জীবনটা যার এক তারাতে বাঁধা ছিল দিনে রাতে

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:২৫ পূর্বাহ্ণ
25

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের বেদনা ভরা দিনটিতে চলে গেলেন এদেশের আরেকজন বুদ্ধিজীবী আমজাদ হোসেন। প্রবল আধিপত্য ও প্রতিপত্তি নিয়ে কয়েক যুগ ধরে যিনি এদেশের চলচ্চিত্রে, টেলিভিশনে, সাহিত্যে প্রতাপের সঙ্গে কাজ করে গেছেন। একাধারে যিনি শিশু সাহিত্যিক, কবি, কথা সাহিত্যিক, গীতিকার, চিত্র নাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা, পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা। সব ক্ষেত্রে সফল হলেও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেই অগ্রগণ্য থেকেছেন তিনি।
চলচ্চিত্রে তাঁর গুরু জহির রায়হান। গুরুর ঘরানাকে বরাবর অনুসরণ করে গেছেন আমজাদ হোসেন। তাঁর পরিচালিত ছবিগুলো যেমন শিল্প মানসম্পন্ন হতো তেমনি সক্ষম হতো দর্শক সাধারণের তৃপ্তি মেটাতেও। মূলতঃ মূলধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা হলেও তাঁর অনেকগুলো ছবিতে চলচ্চিত্রের ভাষার চমৎকার নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেছে। যেমন নয়নমনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই ও জন্ম থেকে জ্বলছি। গুরুর আরো একটি নিয়ম তিনি মানার চেষ্টা করেছেন। নির্দিষ্ট একটি দল তৈরি করে তারই সমবায়ে ছবি তৈরি করা। আমজাদ হোসেনেরও তেমনি ছিলেন নির্দিষ্ট অভিনয় শিল্পী ও কলাকুশলী। এটা বিশ্বের বড় বড় সব চলচ্চিত্রকারদের বেলাতে দেখা যায়। এর ফলে সামগ্রিক বোঝাপড়া খুব সংহত হয়। সিনেমা ডিরেক্টরস মিডিয়া এটা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি সিনেমা একটা টিমওয়ার্ক। কাজেই টিমের সকলের মধ্যে অবশ্যই পারস্পরিক বোঝাপড়াটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
জহির রায়হান নিজে মোট করেছেন আটটি ছবি। আর মূলধারার জন্যে তিনি করেছেন আরো প্রায় তিরিশটি ছবি তাঁর সহকারীদের দিয়ে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সময় ছিল দশ বছরের কম। গড়ে তুলেছিলেন ফিল্ম কো অপারেটিভ- সিনে ওয়ার্কশপ, যার অন্যতম কাণ্ডারী ছিলেন আমজাদ হোসেন। আমজাদ হোসেনের নিজের মধ্যে বহুমুখী প্রতিভা ছিল। তাঁর এই বহুমুখী প্রতিভার বিকাশে তিনি সাথে পেয়েছিলেন ভার্সেটাইল জিনিয়াস জহির রায়হানকে, যিনি একাধারে তাঁর গুরু ও বন্ধু।
জহির রায়হানের সবগুলো ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব ছিল সঙ্গীত। প্রতিটি ছবির গান বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সঙ্গীতের অমর দৃষ্টান্ত, কি বাণীতে কি সুরে। আমজাদ হোসেনও গুরুর দেখানো পথে হেঁটেছেন। তবে তাঁর বেলায় একটু পার্থক্য রয়েছে। আমজাদ হোসেনের ছবির গান তাঁর নিজের লেখা। সুরকার হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন আলতাফ মাহমুদ, আনোয়ার উদ্দিন খান, সত্য সাহা, সুবল দাস এবং আলাউদ্দিন আলীকে। আলাউদ্দিন আলীর সঙ্গেই তাঁর বোঝাপড়া খুব নিবিড় ছিল। গোলাপী এখন ট্রেনে থেকে শেষ পর্যন্ত আলাউদ্দিন আলীই ছিলেন আমজাদ হোসেনের সব ছবির সঙ্গীত পরিচালক। অসাধারণ কিছু চলচ্চিত্র গীতি উপহার দিয়েছেন এই জুটি। বিশেষ করে গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই