কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিয়ে তার নাগরিক আর্তনাদ এর প্রকৃত রূপটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।
যুদ্ধ এবং শান্তির মাঝামাঝি অবস্থান করতে গিয়ে এই সুবোধ কখনও কখনও হয়ে উঠেছে সাধারণ উপমহাদেশীয় নায়ক। তবু দেয়াল থেকে মঞ্চে আসা গ্রাফিতির সুবোধ একটি নতুন সম্ভাবনা। নাগরিক দৌড়ে ব্যাবস্থাপনার ফাঁদে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে সুবোধ রাজনীতি প্রপঞ্চটিরও প্রতীক হয়ে উঠেছে । চরিত্র বৈশিষ্ট্যে সুবোধের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে অনন্য হয়ে উঠবার। আমাদের সাহিত্যের কিছু অনন্য চরিত্রের উদাহরণ দেয়া যাক- নুরলদীন, সিরাজউদ্দৌলা, হিমু, বাকের ভাই, মাসুদ রানা। এই চরিত্রগুলোর ব্যাখ্যা দিতে হয় না। তারা তাদের স্বীয় অস্তিত্বে গেঁথে আছে বাঙালি দর্শকের মনস্তত্বে। গ্রাফিতির সুবোধের একটা স্বকীয়তা আছে। রুমা মোদকের পান্ডুলিপিতেও পরিমার্জিত সুবোধের মাঝেও আছে সেই সম্ভাবনা। মঞ্চসজ্জার বিন্যাসেও দর্শক সেই সম্ভাবনা দেখেছে। মঞ্চে ঝোলানো বা প্ল্যাটফর্মের উপর আঁকা গ্রাফিতি। এমনকি প্রারম্ভিকতায় নাট্যকার এর পোশাক এক বিবর্ণ সময়ের ‘সুবোধ’কে পরিবহন করে। কিন্তু রঙিন পোশাকে সুবোধের আগমণ তার ধারাবাহিকতায় এক অদৃশ্য ছেদ তৈরি করে। গ্রাফিতির সুবোধের হাতের বাক্সবন্দি সূর্যের রঙের সাথে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছে সুবোধের পোশাকের রঙ। সে রঙ কি সুবোধের? নাকি তার বিবেকের? যার অস্তিত্ব নেই প্রতিকূল সময়ে। তাই সুবোধকে মনে হয়- সাদাকালো বা ধূসরতায় বেশী মানাবে।
গতানুগতিক মঞ্চাভিনয়ের ধারাতেই নির্মিত হয়েছে সুবোধ এর চরিত্র। অভিনেতা অনিরুদ্ধ ধর অনেক কষ্টসাধ্য অভিনয় করেছেন সন্দেহ নেই- তদুপরি আলাদা করে নির্মাণ করা যায়নি একজন অনন্য ‘সুবোধ’কে। যে ঢঙে সুবোধকে নির্দেশক উপস্থাপন করেছেন সে ঢঙে এর আগেও আমরা অনেক চরিত্রকেই মঞ্চে কথা বলতে দেখেছি। থিয়েটার মানেই আবৃত্তির ধারায় লম্বা সংলাপ উপস্থাপনের যে প্রচলন তার বাইরে এসে নির্মাণ করা যেতে পারে সুবোধকে। থিয়েটারের অন্যান্য অনুষঙ্গও কাজে লাগানো যায় খুব লাগসইভাবে। সমকালীন নাগরিক আচরণ এর পর্যবেক্ষণ, কল্পনা এবং চরিত্রায়নে তা সঠিক মাত্রায় প্রয়োগেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠবে চরিত্রটি। বাংলা নাট্য আন্দোলনের স্বার্থে খুব বেশি প্রয়োজন সুবোধ এর প্রতিষ্ঠা। যে সম্ভাবনা বিদ্যমান ‘ন বৃত্তীয়’র প্রতিটি বাঁকে, সুবোধের প্রতিটি সংলাপে। পরিপূর্ণ যত্নে সুবোধ হয়ে উঠতে পারে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে প্রজ্জ্বল্যমান।
গ্রাফিতির সুবোধ যেমন দেয়াল থেকে উঠে এসেছে দৃশ্যকাব্যে তেমনি সে ছড়িয়ে পড়তে পারে কবিতার ছন্দে, গানের সুরে, চলচ্চিত্রের শটে, শিল্পের নানা মাধ্যমে নানা ভাষায়। হতে পারে তার সিরিয়াল কিংবা সিকুয়্যাল । সুবোধ হতে পারে আগামীর অনন্য নায়ক। গতানুগতিক চরিত্রের মাঝে গ্রাফিতির সুবোধের সেই সম্ভাবনাটি জীবন সংকেত নাট্যগোষ্ঠীই সৃষ্টি করলেন। তার আগামীর সফলতাও তাদের হাতেই। বাংলাদেশের নাট্যচর্চার একটি বড় সংকট বিদেশী অনুবাদ নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে সুবোধ আর ‘ন বৃত্তীয়’ নাট্য আন্দোলনে দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি।

x