জলের সাথে সংসার

দীপক বড়ুয়া

শুক্রবার , ২৯ জুন, ২০১৮ at ৬:২৪ পূর্বাহ্ণ
79

প্রতিদিন ভোরে বেরুয় জয় সেন। ফিরে রাতে। কোনদিন রাতেও যায়। বিশেষ করে পূর্ণিমা অমাবস্যায় রাতে।

আজকাল নদীতে কাছাকাছি মাছ নেই। অনেক আগে কর্ণফুলিতে প্রচুর মাছ ছিলো। এখন নেই। ইঞ্জিনের ট্রলার, স্টিমার, জাহাজের গড়গড়ানির শব্দে দূরে মাছ চলে গেছে। সে কারণে ট্রলারে বরফ নিতে হয় বেশি। ডিজেল ভর্তি রাখতে হয়।ঐ গভীর সমুদ্র থেকে ফিরতে দেরী হলে মাছ পঁচে যায়। তেলের দাম চড়া। মহেশখালীর কাছে জাল ফেলতে হয়। জয়সেন পাকা জেলে। কোন জায়গায় জাল ফেলতে হয় ভালো জানে। কোথায় মাছ বেশী থাকে, সেই অভিজ্ঞতা বাবা জয়রাম থেকে শিখেছে। জয়রামের জেলে হিসেবে খুব নামডাক। তার একমাত্র ছেলে জয়সেন।পাড়ার সবাই মানে।

টাকাকড়ি যথেষ্ট আছে। চার পাঁচটা ইঞ্জিনের ট্রলারের মালিক সে। জেলে আছে ত্রিশজনের বেশী। সব ট্রলার একসঙ্গে ব্যবহার হয়না।

জয়সেনের স্ত্রী বিন্দুবালা। সুন্দরী।

ছেলেপুলে নেই। বিয়ে হলো পাঁচ বছর। ছেলের জন্য জয়সেন, বিন্দুবালা পাগল। জয়সেনের মা নাতি নাতি করে

পাড়ার সর্দার হরলাল।

সুঠাম দেহের। চরিত্র ভালো নয়। যুবতী মেয়েদের দিকে চোখ কিলবিল করে। আবার বিবাহিত সুন্দরী মেয়েদের প্রতিও চোখ দেয়।

সবাই ভয় করে। সর্দারতো! মুখের উপর কথা বলেনা কেউ।

জয়সেনকে সমীহ করে। বিত্তশালী বলে।ভাব আছে। বন্ধুর মতো কথা বলে। শালিশী বৈঠকে জয়সেনকেও রাখে।

জয়সেনের বাবা মারা গেছে সাত বছর আগে। মা আছে। কাজের মেয়ে আছে দুজন।

দূরে কোথাও গেলে মাকে বলে,

মা,সাবধানে থাকবে। রাতে ভালো করে দরজা লাগাবে। সদর দরজায় তিনটা তালা দিয়ে শোবে।দেশের অবস্থা ভালো নয়।কখন কিহয় বলা যায়না।

আজ বেরুবার সময় জয়সেন মাকে বলে,

মা ফিরতে এক সপ্তাহ লাগবে। এবার অনেক দূরে যাবো। কাছে তেমন মাছ নেই। তাই এবার ইলিশের জাল ফেলবো। সমুদ্রে প্রচুর ইলিশ পড়ছে।

ঠিক আছে বাবা ,যা।

আমার ইলিশ খেতে ইচ্ছে করছে। আনবে আমাদের জন্য। বিন্দুবালা বলে।

আনবো, আনবো।বড়ো বেশ কটা জাতি ইলিশ আনবো এবার।

বিন্দুর মুখে হাসি। ইলিশ আনার কথা শুনে।

হ্যাঁগো রেডিওটা নিয়ে যাবে। আজকাল ঝড়বৃষ্টির ঠিক নেই। সমুদ্রের মাঝে থাকবে! হঠাৎ ঝড় তুফানের খবর পাবে।তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবে। বিন্দু বলে।

