জাতি সেবক চায়- ভাঁড় নয়

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৯:৩২ পূর্বাহ্ণ
54

প্রচণ্ড অস্থির, অস্বাভাবিক ও নষ্ট সময় পার করছি আমরা। সব দেখে শুনে ছোটবেলায় পড়া একটি কবিতা বার বার স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠে। কবিতাটি হচ্ছে,
‘এক যে ছিল মজার দেশ-সব রকমের ভাল/ রাতে সেথায় বেজায় রোদ-দিনে চাঁদের আলো/ আকাশ সেথা সবুজ বরণ-গাছের পাতা নীল/ রুই-কাতলা আকাশে উড়ে-পানির মাঝে চিল/ —! মজার কবিতাটি এখন বাস্তবে উঠে এসেছে। আমরা স্বচ্ছল, সুবিধাভোগী মানুষগুলো কেন জানি কবিতার আজব দেশের মানুষ হয়ে গেছি! অদ্ভুত এক অস্থিরতা আমাদের রাজনীতিসহ সব সেক্টরে থাবা বসিয়েছে। আমরা সবাই দৌড়াচ্ছি। যত দ্রুত সম্ভব শর্টকাট পথ মাড়িয়ে জাগতিক সব চাহিদা দ্রুত নিজের ঝোলায় ভরতে চাই। কে বাঁচে-কে মরে, কে খায় বা উপোস দেয়; ওসব দেখার সময় কারো নেই। অথচ রাজনীতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়সহ সব অঙ্গনে সুন্দর সুললিত কথামালার ফেনা ভাসছে অবিরত। নানা আয়োজন, অনুষ্ঠান, সভা, সেমিনার ওয়ার্কশপ, প্রদর্শনী, মিডিয়া সবই আমরা সুবচনের তোড়ে ভাসিয়ে নিচ্ছি। অথচ নিজের ব্যাক্তি জীবন ও কর্মে আমরা বিপরীত মেরুর যাত্রী। আবার ধর্ম-কর্ম, মসজিদ, মাদ্রাসা, মিলাদ, হজ্ব, মন্দির, দেবালয়, প্যাগোডা, গীর্জা, সিনাগগ সবখানেই মানুষের তীব্র ভিড়। বাড়ছে ধার্মিকের সংখ্যা। বৃদ্ধিটা জ্যামিতিক হারকেও টেক্কা দেয়। কিন্তু সত্য, বিবেক ও ন্যায়ের পথটা একেবারেই ফাঁকা! ও’পথে ভুলেও কেউ হাঁটি না। বিবেকের,ক্ষয়, মানবিকতার ভয়ঙ্কর খরায় সত্য -সুন্দরের অনুগামীর সংখ্যা ভয়ঙ্করভাবে কমছে। আমরা ভুলে গেছি মিথ্যা, অসত্য বা অসুন্দরের সাথে কখনো ধর্মের সহাবস্থান হতে পারেনা। এখন মিথ্যার সাথে হাত ধরাধরি করে চলছে ধর্ম। এটা অসম্ভব এক সহাবস্থান! দু’ বিপরীত মেরুর গলায় গলায় ভাব কীভাবে সম্ভব! মিথ্যার প্রবল শক্তির বেনোজলে ভেসে গেছে সত্য। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাই এখন উল্টো পথের যাত্রী। আমাদের অবস্থা একটু বেশি করুণ, এটাই শুধু ফারাক।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মেঙিকো সীমান্ত দেয়াল তৈরির শর্তে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কংগ্রেসের বাজেট প্রস্তাব মানছেন চাপে পড়ে। তার দেয়াল বাজেটের প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের মাত্র এক চতুর্থাংশ (১৪০ কোটি ডলার) অনুমোদন দেয় ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস। প্রস্তাব মানলেও ট্রাম্প জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দিয়েছেন। জরুরি অবস্থার পর মার্কিন রাজনীতি কোন পথে হাঁটে সেঅপেক্ষায় বিশ্ববাসী। একটা মজার কান্ডও ঘটেছে দেশটিতে। নামের শেষে ট্রাম্প পদবি থাকায় এক স্কুল কিশোরকে তার বন্ধুরা প্রায় ‘ঝাঁটাপেটা’ করে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করেছে। ট্রাম্প নামটা মার্কিন মুল্লুকে কত ধিকৃত, উদাহরণ এই স্কুল কিশোর। ৫ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ইউনিয়ন অব স্টেট এর বিলম্বিত ভাষনে ছেলেটাকে