ও জন্ম থেকে জ্বলছি ছবির গানগুলো স্মরণীয়। নয়নমনি ছবিতে জারি, সারি, পুঁথিপালা ও বাংলার বিভিন্ন লোক সুরের চমৎকার প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন সত্য সাহা আমজাদ হোসেনের লেখা কথায়। বিশেষ করে সৈয়দ আবদুল হাদী ও চিত্রা সুলতানার কণ্ঠে ‘অনাথিনীর বুকের মানিক বল্‌্‌ আমারে বল্‌্‌ রে’- এই লোকগীতিতে উত্তরবঙ্গের গম্ভীরা গানের আঙ্গিকের প্রয়োগ অসাধারণ। গীতিকার আমজাদ হোসেনের ক্যারিয়ার অনেক দীর্ঘ। ১৯৬৩ সালে সালাউদ্দিন পরিচালিত ধারাপাত ছবিতে ইসমত আরার কণ্ঠে ‘এত কাছে আর কেউ কভু আসেনি’ তাঁর লেখা প্রথম গান। আমজাদ হোসেনের লেখা গানের বিশেষত্ব, শব্দচয়ন এবং অন্তমিল ও অনুপ্রাস সৃষ্টিতে গভীরতা ও সহজিয়ানা। যার ফলে তাঁর লেখা গান ব্যতিক্রমধর্মী হয়ে উঠত। এটা তিনি পেয়েছিলেন তাঁর সহজাত কাব্যবোধ থেকে। তরুণ বয়সে ছড়া ও কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে তার লেখক জীবনের শুরু।
ঔপন্যাসিক ও গল্পকার হিসেবেও সফলতা পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর নির্মিত সবগুলো ছবি ছাড়াও সিনে ওয়ার্কশপের অনেক ছবির কাহিনী তাঁরই রচনা। নিজের লেখা উপন্যাস নিরক্ষর স্বর্গে ও দ্রৌপদী এখন ট্রেনে অবলম্বনে নির্মাণ করেছিলেন নয়নমনি ও গোলাপী এখন ট্রেনে। খান আতাউর রহমান পরিচালিত আবার তোরা মানুষ হ ছবির কাহিনী ও সংলাপ তাঁর লেখা। তেমনি তৌকির আহমেদ তাঁর জয়যাত্রা ছবিটি নির্মাণ করেছেন আমজাদ হোসেনের উপন্যাস অবেলায় অসময় অবলম্বনে। জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়ার কাহিনী বিন্যাস ও সংলাপ আমজাদ হোসেনের। জহির রায়হান পরিচালিত বেহুলা, আনোয়ারা সহ তাঁর প্রযোজিত প্রায় সব ছবির সংলাপও আমজাদ হোসেনের লেখা। এক্ষেত্রে তাঁর সহজাত দক্ষতা ছিল সাহিত্যগুণের কারণে। তরুণ বয়সে ১৯৫০ এর দশকে তাঁর রচিত গল্প প্রকাশিত হয় সাগরময় ঘোষ সম্পাদিত দেশ পত্রিকায়। তখন তিনি জামালপুরে। সাগরময় ঘোষ তাঁকে ডেকেও ছিলেন কলকাতায়। ঢাকায় চলে আসার কারণে ওমুখো হওয়া সম্ভব হয় নি। শিশু সাহিত্য রচনাতেও তিনি সাফল্য দেখিয়েছেন। এ শাখায় তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কয়েকটি উপন্যাস ও ১৯টি ছোট গল্প লিখেছেন তিনি। অসুস্থ অবস্থাতেও লিখছিলেন উপন্যাস ‘উঠান’ যেটি অসমাপ্ত রয়ে গেল।
টেলিভিশনে ঈদের নাটক রচনার সূচনাও আমজাদ হোসেনের হাতে। বিটিভির প্রযোজক (পরবর্তীকালে মহাব্যবস্থাপক) মুস্তাফিজুর রহমানের জোরাজুরিতে ১৯৭৪ সালের ঈদে তাঁর প্রথম নাটক লেখা টেলিভিশনের জন্যে জব্বার আলী সিরিজের এই নাটকগুলো পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এতোই দর্শকনন্দিত হয়ে উঠেছিল যে, নাটকগুলো ছাড়া দুই ঈদের বিনোদনই যেন অপূর্ণ থেকে যেত। আমাদের সামাজিক নানান দুর্নীতি, অনিয়ম, অসঙ্গতি তিনি হাস্য কৌতুকের ছলে সিরিওকমিক ধাঁচে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করতেন এই সিরিজ নাটকগুলোতে।
