জীবন ও প্রকৃতির অবিচ্ছিন্ন সত্তা নদী

ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী

মঙ্গলবার , ১৪ মে, ২০১৯ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ
103

বিস্তৃত অববাহিকা ও জীবন্ত বদ্বীপের দেশ বাংলাদেশ। নদী এর ইতিহাস, নদী-এর ঐতিহ্য, নদী-এর সাংস্কৃতিক, সামাজিক অলংকার। বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত নদীসমূহ এদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অহংকারের সচল ধারা। এদেশের নদীসমূহ লোকগাথা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আঞ্চলিকতা ছাপিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে মেলে ধরেছে ঐতিহ্যকে। নদীর অবস্থান, আচরণ, বিস্তৃতি, প্রথাগত ঐতিহ্য তাই এদেশকে শুধু নদীমাতৃক দেশে রূপান্তরিত করেনি, দিয়েছে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে সমৃদ্ধি। হাজার বছরের বাঙালিয়ানার শিকড় এভাবেই প্রোথিত হয়েছে গভীরে, সীমাহীন অতলে।
বাংলাদেশ সাংস্কৃতিকভাবে, সামাজিকভাবে, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের নিরিখে যে ঐতিহ্য ধারণ, লালন ও চর্চা করে, অন্যান্য প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে নদী এর সিংহভাগজুড়ে অবস্থান করে। নদী তাই আমাদের ঐতিহ্যের, অস্তিত্বের অংশীদার। নদীকেন্দ্রিক শহর, নগর, বন্দর, গঞ্জ এদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, সামাজিকতা, সংস্কৃতি ও সংহতিকে সুদূঢ় ও বিস্তৃত করেছে। জীব বাস্তুতান্ত্রিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে।
বাঙালির যা ঐতিহ্য যা ইতিহাস তার সবকিছুতেই নদীর মিশ্রণ, নদীর আশ্রয়, নদীর প্রশ্রয়। পল্লীগীতি, জারি, সারি, ভাটিয়ালী প্রভৃতিতে নদী বিমূর্ত, নদী জীবন্ত, নদী উপাখ্যান। নদীর জলে অবগাহন, নদীর জলে পরিশুদ্ধি, নদীর জলে চাষবাস, ভূমি উর্বরা, পলিপতন, ভূমির পুষ্টি-বৃদ্ধি যোগাযোগ, যুগে যুগে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়েছে। নদী দিয়েছে আমরা নিয়েছি, শুধু নিয়েছি। এভাবে নদী অসুস্থ হয়ে বিলীন হয়েছে। আমরা থেমে থাকিনি। আমাদের অভাব পূরণ হয়নি। আমাদের সীমাহীন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নদী অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। আমরা তবুও থামিনি। বেদনায়, তাড়নায়, বিসর্জনে, বিপদে, নদী আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়েছে। পানিতে ভাসা, সাগর থেকে জাগা অবিরাম বৃষ্টিপাতের দেশ বাংলাদেশ। উজান থেকে বয়ে আসা পলি মাটির দেশ বাংলাদেশ। পৃথিবীর সুবিশাল উর্বরতম ভূমির দেশ বাঙালির বাংলাদেশ। সমতল পলিসমৃদ্ধ মাটির বুক চিরে সোহাগে বয়ে যাওয়া মায়াবী নদীর দেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। বাঙালির চোখের জল, বাঙলার নদীর জলের সাথে একাকার হয়ে জীবনের সাথে প্রকৃতির মহামিলন ঘটায় এই বাংলাদেশে। হাজার বছরের বাঙালির জীবন কেটে গেছে নদীর জল, চোখের জল, সুখ আর দুঃখের জলে অবগাহন করে। নদী ও নারী, নদী ও জীবন, নদী ও সংস্কৃতি তাই অবিচ্ছেদ্য, অবিভাজিত, পুরিপূরক। বৈচিত্র্যময় নামের ব্যঞ্জনা, ঐতিহ্যময় প্রবাহের রসময়তা বাংলাদেশের নদীকে জীবনমুখী করেছে। জীবনধর্মী করেছে এর প্রতিবেশ পরিবেশ ও বাস্তুতান্ত্রিকতাকে। বিল-জলাভূমি, হাওড়-বাওড়, নদী ও মোহনা, সবেতেই বাঙালির জীবনের ছুঁয়ে যাওয়া পরশ। বাঙালিয়ানার জীবনপ্রবাহ। ঋতুবৈচিত্র্যের সাথে বদলে যাওয়া নদীর রূপ-প্রকৃতি, বাংলাকে, বাংলাদেশকে অভাবিতভাবে যে বৈচিত্র্য দান করে, পৃথিবীতে তার তুলনা মেলে কোথায়?
