জাতিসংঘ সহকারী মহাসচিবের সঙ্গে ফখরুলের বৈঠক

আমাদের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই : কাদের

আজাদী ডেস্ক

শুক্রবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৩:১২ পূর্বাহ্ণ
196

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দেশে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদের মধ্যে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিশ্ব সংস্থাটির একজন সহকারী মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব মিরোস্লাভ জেনকার সঙ্গে গতকাল সকালের (নিউ ইয়র্ক সময়) এই বৈঠকে দেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিরোধী দলকে দমনপীড়নের অভিযোগ এবং দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে আলোচনা করেন বিএনপি মহাসচিব। ফখরুলের এই সফর জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে বলে তার দলের নেতাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও বিশ্ব সংস্থাটির দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির উদ্যোগেই এই বৈঠক হয়েছে। বিডিনিউজের খবরে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক করতে ফখরুল নিউ ইয়র্ক গেছেন বলে খবর ছড়ালেও তার বৈঠকটি হয়েছে একজন সহকারী মহাসচিবের সঙ্গে।

জাতিসংঘে পদমর্যাদায় আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলেরও পরে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বা সহকারী মহাসচিবদের অবস্থান। পদমর্যাদায় জাতিসংঘ মহাসচিবের পরে রয়েছেন একজন উপ মহাসচিব; তার নিচে রয়েছেন বর্তমানে ২১ জন আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল। এই আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলদের সহায়তায় রয়েছেন বিভাগভিত্তিক অনেক সহকারী মহাসচিব। বছর শেষে অনুষ্ঠেয় একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দশম সংসদ নির্বাচন বয়কটকারী বিএনপির মহাসচিবের এই সফর দেশেও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার সৃষ্টি করে। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলের মহাসচিবের এই সফরের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, নালিশে নালিশে বিরক্ত হয়ে হয়ত জাতিসংঘ তাদের ডেকেছে। এটা জাতিসংঘ করতেই পারে। তবে আমরা আমাদের সংবিধানের বাইরে কারও চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না। সংবিধানসম্মতভাবেই নির্বাচন হবে।

বাংলাদেশে বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতায় আনতে ২০১৩ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিবের উদ্যোগে ঢাকায় এসেছিলেন তৎকালীন একজন সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। তিনি দফায় দফায় বৈঠক করলেও ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। এরপর বিএনপির বর্জনের মধ্যে নির্বাচন করে ক্ষমতায় থেকে যায় আওয়ামী লীগ।

জেনকার সঙ্গে বৈঠকে ফখরুলের সঙ্গে ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল এবং লন্ডন থেকে আসা সহআন্তর্জাতিক সম্পাদক হুমায়ূন কবীর। বৈঠক শেষেই বিএনপি মহাসচিব ওয়াশিংটন ডিসির উদ্দেশে রওনা হন। যাওয়ার আগে বৈঠকের ফলাফল নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, একদিনের বৈঠকে কী ফল জানা সম্ভব?

ফখরুল বলেন, মহাসচিবের আমন্ত্রণে এ বৈঠকে এসেছিলাম। আসন্ন নির্বাচনসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছে। খালেদা জিয়ার সাথে সরকারের চরম বৈরী আচরণের প্রসঙ্গও স্থান পায় এ বৈঠকে।

বিডিনিউজের খবরে আরো বলা হয়, এই বৈঠক নিয়ে যোগাযোগ করা হলে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান আজিজ হক এক ই মেইল বার্তায় বলেন, বিএনপির অনুরোধে সহকারী মহাসচিব মিরোস্লাভ জেনকা বিএনপি মহাসচিবকে সাক্ষাৎ দেন। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মাঝেমধ্যেই সহকারী মহাসচিবের দপ্তর রাজনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করে, এটি তার ব্যতিক্রম নয়।

ফারহান বলেন, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তারা জবাবদিহিতাপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য ভূমিকা রাখবেন। এই বৈঠকের গুরুত্ব প্রসঙ্গে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে এ মোমেন বলেন, সবকিছু নির্ভর করে দেনদরবারকারীদের সঙ্গে থাকা দেশগুলোর ওপর। সেসব দেশ যদি খুব শক্তিশালী হয়, তাহলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়। আর যদি দুর্বল হয়, তাহলে ফটোসেশনে পরিণত হয় এমন বৈঠক। বিএনপির মহাসচিবের বৈঠকের জন্য কারা তদবির করেছে তার ওপর সবকিছু নির্ভর করবে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যে কোনো কাজে জাতিসংঘকে উদ্বুদ্ধ করতে হলে শক্তিশালী বা প্রভাবশালী রাষ্ট্রের অকুণ্ঠ সমর্থন লাগে।

