জিপিএ-৫ পেয়েও যে কারণে অনিশ্চিত হতে পারে ভর্তি

একাদশে ভর্তি

রতন বড়ুয়া

বৃহস্পতিবার , ১৬ মে, ২০১৯ at ২:৫৫ পূর্বাহ্ণ
316

এসএসসি-তে সর্বোচ্চ জিপিএ পেয়েও ভর্তি অনিশ্চিত হতে পারে জিপিএ-৫ পাওয়াদের। কলেজ ভর্তি নীতিমালায় উল্লেখিত নিয়ম সম্পর্কে অসচেতনতার দরুন এই সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে এসব মেধাবী শিক্ষার্থী। আগে সমান জিপিএ (গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ) পাওয়াদের ক্ষেত্রে মোট জিপি (গ্রেড পয়েন্ট)’র ভিত্তিতে মেধা তালিকা নির্ধারণ করা হলেও ২০১৬ সাল থেকে এ নিয়মে পরিবর্তন এনেছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটি।
ওই বছর (২০১৬) থেকে মোট জিপি (গ্রেড পয়েন্ট)’র স্থলে মোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতেই মেধা তালিকা প্রকাশ করে আসছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটি। যা এবারের (২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে) একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির নীতিমালায়ও বহাল রয়েছে। নীতিমালার মেধামান নির্ধারণ অংশে অনুচ্ছেদ ৩.৩ এর উপ-অনুচ্ছেদ ৩.৩.১ অনুযায়ী- সমান জিপিএ প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে সর্বমোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে মেধাক্রম র্নিধারণ করা হবে মর্মে উল্লেখ করা আছে।
বিষয়টি একটু স্পষ্ট করলে বলা যায়- এবার চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে তিন বিভাগে (বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষায়) জিপিএ-৫ পেয়েছে মোট ৭ হাজার ৩৯৩ জন শিক্ষার্থী। জিপিএ-৫ পাওয়া এই ৭ হাজার ৩৯৩ শিক্ষার্থীকেই একই ক্যাটাগরির আওতায় বিবেচনা করা হবে। মোট প্রাপ্ত পয়েন্টের (গ্রেড পয়েন্ট) স্থলে তাদের প্রাপ্ত মোট নম্বরের ভিত্তিতেই মেধা তালিকা প্রস্তুত ও প্রকাশ করা হবে। সেক্ষেত্রে একটি বা দুটি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ মিস করে জিপিএ-৫ পাওয়া একজন শিক্ষার্থীর মোট প্রাপ্ত নম্বর সবকয়টি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ পাওয়া (গোল্ডেন জিপিএ-৫ বলে প্রচলিত) একজন শিক্ষার্থীর তুলনায় বেশিও হতে পারে। সেক্ষেত্রে সবকয়টি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ না পেয়েও জিপিএ-৫ পাওয়া ওই শিক্ষার্থী মেধা তালিকায় এগিয়ে যেতে পারে। আর সবকয়টি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ পেলেও মোট প্রাপ্ত নম্বর কম হলে ওই শিক্ষার্থী (গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া) মেধা তালিকায় পিছিয়ে থাকবে। অর্থাৎ একটি বা দুটি বিষয়ে এ প্লাস মিস করে জিপিএ-৫ পাওয়া একজন শিক্ষার্থীর মোট প্রাপ্ত নম্বর গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর তুলনায় বেশি হলে সেক্ষেত্রে একটি বা দুটি বিষয়ে এ প্লাস মিস করে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী-ই মেধা তালিকায় এগিয়ে থাকবে। আর সবকয়টি বিষয়ে এ প্লাস পেলেও মোট প্রাপ্ত নম্বর কম হলে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী পিছিয়ে থাকবে।
এদিকে, শিক্ষার্থী-অভিভাবক এমনকি শিক্ষকরাও নীতিমালায় এই নিয়ম সম্পর্কে অবগত নন। ফলে সবকয়টি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ পেয়ে জিপিএ-৫ (গোল্ডেন) পাওয়াদের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী-ই কেবল দুই থেকে তিনটি কলেজকেই পছন্দ দিয়ে আবেদন করছে। সর্বোচ্চ দশটি কলেজ পছন্দ দিয়ে আবেদনের সুযোগ থাকলেও তারা তা করছে না। তাদের বিশ্বাস-যেহেতু সবকয়টি বিষয়ে এ প্লাস সহ (গোল্ডেন) জিপিএ-৫ রয়েছে, সেহেতু এই কয়টি কলেজে আবেদন করলেই যথেষ্ট। এর মধ্য থেকে যে কোন একটিতে অবশ্যই ভর্তির জন্য তারা মনোনীত হবে। অন্যদিকে, একটি বা দুটি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ মিস করে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও ভুল করছে আবেদনে। তারা প্রথম সারির বা পছন্দের শীর্ষে থাকা কলেজগুলোতে আবেদনই করছে না। তাদের ধারণা- শীর্ষস্থানীয় কলেজগুলোতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্তরাই কেবল ভর্তির সুযোগ পাবে। একটি বা