এভাবে বহুমাত্রিক ঐতিহ্য আমাদের অতীতকে প্রোজ্জ্বল করে রেখেছে। ঐতিহ্যের উজ্জ্বল আলোয় সমৃদ্ধ, অতীতের প্রেরণায়, আমাদের বর্তমান আরও আলোকিত, আরও বিকশিত হতে পারতো। সমৃদ্ধি আমাদের সুউচ্চ শিখরে নিয়ে অফুরন্ত আলোক ছড়াতে পারতো অনন্তকাল। আমাদের আলোয় আলোকিত হতো সমসাময়িক ভুবন। কিন্তু তা হয়নি কার্যত, কারণ ঐতিহ্য ও অহংকারে অনুষঙ্গের অনেকগুলোর অধোগতির সাথে নদী ঐতিহ্যকেও আমরা নির্মূল করতে উদ্যত। পদ্মা, যমুনা, কর্ণফুলী, হালদা, ব্রহ্মপুত্রের মতো আন্তর্জাতিক নদ-নদী এখন বহুমাত্রিক নির্যাতনের শিকার। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নদ-নদীগুলো সীমাহীন আগ্রাসনের শিকার। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নদ-নদীগুলোর শাখানদীসমূহ সঙ্গত কারণেই প্রবাহ সংকটে। নাব্যতা হারিয়ে অনেক নদীই মৃত্যুর ক্ষণ গুণছে। এরা এখন মুমূর্ষু।
অপরিকল্পনা, অপকর্ম, অবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অসঙ্গত কর্মযজ্ঞ, অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন বিলাস আমাদের দেশীয় নদীসমূহকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। বিপদাপন্ন, মহাবিপদাপন্ন, অথবা বিলুপ্তির পথে অনেক নদী। ক্রমে দুর্দশাগ্রস্ত নদীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদী বা মুক্ত জলাশয়ের উপর অত্যাচার, অবিচার নদীর সংকটপন্নতা বা বিপন্নতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাড়িয়ে দিচ্ছে পরিবেশ বিপর্র্যয়কে। এভাবে অরক্ষিত নদ-নদী অরক্ষিত করে ফেলছে পরিবেশ ও প্রতিবেশ এবং জীব বাস্তুতান্ত্রিকতাকে।
দক্ষিণের চিত্রা, কীর্তনখোলা অথবা কপোতাক্ষ, উত্তরের করতোয়া, তিস্তা অথবা সুরমা, ব্রহ্মপুত্র, আর রূপসা-ভৈরব, কংস, সুমেশ্বরী নিজেদের বিপন্নতাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে জানান দিচ্ছে সারা বছর। দখলদার ও ভূমিদস্যুদের দুর্দমনীয় প্রতাপে বিলীন হওয়ার পথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় শ’খানেক নদ-নদী। পাবনার ইছামতি, কিশোরগঞ্জের নরসুন্দর, বগুড়ার করতোয়া, শাহজাদপুরের বড়াল ও ছোট করতোয়া, নাটোরের নারোদ নদ, তাড়াশের বেহুলা, গাইবান্ধার ঘাঘট, রংপুরের শ্যামাসুন্দরী নদ, নেত্রকোণার সুমেশ্বরী, কুমিল্লার গোমতী, জামালপুরের ব্রহ্মপুত্র নদ বিলুপ্তির বিহ্বলতায় বিদিশাগ্রস্ত । মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে এসব নদনদী ভরাট, দখল, দূষণ ও নানাবিধ দানবীয় অমানবীয় অত্যাচারের শিকার। নদীর পরিচর্যা কোন দিন আমরা করিনি। গতি পরিবর্তন, গতিরোধ, প্রবাহ বাধাগ্রস্ত, প্রবাহ বন্ধ, পানি প্রত্যাহার, বাঁধ নির্মাণ করে নদীর গতিকে রোধ করেছি, প্রবাহকে বন্ধ করেছি। নদীকে নদীর হয়ে, নদীর কাছে, নদীরূপে থাকতে দিইনি। আন্ত: ও আন্তর্জাতিকভাবে নদীকে আমরা হত্যা করেছি। সভ্যতা ভেদ করে আমরা উত্থিত হয়েছি, নদী হন্তা হিসেবে।