দেশে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী মোমেন বলেন, সকলকে মনে রাখতে হবে যে, সামপ্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা ফোন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। সাবেক দুই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টন এবং জন কেরিও শেখ হাসিনাকে ফোন করেন পৃথক দুটি ইস্যুতে। জাতিসংঘ থেকেও কয়েক বছর আগে একজন আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ঢাকায় গিয়ে দেনদরবার করেছিলেন। ফলাফল সকলেই জানি।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নিজের কর্মদক্ষতা এবং নেতৃত্বগুণে বাংলাদেশের মানুষের ওপর এতটাই আস্থাবান যে, অন্যের কথায় নড়চড় করেন না। এদিকে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফখরুল বৈঠক করবেন বলে বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনে তদবির চালাতে বিএনপি ওয়াশিংটনে একটি ‘লবিং ফার্ম’ ভাড়া করেছে বলেও খবর দিয়েছে রাজনীতি বিষয়ক ম্যাগাজিন পলিটিকো।

বিএনপির এই তৎপরতার প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ গতকাল বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশের মানুষের প্রতি বিএনপির কোনো আস্থা নেই। এজন্য তারা এখন বিদেশমুখী। তারা নালিশ বাংলাদেশের মানুষকে দিচ্ছে না, বরং বিদেশে গিয়ে বিদেশিদের কাছে নালিশ উপস্থাপন করছে। এটি তদের রাজনৈতিক দৈন্যের বহিঃপ্রকাশ। জনগণের উপর তাদের আস্থাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপির নেতারা এত নালিশ শুরু করেছে যে জাতিসংঘও বিরক্ত হয়ে তাদের নালিশ শোনার জন্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তলব করেছে। অবশ্য আমাদের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। বিএনপি পুরোপুরি একটি নালিশ পার্টি মন্তব্য করে সেতুমন্ত্রী বলেন, তারা যে একটি নালিশ পার্টি তারা তা বারবার প্রমাণ করেছে। জাতিসংঘে গিয়েও তারা তারই পুনরাবৃত্তি করবে। গতকাল রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় সড়ক ভবন নির্মাণের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, জাতিসংঘ বিশ্বের আন্তঃরাষ্ট্রিক সর্বোচ্চ একটি ফোরাম। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই জাতিসংঘ কেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ডেকেছে এ বিষয়ে অহেতুক মন্তব্য করা ঠিক হবে না। কাদের বলেন, কোনো দেশে সংকট থাকলে তা নিরসনের জন্য জাতিসংঘ তাদের একজন দূত পাঠায়। তিনি ওই সংকট নিরসনের জন্য প্রচেষ্টা চালান। বর্তমানে দেশে কোনো সংকট না থাকায় তারা কোনো দূত পাঠায়নি। তিনি বলেন, জাতিসংঘ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করবে কিনা তা আমরা জানি না। তারা অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন চাইতে পারে। আমরাও সে ধরনের নির্বাচন চাই। কাদের বলেন, আমরা সংবিধানের বাইরে কারো চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না। সংবিধান অনুযায়ী দেশের নির্বাচন হবে। নির্বাচন চলাকালে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) স্বাধীন ও কর্তৃত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে মাত্র।

বিএনপির আন্দোলনের ডাকের বিষয়ে জানতে চাইলে কাদের বলেন, তারা এমন আন্দোলন করবে যাতে নৌকা ভেসে চলে যায়। নৌকা তো ভেসেই আছে। এটা তো ডুবন্ত সাবমেরিন নয় যে ডুবে আছে ভেসে যাবে। নৌকা ভাসতে ভাসতে আগামী বিজয়ের মাসে বিজয়ের পতাকা নিয়ে ভিড়বে।

ভারতের আসামের নাগরিকপঞ্জি বহির্ভূত অধিবাসীদের বিতাড়নের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, তারা (ভারত) এখনও এ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেনি। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিষয়টি দেখা হবে।

x