দুটি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ মিস করে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ হবে না। তাই এসব কলেজে আবেদন করে লাভ নেই। এতে শীর্ষ স্থানীয় কলেজগুলোর আশা বাদ দিয়ে তুলনামূলক মধ্যম সারির কলেজগুলোতেই আবেদন করছে এসব শিক্ষার্থী। চট্টগ্রামে জিপিএ-৫ পাওয়াদের উভয় ক্যাটাগরির বেশ কয়জন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞানের ছাত্র মাহিন নগরীর একটি বেসরকারি স্কুল থেকে এবার এসএসসি-তে সবকয়টি বিষয়ে ‘এ প্লাস’সহ জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস সে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তির সুযোগ পাবে। তাই চট্টগ্রাম কলেজ, মহসিন কলেজ ও সরকারি সিটি কলেজসহ মোট ৫টি কলেজে আবেদন করেছে সে। কিন্তু আরো ৫টি কলেজে আবেদনের সুযোগ থাকলেও তার প্রয়োজন নেই বলে মনে করে মাহিন। তার বক্তব্য- গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ায় এই তিনটি কলেজের যে কোন একটিতে অবশ্যই সুযোগ পাওয়া যাবে। তাই অযথা অন্য কলেজগুলোতে আবেদন করার দরকার নেই। অন্যদিকে, একটি বিষয়ে (গণিতে) ‘এ প্লাস’ মিস করেও জিপিএ-৫ পেয়েছে সাবরিনা রহমান। সুযোগ পাওয়া যাবে না, এই আশঙ্কায় চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজে আবেদনই করেনি বিজ্ঞানের এই শিক্ষার্থী। আবেদন করেছে সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজসহ আরো কয়েকটি বেসরকারি কলেজে। কিন্তু চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল তার। সাবরিনার ধারণা- চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজে কেবল গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্তরাই ভর্তির সুযোগ পাবে। এক বিষয়ে ‘এ প্লাস’ মিস করায় সেখানে তার ভর্তির সুযোগ হবে না। তাই আবেদনের সময় এই দুটি কলেজ পছন্দের তালিকায় দেয় নি সে।
ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে জিপিএ-৫ পাওয়া এই দুই ক্যাটাগরির শিক্ষার্থী-ই মারাত্নক ভুল করছে বলে মন্তব্য বোর্ড সংশ্লিষ্টদের। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর জাহেদুল হক আজাদীকে বলেন, ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী- ‘সমান জিপিএ প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে মোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতেই মেধাক্রম নির্ধরাণ করা হবে। ফলে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের মাঝে কে সবকয়টি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ (গোল্ডেন) পেলো আর কে পেলো না তা বিবেচনায় আনা হবে না। সকল জিপিএ-৫ প্রাপ্তদেরই একই ক্যাটাগরিতে ধরা হবে এবং তাদের মোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতেই মেধাক্রম প্রকাশ করা হবে। আর সবকয়টি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ পেয়ে (গোল্ডেন) জিপিএ-৫ পাওয়া একজন শিক্ষার্থীর তুলনায় একটি বা দুটি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ মিস করে জিপিএ-৫ পাওয়া একজন শিক্ষার্থীর মোট প্রাপ্ত নম্বর বেশি হতে পারে। সেক্ষেত্রে মোট প্রাপ্ত নম্বর বেশি হওয়ার সুবাদে মেধা তালিকায় ওই শিক্ষার্থী-ই (একটি বা দুটি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ মিস করে জিপিএ-৫ পাওয়া) এগিয়ে থাকবে। আর সবকয়টি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ পেয়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীটি ভর্তির সুযোগ নাও পেতে পারে। এ নিয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া এবং সুযোগ থাকায় সর্বোচ্চ সংখ্যক (মোট দশটি) কলেজে আবেদনের পরামর্শ দেন তিনি।