আমরা নদীকে মেরেছি অথবা মারতে চেষ্টা করেছি রাসায়নিকভাবে, শিল্পবর্জ্য দূষণে, জঞ্জাল প্রভৃতি দিয়ে ভরাট করে। আমরা নদীকে মারতে চেষ্টা করেছি নদীর জীব-বাস্তুতান্ত্রিকতাকে নিশ্চিহ্ন করে। আমরা নদীকে মারতে সচেষ্ট তার প্রাকৃতিক পানি প্রবাহকে রোধ, প্রত্যাহার, বাধাগ্রস্ত করে, নদীর নাব্যতাকে নষ্ট করে। কোন প্রক্রিয়াই আমরা অবশেষ রাখছি না নদী হত্যার। নদীর উপর স্থাপনা গেড়ে, বাঁধ নির্মাণ করে, রাবার ডেম নামের তথাকথিত প্রতিরোধ প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে নদীকে আমরা প্রাকৃতিক থাকতে দিচ্ছি না। বর্তমান প্রেক্ষিতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক নদীতে রাবার ডেম নির্মাণ অধিক উৎপাদনের নামে একটি অদ্ভুত জনপ্রিয় প্রক্রিয়ার নাম। নদী হত্যার এ এক বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রক্রিয়া। নিকট অতীতে কার্প জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাছের প্রাকৃতিক একমাত্র প্রজননকেন্দ্র চট্টগ্রামের হালদা নদীটির পানি প্রবাহকে রাবার ডেমের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। দেশের ঐতিহ্যবাহী এ নদীটির ভবিষ্যৎ সংকটাপন্ন করে ফেলা হচ্ছে। উপরের প্রবাহের পলি পতন, সাগর থেকে উঠে আসা লবণাক্ততা- এ দুয়ের প্রাকৃতিক আগ্রাসনকে উস্কে দিচ্ছে জনপদ-জনগণের শিল্প বর্জ্য দূষণ ও দখলসহ বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞ। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, নাফ থেকে মহানন্দা, অথবা হারিয়াভাঙা থেকে সুরমা কোন নদীই আজ সুরক্ষিত নয়। কোন না কোনভাবে আগ্রাসিত, আচ্ছাদিত, আস্ফালনের চরম শিকারে পরিণত হয়েছে। অত্যাচারিত এসব নদীকে জাতীয়ভাবে নির্যাতনের রাহু থেকে মুক্ত করতে হবে। বহুতান্ত্রিক, বহুমাত্রিক নির্যাতন বৈচিত্র্য থেকে নদীকে মুক্ত করতে হবে।
বিশ্বের দৃশ্যমান উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনে জীববাস্তুতান্ত্রিক বিপন্নতার সংকট আমাদের শংকিত করেনি। বিবেক আমাদের তাড়িত হয়নি। সভ্যতা আমাদের সঠিক মাত্রায় সভ্য করেনি। যেমন শিক্ষা আমাদের শিক্ষিত করেনি। পরিবেশ ভাবনা আমাদের ভাবিত করেনি। সংকটের আবর্তে বাস করেও আমরা নিজেদের শংকিত মনে করছিনা। উদাসীনতা ও কেন্দ্রাভিমুখিনতা আমাদের বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে।