সেকি বলছো বিন্দু! আমাদেরতো জলের সাথে সংসার। জীবনের বেশীক্ষণ সময় জলের সাথেতো থাকি। জলকে ভয় করিনা। জয়সেন উত্তর দেয়।

,তাই বলো। বিন্দু ছোট গলায় বলে।

কথা থামিয়ে মাঝখানে জয়সেনের মা বলে,

বৌমা ঠিকই বলেছে। জয়সেন, রেডিওটা নে।

কাছেদূরে যাবার সময় মাকে পায়ে প্রণাম করে জয়সেন। আজকে ও প্রণাম করে বলে,

মা, আর্শিবাদ করো।

মা জয়সেনের মাথায় হাত দিয়ে আর্শিবাদ করে।বুকে জড়িয়ে ধরে। শার্টের বোতাম খুলে থুথু দেয় বুকে।হাতের আঙুল কামড়িয়ে দেয়।

জয়সেন বেরুবার আগে বিন্দুকে বলে,

বিন্দু মাকে দেখবে। সাবধানে থাকবে।

বিন্দু গোমটা দিয়ে জয়সেনকে প্রণাম করে বলে,

আচ্ছা,তুমি চিন্তা করোনা। সাবধানে থাকবে।

বিন্দুর চোখ জলে ভরে যায়।

ভাবে,দিন একা থাকবে।ভয়ও হয়।গভীর সমুদ্রে যাচ্ছে! যদি কোনো অঘটন হয়! ঝড় তুফানে পড়ে!

দূর্গা!দূর্গা!দূর্গা!

বিন্দু,শাশুড়ি দুজনে এক সঙ্গে বলতে থাকে।

জয়সেন বেরিয়ে পড়ে।

ট্রলারে উঠার সময় ভগবানের নাম নেয়।আজ দুটো ট্রলার যাচ্ছে ইলিশ ধরতে।বড়ো গলায় বলে, ভগবান আমাকে আর্শিবাদ করো,বিপদে রক্ষা করো।

ট্রলার ছাড়ে। অগ্রসেন। ট্রলারের চালক। বিচক্ষণ। জয়সেনের বাবার দিনের সে।অনেকদিনের পুরনো। অগ্রসেন বুঝে কোন জায়গায় ইলিশের ঝাঁক।ঠিক সেই জায়গায় ট্রলারের স্পিড কমিয়ে জাল ফেলার ইঙ্গিত দেবে।

আজ নদীতে জোয়ার। যেতে হবে জোয়ারের বিপরীতে।ট্রলার স্বাভাবিক ছুটতে পারবেনা। অগ্রসেন নিয়মের গতিতে ট্রলার চালায়।

বার ঘন্টা চালানোর পর ও ঠিক জায়গায় পৌঁছুতে পারেনা। সন্ধ্যা হয়ে যায়। ঐখানে নোঙর ফেলে অগ্রসেন।

ট্রলারে রান্নার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে কালিচরন। সে ও পুরনো।ভালো রান্না করে।জয়সেন বলে,

কালি,আজ কি রান্না করবি?

বাবু, ট্রলার ছাড়ার আগে মুরগী, মাছ, শুটকি,

ডাল, বেগুন,আলু, কাঁচামরিচ,সব নিয়েছি।কি খাবে বলো।

জয়সেন একটু ভেবে বলে,

ডাল,আলু ভত্তা, মুরগী রান্না কর।মরিচ একটু বেশি দিস। দেখছিসনা, চারিদিকে শুধু জল।

ঠান্ডায় ঝাল ভালো লাগবে।

রাত সাতটা আটটা বাজে।

জলের আলাদা আলোয় চারিদিক চিকচিক করছে। সাথে চাঁদের আলো।যেন অন্যরকম সাগর।

রাত নটায় ভাত খেতে বসে সবাই।ট্রলারের ছাদে। এখানে কম খাওয়া হয়। আজ জয়সেন ইচ্ছে করে বসে।কালিচরন পরিবেশন করে। পাম্প লাইটের আলোতে সবাই খায়।