ভুল ধারণার কারণে জিপিএ-৫ পেয়েও অনেক শিক্ষার্থীর কলেজে ভর্তি অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম। তিনি আজাদীকে বলেন- যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে আগে আবেদনকৃত সবকয়টি কলেজে একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তির জন্য মনোনীত করা হতো। কিন্তু বর্তমানে একজন শিক্ষার্থীকে একটি মাত্র কলেজে ভর্তির জন্য মনোনীত করা হচ্ছে। তাই সবকয়টি বিষয়ে জিপিএ-৫ পাওয়া একজন শিক্ষার্থী কেবল ৫টি কলেজে আবেদন করলে সেক্ষেত্রে ৫টি কলেজেই ভর্তির জন্য তার মনোনীত না হওয়ার আশংকা রয়ে যায়। আর আবেদনে পছন্দের তালিকায় না দেয়ায় অন্য কলেজের মেধা তালিকায় ওই শিক্ষার্থীর নাম আসার প্রশ্নই আসে না। এতে করে জিপিএ-৫ পেয়েও তার কলেজে ভর্তি অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। যার কারণে এসব শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের পরামর্শ- যেহেতু সুযোগ আছে সেহেতু সর্বোচ্চ সংখ্যক কলেজে আবেদন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে করে ভর্তি নিয়ে অনিশ্চিয়তায় পড়তে হবে না। একই ভাবে যেহেতু গোল্ডেন জিপিএ-৫ বিবেচ্য নয়, সেহেতু একটি বা দুটি বিষয়ে ‘এ প্লাস’ মিস করে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের উচিত শীর্ষ স্থানীয় বা প্রথম সারির কলেজগুলোতে আবেদন করা। মোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে মেধাক্রম নির্ধারণ করা হবে বিধায় এক্ষেত্রে তাদের সুযোগও কোন অংশে কম নয়। আগামী ২৩ মে পর্যন্ত আবেদনের সুযোগ থাকায় তা কাজে লাগানোর পরামর্শও দেন শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সাল পর্যন্ত একই জিপিএ ধারীদের মাঝে মোট জিপি (গ্রেড পয়েন্ট)’র ভিত্তিতে মেধা তালিকা নির্ধারণ করে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটি। সেক্ষেত্রে সবকয়টি বিষয়ে (চতুর্থ বিষয়সহ) ‘এ প্লাস’ পেয়ে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের একটি ক্যাটাগরিতে ধরা হতো এবং ভর্তির ক্ষেত্রে তারাই ছিল এগিয়ে। আর এক বা একাধিক বিষয়ে ‘এ প্লাস’ মিস করা জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের ধরা হতো পরের ক্যাটাগরিতে।
তবে ২০১৬ থেকে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত সব শিক্ষার্থীকেই একই ক্যাটাগরির আওতায় বিবেচনায় ধরে মোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতেই মেধাক্রম নির্ধারণ করে আসছে
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটি।
এবারের ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী- বিজ্ঞান গ্রুপে ভর্তির ক্ষেত্রে মোট প্রাপ্ত নম্বর সমান হলে মেধাক্রম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ গণিত ও উচ্চতর গণিত/জীববিজ্ঞানে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনায় আনা হবে। এরপরও জটিলতা নিরসন না হলে তবে পর্যায়ক্রমে ইংরেজি, পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়নে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনায় নিয়ে মেধাক্রম নির্ধারণ করা হবে।
আর মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা গ্রুপের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত মোট নম্বর সমান হলে পর্যায়ক্রমে ইংরেজি, গণিত ও বাংলা বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনায় নিয়ে মেধাক্রম নির্ধারণ করা হবে।
অন্যদিকে, এক গ্রুপের প্রার্থী অন্য গ্রুপে ভর্তির ক্ষেত্রে জিপিএ একই হলে মোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে মেধাক্রম নির্ধারণ হবে। এরপরও জটিলতা দেখা দিলে পর্যায়ক্রমে ইংরেজি, গণিত ও বাংলা বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনায় নিয়ে মেধাক্রম নির্ধারণ করা হবে।
প্রসঙ্গত, আগামী ২৩ মে পর্যন্ত অনলাইন (ওয়েবসাইট) এবং মোবাইল এসএমএস-এর মাধ্যমে কলেজ ভর্তিতে আবেদনের সুযোগ রয়েছে। ফল পুনঃনিরীক্ষায় আবেদনকারীদেরও এই সময়ের (২৩ মে) মধ্যে আবেদন করতে হবে। ১ জুন পুনঃনিরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হবে। পুনঃনিরীক্ষায় ফলাফল পরিবর্তন হওয়া শিক্ষার্থীরা কলেজ ভর্তিতে নতুন করে ৩ ও ৪ জুন (দুই দিন) আবেদনের সুযোগ পাবে। এবার সর্বোচ্চ দশটি কলেজে আবেদনের সুযোগ রয়েছে একজন শিক্ষার্থীর। ভর্তি অনিশ্চয়তা কাটাতে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদেরও সর্বোচ্চ সংখ্যক কলেজে আবেদনের পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবোর্ড সংশ্লিষ্টরা।
এবার এসএসসিতে মোট জিপিএ-৫ ধারীর সংখ্যা ৭ হাজার ৩৯৩ জন। এর সিংহ ভাগই (৬ হাজার ৯৫৪ জন) বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। বাকি দুই শাখায় জিপিএ-৫ ধারীর সংখ্যা মাত্র ৪৩৯ (মানবিকে ২৭, ব্যবসায় শিক্ষায় ৪১২)।

x