১৯৫০-এর দশকের শেষদিকে আমজাদ হোসেন জামালপুর থেকে ঢাকায় আসেন রীতিমত তরুণ বয়সে। ঢাকায় এসে তিনি সাহিত্য ও নাট্যচর্চায় জড়িয়ে যান। ক্রমশ সংযুক্ত হন চলচ্চিত্রে। অভিনেতা হিসেবে তিনি কাজ শুরু করেন মুস্তাফিজ পরিচালিত হারানো দিন ছবিতে। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৬১ সালে। একই বছর মুক্তি পায় তাঁর দ্বিতীয় ছবি মহিউদ্দীন পরিচালিত তোমার আমার। এ সময় তিনি জহির রায়হানের সান্নিধ্যে আসেন। তাঁর সহকারী হিসেবে পরিচালনায় হাতেখড়ি এই সময়েই। তবে কৌতুকাভিনেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতির শুরু ১৯৬৩ সালে সালাউদ্দিন পরিচালিত ধারাপাত ছবি থেকে। জহির রায়হানের ছবিগুলোতেও তিনি এই ধারার অভিনয় করেছেন। টেলিভিশনের জব্বার আলী সিরিজে তাঁর অভিনীত চরিত্রটিও ছিল এই ধাঁচের। স্বাধীনতার পূর্বে তাঁর পরিচালিত ছবিগুলোতেও তিনি এ ধরনের চরিত্রে সাবলীলভাবে অভিনয় করে গেছেন। চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তাঁর প্রথম অভিনয় জীবন থেকে নেয়ার মধু চরিত্রে। এরপর বিভিন্ন ছবি ও নাটকে তাঁর প্রাণবন্ত অভিনয়ের উপহার দর্শকেরা পেয়ে গেছেন।
১৯৬৭ সালে জহির রায়হানের ছত্রছায়ায় আমজাদ হোসেন প্রথম চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসেন। নুরুল হক বাচ্চুর সঙ্গে যুগ্মভাবে তিনি পরিচালনা করেন আগুন নিয়ে খেলা। একই সালে তিনি এককভাবে নির্মাণ করেন দ্বিতীয় ছবি জুলেখা। ১৯৬৮ সালে আবার যৌথভাবে দুই ভাই ও সংসার, এককভাবে বাল্যবন্ধু। সবগুলো ছবি জহির রায়হানের নেতৃত্বে সিনেওয়ার্কশপ থেকে নির্মিত। সম্পূর্ণ এককভাবে আমজাদ হোসেন প্রথম ছবিটি নির্মাণ করেন ১৯৭৬ সালে, নয়নমনি। এ ছবির অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তবে ১৯৮০ দশকের শেষ দিকে তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণ অনেকটাই ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। আগুনে তাঁতানো সেই আমজাদকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না তেমন। এ সময় থেকে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণও কমিয়ে দেন।
তাঁর ভাষায় আর্থিক সঙ্গতি তৈরির জন্যে তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনায় আসেন ১৯৭৬ সালে নয়নমনি প্রযোজনার মধ্যে দিয়ে। এক্ষেত্রেও তিনি সফল পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পী জন্মেছিলেন ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট জামালপুরে। গুণের স্বীকৃতি পেয়েছেন বার বার নানাভাবে। ১২ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন নানা শাখায়। পুরস্কৃত হয়েছেন শিশু সাহিত্যের জন্যে। পেয়েছেন একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক ও বাংলা একাডেমী পুরস্কার। বেসরকারি পর্যায়েও পেয়েছেন অসংখ্য পদক পুরস্কার। সবচেয়ে বড় পুরস্কার- এদেশের জনগণের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা পেয়েছেন দু’হাত ভরে। ২০১৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবসে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রয়াত হয়েছেন এ শিল্পী। রাষ্ট্র তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল এটাও একজন শিল্পীর জন্যে বড় সম্মান, বড় প্রাপ্তি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে, সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাসে ও আগামী দিনগুলোতে আমজাদ হোসেনের নাম অবশ্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

x