খেতেখেতে জয়সেন বলে,

কালি, –ভত্তা,ডাল দারুণ। মুরগীটা বেশী স্বাদ হয়েছে।

কালি প্রশংসা শুনে ঠোঁট কামড়ে হাসে।

কাছেদূরে জয়সেনের ট্রলার ছাড়া কোনো ট্রলার নেই। যত দূরে চোখ যায় শুধু জল। চারিদিকে তাই।পাড় দেখা যায়না। চাঁদ জলে চিকচিক করে। হালকা হাওয়া খেলে। আকাশ নীল।একটুকরো মেঘ নেই আকাশে।

সবার খাওয়া শেষে চালক অগ্রসেন বলে,

বাবু,মনে হয় ঠিক জায়গায় নোঙর দিয়েছি। ইলিশের গন্ধ পাচ্ছি। মাঝরাতে জাল ফেললে প্রচুর ইলিশের দেখা পাবো।

কিভাবে বুঝলে অগ্রদা ? জয়সেন খুশীতে প্রশ্ন করে।

আমার অভিজ্ঞতায় তাই বলছে। তোমার বাবার থেকে শিখেছি।উনি বিচক্ষণ মাছ ধরার মানুষ ছিলেন। পানি দেখে বুঝতেন কোন জায়গায় কি মাছ আছে। জেলেদের নামী ছিলেন।

তাই!

এখন,তুমি কেবিনে ঘুমাও।জাল ফেলার সময়ে ডাকবো। আর তোরা উপরে শুয়ে পড়।শুধু অগ্রসেনের ঘুম নেই।তার দায়িত্বটা বেশী।সে ট্রলার চালক,আবার জেলেদেরও বড়ো মাঝি। অভিজ্ঞতায় পাকা।

হৈচৈএ জয়সেনের ঘুম ভাঙে। কেবিন থেকে বেরিয়ে দেখে, কালিচরন সহ সবাই জাল তুলছে। জ্বালে প্রচুর বড়োবড়ো ইলিশ।

সবাই ব্যস্ত।কাউকে কিছু বলেনা জয়সেন। বিন্দুর ইলিশ খাওয়ার কথা মনে পড়ে। কি খুশী জয়সেন!

এতো ইলিশ পড়েছে ট্রলার ভরে গেছে। কেবিনের নীচে বরফবঙে ইলিশ ফেলতে শুরু করে। চারটা বাঙই ভরে যায়।

এতোক্ষণে অগ্রসেন মুখ খোলে,

বাবু,তিন চারশ মণতো হবে।সব জাতি ইলিশ। প্রচুর দাম পাবো। ফিরিঙিবাজার আড়তে বিক্রি করবে? না ঢাকায়?

তখনো ইলিশ তোলা শেষ হয়নি। ইলিশের ভারে ট্রলারের অনেকটা জলে ডুবে গেছে।পূবআকাশে তখনও অন্ধকারে।

না না ঢাকায় বিক্রি দেবোনা। অগ্রদা।

বিন্দু, মা ইলিশ খেতে বলেছে,তাই। ফিরিঙিবাজার আড়তে বিক্রি দেবো।

ঠিক আছে, তাই দেবো। তবে দেরী করা যাবেনা। ভোরেভোরে ট্রলার ছাড়তে হবে। পৌঁছুতে সময় লাগবে। এবার ভাটি। আবারও বিপরীতে ট্রলার চালাতে হবে।

সময় লাগবে কেন অগ্রদা? সত্তুর ঘোড়ার মিশিন।

ট্রলারতো খালিনা,ভর্তি।

,তাই বলো।

মাছ রাখা,জাল গোছানোতে ভোর পাঁচটা বাজে।কালিচরন গরম ভাত, তাজা ইলিশ রান্না করে বেগুন দিয়ে।সাথে কাঁচা মরিচ।