বিশেষ মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানিয়ে ট্রাম্প পরিবার সম্মানিত করলেও পরিবার তার পদবি ঝেড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডাহা মিথ্যা ও আত্মম্ভরিতায় রেকর্ড গড়া ট্রাম্প সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে হয়তো সেরা ভাঁড় হিসাবে নিজের অবস্থান পাকা করতে যাচ্ছেন। স্বস্তিতে নেই ব্রিটেন, ফ্রান্স, ভেনিজুয়েলা, সৌদি আরব, চীন, ভারতও। তালিকায় বাংলাদেশতো আছেই। ভারতে জইশ ই মোহাম্মদ নামের জঙ্গিবাদি গোষ্ঠী আত্মঘাতি বোমা হামলা চালিয়ে কাশ্মীরের শ্রীনগরের অদূরে সেন্ট্রাল পুলিশ রিজার্ভ ফোর্সের ৪০ সদস্যকে হত্যা ও জখম করেছে আরো ৪২ জন। এ’ নিয়ে ভারত- পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা চরমে। এর জেরে আবারো পাকিস্তান সীমান্তে ঘটতে পারে ভারতের সার্জিক্যাল অপারেশন। সমঝোতায় ব্যর্থ ব্রিটেনের থেরেসা মে সরকার চুক্তি সংশোধন ছাড়াই ই ইউ’র সাথে ব্রেঙিট পাশের চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে। ফ্রান্সে তেল ও পণ্য মূল্য কমাতে ইয়েলো বেল্ট আন্দোলন চলছে কয়েক মাস ধরে। সৌদি আরব সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকান্ড ও ইয়েমেন নিয়ে আছে মহাচিপায়। ট্রাম্প রাজতন্ত্রের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিলেও কংগ্রেসসহ পুরো ইউরোপ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে। ভেনিজুয়েলায় দু’প্রেসিডেন্টের বিবাদ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, তা পুরো বিশ্বের জন্যই উদ্বেগের।
দেশে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে ঐক্যজোট প্রার্থীরা হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইবুনালে পৌণে এক শ’র মত মামলা ফাইল করেছে। এর বাইরে মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপ কমিটির কয়েক সদস্য ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনী অনিয়ম তদন্তে ট্রাম্প প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছে। এসব ইস্যুর বাইরে উপজেলা পরিষদ ও প্রায় তিন দশক পর ডাকসু নির্বাচন নিয়েও রাজনীতির মাঠ বসন্তের সাথে হাল্কা উত্তাপ ছড়াচ্ছে। উপজেলা নির্বাচনে ঐক্যজোট তথা বিএনপি অংশ না নেয়ায় সরকারি দলের বাইরে এটা উত্তাপ ও আমেজহীন হয়ে পড়েছে। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ছাত্রলীগ ও সমমনা টিএসসি ভিত্তিক সংগঠনের সাথে প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও ছাত্রদলের ভোটকেন্দ্র বিষয়ক বিরোধও জটিল। এসব ঘটনা প্রবাহের সাথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে জামায়াতের বিরোধ।
