জিহ্বার আলসার নিরাময়ে

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ৭ জুলাই, ২০১৮ at ৯:৫৫ পূর্বাহ্ণ
178

জিহ্বার আলসার বা ঘা একটি বিড়ম্বনাকর অনুভূতি। জিহ্বার আলসারের কারণে একদিকে যেমন খাদ্যদ্রব্য গ্রহণে সমস্যা হয়, অন্য দিকে রোগী মানসিকভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

জিহ্বার আলসার কি : সাধারণত প্রথমে জিহ্বায় প্রদাহ ভাব দেখা দেয় তারপর ফুসকুড়ির মত সৃষ্টি হয়ে তাতে পুঁজ সঞ্চয় হয় এবং ধীরে ধীরে ক্ষত হয়ে চারিদিকে বিস্তার লাভ করে। এই ক্ষত গভীর গর্তের মতো দেখায় এবং পুঁজ জমে থাকে। ইহা ধীরে ধীরে ভয়ংকর রূপ লাভ করে। এই ক্ষত দীর্ঘদিন থাকলে আলসার সৃষ্টি হতে পারে।

জিহ্বার আলসারের কারণ : যে সব কারণে জিহ্বায় আলসার বা ঘা দেখা দিতে পারে সেগুলো হলো

* জিহ্বার আঘাত : জিহ্বায় আঘাতজনিত কারণে সাধারণত আলসার দেখা দিতে পারে। এছাড়া ধারণা করা হয় আঘাতজনিত কারণে জিহ্বায় ইওসিনোফিলিক আলসার দেখা দিতে পারে। এ জাতীয় আলসার খুব দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করে। এ সময় রোগী খুব অস্বস্তিতে ভুগে থাকে। রোগের লক্ষণ অনুযায়ী জিহ্বার এ জাতীয় আলসারের চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

* হারপিস ভাইরাস সংক্রমণ।

* রক্ত শূন্যতার কারণে আমাদের দেশে বিশেষ করে গর্ভবতী এবং মাতৃদুগ্ধদানকারী মায়েদের জিহ্বায় আলসার দেখা দেয়।

* ধারাল দাঁতের কারণে।

* জিহ্বার স্নায়ু কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গেলে যেমন ওরাল সার্জারির সময় অথবা ডেন্টাল ইনজেকশন দেয়ার সময়।

* ক্যানডিডা সংক্রমণের কারণে জিহ্বায় সাদা বা লাল ক্ষত হতে পারে।

* টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ এবং চুইংগাম এলার্জির কারণে জিহ্বায় আলসার দেখা দিতে পারে।

* অতিরিক্ত মসল্লা জাতীয় খাবার গ্রহণ করলে।

* এলকোহল সেবন এবং ধূমপান।

* যদি পাকস্থলিতে আলসার থাকে তবে সেক্ষেত্রে জিহ্বায় আলসার ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে।

* হজমের সমস্যার কারণে।

* এন্টিবায়োটিক সেবনের কারণে

* নিউরালজিয়া

* কৃত্রিম ডেনচার ঠিকভাবে সংযোজন করা না হলে।

* লাইকেন প্ল্যানাস।

* ওরাল লাইকেনয়েড লিশন।

জিহ্বার আলসারের শ্রেণী বিভাগ : জিহ্বার উপর নানা প্রকারের ক্ষত হয়। যথা. সাধারণ আলসার ২. সিফিলিটিক ৩. ম্যালিগন্যান্ট ৪. টিউবার কিউলার। এই চার শ্রেণিতে বিভক্ত করা যেতে পারে।

. সাধারণ আলসার : এই জাতীয় ক্ষত সাধারণতঃ হজম শক্তির গোলযোগের জন্য হয়ে থাকে এবং জিহ্বার ডগায় হয়ে থাকে। জিহ্বার নানা স্থানে এই ঘা সৃষ্টি হয়। দাঁতে পোকা হলে তার জন্যও ইহা হতে পারে। ইহা জিহ্বার দু’পার্শ্বে হয়। অনেক সময় শিশুরা দীর্ঘদিন পর্যন্ত উদরাময় রোগে ভুগলে এই ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে।

. সিফিলিটিক আলসার : উপদংশ রোগজনিত কারণে বা পারদ সেবনজনিত কারণে এই জাতীয় ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে। এই ক্ষত কখনো কখনো ভাসা আবার কখনো গভীর হতে পারে। ভাসা জাতীয় ক্ষত উপদংশ রোগে আক্রান্ত হবার প্রথম অবস্থায় প্রকাশ পায় এবং জিহ্বার দুই পার্শ্বে হয়। ইহা ছাড়া ঠোঁটে, গলার ভিতর, গলার অভ্যন্তরভাগে এবং মাড়িতে ঘা হয়। ঘায়ের আকৃতি অনেকটা পার্শ্বে সূচাল এবং চারিপার্শ্বে লাল বর্ণ তৎসহ জ্বালা যন্ত্রণাকর বেদনা। গভীর ক্ষত উপদংশ রোগের শেষাবস্থায় প্রকাশ পায় এবং জিহ্বার মধ্যস্থলে হয়। ইহার আকার অনেকটা গভীর গর্তের মত।

