জাপানে উদযাপিত হলো পুতুল উৎসব `হিনা মাৎসুরি’

প্রবীর বিকাশ সরকার, জাপান থেকে

সোমবার , ৪ মার্চ, ২০১৯ at ৯:৩১ অপরাহ্ণ
52

জাপানের ঐতিহ্যমণ্ডিত হিনামাৎসুরি বা পুতুল উৎসব ছিল গতকাল ৩ মার্চ যদিও জাতীয় উৎসব তারপরও কিন্তু জাপানে সরকারি কোনো ছুটি নেই এদিনটিতে। তবে অনেকেই ছুটি নিয়ে উৎসবটি উদযাপন করেন জাঁকজমকের সাথে। হিনা অর্থ পুতুল ইংরেজিতে ডল আর মাৎসুরি হচ্ছে মেলা, উৎসব বা পার্বণ।

সাধারণত দিবসটি কাছাকাছি রবিবার ছুটির দিনে ঘটা করে অনুষ্ঠিত হয়। এই দিবসটির ছুটিটা মে মাসে ৫ তারিখে অনুষ্ঠিত পুত্রদিবস তথা জাতীয় শিশু দিবসের সঙ্গে এক করে নিয়ে চালু করা হয়েছে সাত দিনের জন্য গোল্ডেন ইউক যার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে মে দিবসকেও।

এই বছর (২০১৯) সৌভাগ্যক্রমে সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবারে এসেছে দিবসটি। তাই বিপুলাকারে উদযাপিত হয়েছে সারাদেশব্যাপী।

যে-সব পরিবারে ছোট ছোট কন্যা সন্তান রয়েছে তাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক একটি দিন হিনা মাৎসুরি। স্মারক ছবি তোলার হিড়িক পড়ে যায় এদিন। আগের দিনে স্টুডিওতে গিয়ে স্মারক ছবি তোলার চল ছিল। ডিজিটাল ক্যামেরা এবং মোবাইল ডিভাইসের সহজলভ্যর কারণে স্টুডিওতে যেতে হয় না। স্টুডিও এখন আর নেই বললেই চলে।

কন্যাকেন্দ্রিক এই উৎসবটির আদিউৎসব সম্পর্কে জানা যায় না তবে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে হেইয়ান যুগ (৭৯৪-১১৮৫ খ্রি:) থেকে শুরু এবং রাজধানী কিয়োতোর রাজপ্রাসাদ থেকেই। তাই প্রধান একজোড়া যে পুতুল দেখা যায় বেদিতে সাজানো তারা হলেন হেইয়ান যুগের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী আর নিচে উপবিষ্ট রাজপরিবারের নিকটাত্মীয় পরিজন।

আমার কাছে বিপুলরঙা এই পুতুল উৎসবটি বাংলার দুর্গা-উৎসবের মতো মনে হয়। দেবী দুর্গার পেছনে থাকে স্বামী মহাদেবের একটি ছবি মূর্তি অথবা পুতুলজাতীয় অবয়ব। আর দেবীর সঙ্গে থাকেন তাঁর সন্তানরা।

দেবী দুর্গা যদিওবা দেবপাহাড় হিমালয়ের কৈলাশ গিরি থেকে নেমে আসেন সমতলে পিতাগৃহে বেড়াতে কিন্তু অলক্ষ্যে যে উদ্দেশ্যটি থাকে তা হলো লক্ষকোটি সন্তানতুল্য মানুষের শুভাশুভ, মঙ্গলামঙ্গল বয়ে আনা এবং রোগবালাই, বিপদ-আপদ দূর করা।

তাছাড়া দুর্গাপুজোর মহাঅষ্টমীর পর কুমারি পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে দেবী দুর্গার শক্তিসত্বাস্বরূপ। হিনা মাৎসুরির মূল উদ্দেশ্যটাও তাই—কন্যাসন্তানের শুভাশুভ, মঙ্গলামঙ্গল এবং বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ থাকার প্রার্থনা করা।

কিন্তু আরও একটি উদ্দেশ্য অলক্ষ্যে থাকে, সেটা কন্যার ভবিষ্যৎনারীরূপ—শক্তিশালী অরিনাশিনী ভগিনী, মাতা এবং বিশ্ববিমোহিনী নেত্রী।

এই উৎসবটি সম্পূর্ণই জাপানের ভূমিজাত প্রাচীন শিন্তোও (ঈশ্বরের পথ) ধর্মজ কিন্তু আধ্যাত্মিক চেতনা বা দর্শনের দিক দিয়ে হিন্দুধর্মের সঙ্গেও যেন মিশ্রিত। শিন্তোরা সূর্যপূজক, হিন্দুরাও তাই। প্রাকৃতিক শক্তির পূজারি হিন্দুদের মতো শিন্তোরাও। ছয় হাজার বছর প্রাচীন শিন্তোও যে বৈদিক সভ্যতা-সংস্কৃতি-ধর্ম-জীবনযাত্রা থেকে প্রভাব গ্রহণ করেনি তা মোটেও অস্বীকার করা যাবে না।

হিন্দু ধর্মের মতোই এই উৎসবে ঘরেঘরে, মন্দিরে-মন্দিরে উপাসনা ও প্রার্থনা করা হয়। প্রসাদ গ্রহণ করা হয়। দক্ষিণাদান করা হয়। পুতুল দিয়ে সাজানো হয়। হিনা-নিনগিয়োও বা হিনা-পুতুল দোকানে-দোকানে বিক্রি হয়। দেশি-বিদেশি রেস্টুরেন্টে ভিড় লেগে যায়। মণ্ডামিঠাই, কেক, আইসক্রিম কেনার ধুম পড়ে গিয়েছিল এ উৎসবের দিন। অনেক পরিবার গ্রামে যান আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দিবসটি উদযাপন করার জন্য। সবচেয়ে রঙিন উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় কিয়োতো প্রদেশে। আর সবচেয়ে বড় উৎসব হয় তোকুশিমা দ্বীপে।

ছোট ছোট মেয়েরা খড়, কাগজ ও কাঠের তৈরি পাত্র ও নৌকোতে কাগজের তৈরি জোড়াপুতুল ফুলসহ নদীতে, জলাশয়ে ভাসিয়ে দিয়েছে এই উৎসবের দিন এই অর্থে যে তাদের ছেড়ে যত ব্যাধি, জ্বরা আর অমঙ্গল ভেসে ভেসে সমুদ্রে গিয়ে লীন হয়ে যাক। আর মায়েরা মনে মনে প্রার্থনা করেন, মেয়েটার জীবনে যেন সুযোগ্য একজন বর এসে চিরসাথী হয়।

x