জামায়াতে বিরোধ থাকলেও তা সাধারণত আলোতে আসেনা। কিন্তু এখন তা মিডিয়া শিরোনাম। মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী শক্তির আবর্জনা ঝেড়ে ফেলতে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে জামায়াত নামটিরও বিলুপ্তি চায় দলটির একটি অংশ। এর মাঝে লন্ডনে অবস্থানরত দলটির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগ করে দাবিটি প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন। যুদ্ধাপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কামারুজ্জামান ও মীর কাশেম আলীও নাকি এই দাবির পক্ষে ছিলেন। কিন্তু আরেক ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত নিজামী ও তার ছেলেসহ গোঁড়া জামায়াত নেতারা দাবির বিরুদ্ধে। জামায়াত কোন পথে হাঁটবে তা দেখতে অপেক্ষায় থাকতে হবে। আওয়ামী লীগের সাথে মহাজোটে থাকা জাতীয় পার্টি এবং ১৪ দলীয় জোট শরিকরাও সরকারে থাকতে না পেরে বেশ অসন্তুষ্ট। তাদের বক্তব্য, শরীরী ভাষায়ও এটা পরিষ্কার। সব মিলিয়ে রাজনীতি এখন খুবই স্পর্শকাতর একটি বাঁক পার করছে। কিন্তু ক্ষমতার মোহ ও ঘোরে আচ্ছন্ন সরকারি দলের নেতা- কর্মীদের মাঝে এর কোন প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয়না।
তারা পুরোপুরি ক্ষমতার খোয়াবিতে। বিএনপি, জামায়াতের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ অকেজো হয়ে পড়ায় নিজেরাই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পড়েছে। চলছে রাজনৈতিক সৃজনশীলতার বদলে তোষামোদ আর সস্তা রাজনৈতিক ভাঁড়ামোর প্রদর্শনী। বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার নামে কতো বেশি স্থাপনা ও অবকাঠামো নামাকরণের প্রস্তাব মন্ত্রী পরিষদে কার আগে কে বেশি রাখবেন, চলছে প্রতিযোগিতা। কেউ চট্টগ্রাম কর্ণফুলী টানেলওয়ের নাম বঙ্গবন্ধুর নামে রাখার প্রস্তাব দিলে আরেকজন প্রস্তাবিত নয়া বিমানবন্দরের নাম শেখ হাসিনার নামে রাখার প্রস্তাব দিচ্ছেন। আবার সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যাকাণ্ডের স্থানে প্রতিষ্ঠিত জিয়া স্মৃতি যাদুঘরের নাম বদলে সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই তা মুছে ফেলা, ছবি ঢেকে দেয়ারও নোংরা প্রতিযোগিতা খুবই দৃষ্টিকটু। দেশপ্রেম, কল্যাণ ব্রত পদপিষ্ট করে রাজনীতির এই উল্টোযাত্রা আধুনিক সভ্যতার জন্য লজ্জাস্কর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম পুরো মানচিত্রে সেঁটে রাখার কী কোন দরকার আছে! তিনি তো সর্বকালের সেরা বাঙালি এবং জাতির অবিসংবাদিত মহান জনক। এই সত্য কোন অপশক্তি জোর করে মুছে ফেলতে চাইলে, তা কী সম্ভব? কখনো নয়। তাহলে কেন এ ধরনের ভাঁড়ামোর প্রতিযোগিতা! এটা কী বঙ্গবন্ধু বা জননেত্রীর নাম ভাঙিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ আদায়ের সহজ ও চটুল কৌশল নয়? এতে বঙ্গবন্ধু বা নেত্রীর নাম মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালানোর বদলে উল্টো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কারণে কলঙ্কিত হবে অনেক বেশি। এর মাঝে এ’ ধরনের অনেক অভিযোগ উঠেছে। দেশ ও মানুষের জন্য সরকারি দলের নেতাদের অনেক কিছু করার আছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা নির্মাণের কাজ এখনো অনেক দূরে। সরকারি দলের নেতারা বঙ্গবন্ধুর পথনঙা ধরে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণমুখী সৃজনশীল ও মানব কল্যাণের রাজনীতি উপহার দেবেন, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। তাদের মনে রাখা উচিত, দেশ ভাঁড়, চাটুকার চায় না, খাঁটি সেবক চায়।

x