. ম্যালিগ্‌ন্যান্ট আলসার : ক্যানসার জনিত জিহ্বাক্ষত প্রধানতঃ জিহ্বার পার্শ্বদেশে আত্মপ্রকাশ করে। এটি অতিশয় কঠিন, উন্নত এবং ইহার প্রান্তভাগ ভিতরের দিকে উল্‌টান মতন দেখায়। ইহার তলভাগ অসমান এবং মাংসকীলকবৎ বোধ হয়। এর আশেপাশের পেশীতন্তু সমূহ কাঠিন্যযুক্ত এবং গ্রন্থিগুলো প্রারম্ভ অবস্থা হতেই আক্রান্ত হয়। ক্যানসারজনিত জিহ্বা ক্ষতে সূচনাবস্থা হতেই জিহ্বা সঞ্চালনে মহাক্লেশ উপস্থিত হয় এবং যন্ত্রণা হতে থাকে। ক্যানসার জনিত জিহ্বা ক্ষত প্রায় ৪০ বৎসরের উর্দ্ধে বয়সে সংঘটিত হয়।

. টিউবার কিউলার আলসার : গুটিকারোগজনিত ক্ষত বড় একটা দেখা যায় না। এই প্রকার ক্ষতও বাহ্য অর্থাৎ উপর এবং অগভীর হয় এবং ইহার সহিত সচরাচর ফুসফুস ও গলমধ্যে ‘টিউবারকিউলোসিস’ সংক্রমণের ইতিহাস পাওয়া যায়। ইহা হতে হরিদ্রাভবর্ণের আস্রাব নির্গত হয়। আনুবীক্ষণিক পরীক্ষার দ্বারা উক্ত আস্রাব হবে যক্ষ্মাজীবাণু পাওয়া যায়।

রোগ লক্ষণ : জিহ্বার বর্ণ দেখে রোগের প্রকৃতি সম্পর্কে অনেকটা জানা বিশেষ করে আমাশয়, উদরাময় শুষ্কতা, অন্যান্য জ্বরে জিহ্বার আরক্ততা পিত্ত জ্বরে জিহ্বার প্রান্তে ও অগ্রভাগে আরক্ত ভাবের সৃষ্টি হয়, টাইফয়েড জ্বরে জিহ্বা কাঁটা কাঁটা হয়, আরক্ত জ্বরে জিহ্বার উপর লংকা গুড়া ছিটানবৎ দেখায় জ্বরের যখন আরোগ্য হয় তখন জিহ্বা ধীরে ধীরে পরিস্কার হতে থাকে। যদি দেখা যায় যে জিহ্বা ক্রমশঃ কফিন বর্ণ, মলিন এবং শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে তবে বুঝতে হবে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন। ফুসফুসে রক্ত সঞ্চালনের বাধা সৃষ্টি হলে জিহ্বার বর্ণ কালো বা বেগুনি বর্ণ হয়। পান্ডুর বা জন্ডিস রোগে জিহ্বা হরিদ্রা বর্ণ হয়। হজম শক্তির গোলযোগ দেখা দিলে জিহ্বার প্রান্তভাগ লাল বর্ণ এবং মূলদেশ ময়লার প্রলেপযুক্ত হয়। যে কোন অতি তীব্র তরুণ রোগে জিহ্বা কম্পমান হলে সংকটজনকভাবে স্নায়ুবিক, পাকস্থলীর রোগ বা উত্তেজনা বুঝায়। জিহ্বায় ক্ষত হতে দেখা যায় এবং প্রচন্ড বেদনার সৃষ্টি হয়। জিহ্বা হতে সর্বদা লালা ঝরে এবং মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। কোন কিছু খেতে পারে না। জিহ্বা নাড়াচাড়া করলে অসহ্য বেদনা সৃষ্টি হয়। আক্রান্ত স্থানে গভীর গর্তের মত সৃষ্টি হয় উহার মধ্যে পুঁজ দেখা যায়। রোগীর পক্ষে কোন কিছু খাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর হয়। জিহ্বা ফুলে যায় এবং শ্বাসকষ্ট হয়। খেতে না পারার জন্য রোগী দুর্বল হয়ে পড়ে। এই ক্ষত আরোগ্য না হলে ধীরে ধীরে ক্যানসার রূপ লাভ করে এবং মৃত্যু অনিবার্য হয়ে উঠে।

পরিণতি : সাধারণ আলসার সহজেই আরোগ্য হয়। কিন্তু তা ব্যতীত অপর প্রকারের ক্ষত সমূহ আরোগ্য করা দুরুহ। কারণ এই সকল স্থান হতে রক্তস্রাব বা হেমরেজ হবার প্রবণতা থাকে। সিফিলিসের দরুণ ক্ষত কতক পরিমানে সারান যেতে পারে কিন্তু ক্যানসার জণিত ক্ষত সারান প্রায় অসম্ভব।

হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : জিহ্বার আলসারের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। যেসব কারণে জিহ্বায় আলসার হতে পারে তা বর্জন করতে হবে। এই রোগে লক্ষণ ভিত্তিক অনেক ফলদায়ক ওষুধ আছে, যা অন্য প্যাথিতে নেই। নির্দিষ্ট মাত্রায় লক্ষণ সাদৃশ্যে নিম্নলিখিত ওষুধ এই রোগে ব্যবহৃত হয়। যথা. আর্সেনিক, . ল্যাকেসিস, . লাইকোপোডিয়াম, . ক্যালি বাইক্রম, . গ্রাফাইটিস, . মার্কুরিয়াস, . বোরাঙ, . নেট্রাম মিউর, . নাইট্রিক এসিড, ১০. মিউরিয়াটিক এসিড, ১১. পেট্রোলিয়াম, ১২. কোনিয়াম,

১৩. হিপার সালফার, ১৪. সাইলিসিয়া, ১৫. ফাইটোলক্কা, ১৬. সালফারসহ আরো অনেক ওষুধ আছে। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x