আমাদের অপরাধ আছে, বোধ নেই। বিবেক আছে, তাড়না নেই। দৃষ্টি আছে, দর্শন নেই। মন আছে, মননশীলতা নেই। পঁচিশ হাজার কিলোমিটারের জলপথের নাব্যতা নিশ্চিহ্ন করে আমরা তাকে সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারে এনে দাঁড় করিয়েছি। তবুও আমাদের শোধ নেই, বোধ নেই। রাজধানীর বুকে বুড়িগঙ্গার বীভৎস রূপ দর্শন করেও উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আমাদের রক্ত চাপকে বাড়িয়ে দেয়নি। তুরাগকে দখলের- দূষণের, চূড়ান্ত মুক্তি আমরা এখনো দিতে পারিনি। কর্ণফুলীর দুই তীরের দখল মুক্তি সুদূর পরাহতই মনে হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়াই শিল্প বিলাশতো আছেই। আমাদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা সভ্যতার আভরণে ঢাকা পড়ে আছে।
ড্রেজিং দিয়ে উপরন্তু আমরা এর দূষণ ও দখলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছি। এভাবে সারা দেশের অনেক নদ-নদীকে আমরা মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছি ধারাবাহিকভাবে, বিচ্ছিন্নভাবে, বিভিন্নভাবে। মুক্ত জলাশয় ও নদীকে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবার নৈতিক অবস্থা আমাদের নেই। তবুও অপরাধবোধ এবং কৃতকর্ম যদি আমাদের সচেতন হতে সুযোগ করে দেয়, তবে তার প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ থাকা উচিত। এসব কারণে আমরা ইতিমধ্যেই দেশ থেকে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী হারিয়েছি।
নদী আমাদের অস্তিত্বের অংশ, নদী আমাদের নান্দনিকতার উৎস। নদী দখল করে, নদী হত্যা করে আমরা সভ্যতা ও সংস্কৃতির সচল ধারাকে অবলুপ্ত করতে চাই না। সভ্যতা প্রবহমান, সংস্কৃতি চলমান ধারায় পরিবর্তনের অগ্রদূত। নদী সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রধানতম ধারক ও বাহক। নদীকেন্দ্রিক জীবন প্রবাহের এ ধারাকে সজীব ও জীবননির্ভর করতে হবে। জীবনের বাঁক ও বোধগুলোকে নদীর নিরচ্ছিন্ন প্রবাহের সাথে মিলিয়ে জীবনকে প্রকৃতি ও জীবনসম্পৃক্ত রাখতে হবে। জীবনের দুঃখ বেদনা, ভাঙাগড়ার মতো নদীর ভাঙা গড়া ও নিরবচ্ছিন্নতাকে জীবনের পরিবর্তনশীল প্রত্যয়ের অনুষঙ্গ করে নদী ও জীবনকে একাকার করে দেখাই আমাদের প্রতিশ্রুতি হওয়া দরকার। আসুন, আমরা নিজেকে নিঃশর্তভাবে নদীর কাছে নিয়ে যাই। নদীকে নদীর মতো করে, নদী ভেবে নদীর কাছে ফিরিয়ে দিই। নদী প্রকৃতি ও জীবন এবং জীববাস্তুতান্ত্রিক পরিবেশের অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ। একে অনন্য রাখি আজ ও আগামীর জন্য।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, পরিবেশ কর্মী

x