অগ্রসেন বলে,

জয়সেন, সবাইকে নিয়ে খেতে বসো। খাওয়া শেষে ট্রলার ছেড়ে দেবো। তারপরেও ষোল ঘন্টা লাগবে।

খাওয়া শেষে ট্রলার ছাড়ে অগ্রসেন।

কালো আঁধারে সাগর। জল শান্ত। ট্রলার চলছে নিয়মে।সবাই ঘুমে। সারারাত কেউ ঘুমুয়নি।

জাল তুলেছে,মাছ ধরেছে।

জয়সেনের চোখেও ঘুম।

ঘুম নেই অগ্রসেনের। চালকের ঘুম থাকেনা। সে বুঝে কোনদিকে চালাতে হবে। কম্পাসে দেখে। ভুল পথে চালালে ট্রলার আটকে যেতে পারে। ডুবে যাবার ভয়ও থাকে।

একটু পরে দুইতিনটা ট্রলার দ্রুতগতিতে আসতে দেখে অগ্রসেন। ওদের ট্রলারের দিকে। বুঝতে দেরী হলোনা, ওরা জলদস্যু, ডাকাত।

চীৎকার করে সবাইকে ডাকে।ঘুম ভাঙে সবার।

একটি প্রশ্ন সবার মুখে।

কি ব্যাপার! অগ্রদা।

ঐ দেখো ডাকাত আসছে। সবাই যা আছে লাঠি, দা, ছুরি নিয়ে তৈরি হও।

একটু স্প্রীড বাড়িয়ে দাও অগ্রদা। জয়সেন বলে।

এর চেয়ে বাড়ানো সম্ভব নয়। ভারী বোট। ট্রলারের তলা ফেটে যাবে।

তাহলে উপায়?

কিছু নেই। যদি ওদের অস্ত্র থাকে কিছুই করা যাবেনা। ভগবানকে ডাকো সবাই।

বলতে না বলতে তিনটি ট্রলার ঘিরে ফেলে। হাতে বন্দুক,রিভেলবার, দা, কিরিচ,লাঠি। সবাই জয়সেনের ট্রলারে উঠে।

ডাকাত সর্দার বলে,

খুব ইলিশ পেয়েছিস। বাক্স খোল্‌। ভয়ে বাক্স খুলে দেয়। সব ইলিশ নেয়। যাবার সময় ছুরি চালায়।ছুরিতে ডান হাতে কেটে যায় জয়সেনের।

আরো দুজনের। রক্ত ঝরতে থাকে। ট্রলারে সাধারণ চিকিৎসার ঔষধ থাকে।

ডেটল,তুলা, জ্বরের, কাঁসির, মাথাব্যথার, পায়খানার অসুধ।

জয়সেনের হাতে ডেটল তুলো দিয়ে বেঁধে দেয়।রক্ত বন্ধ হয়।

অগ্রসেন পেছনে ইঞ্জিন ধরে বসে আছে। নির্বাক।কথা নেই। কি হলো? হঠাৎ!

জয়সেন স্বাভাবিক হয়ে বলে,

অগ্রদা, আর কি হবে? চলো ফিরে যাই!

নানা,খালি হাতে ফিরবোনা। অগ্রসেন উত্তর দেয়।

তাহলে কি করবে?

আবার জাল ফেলবো।ইলিশ ধরবো।তবে যাবো।

তেল চলবে?

হ্যাঁ ,চলবে। বলে ট্রলার ছাড়ে।

এক ঘণ্টা চালানোর পর ট্রলার থামায়। সূর্যের আলোয় ভরে যায় সাগর। চারিদিকে জল। স্বচ্ছ। নোঙর ফেলে অগ্রসেন।

এখানে মাছের ইংগিত পাচ্ছি অগ্রদা। জয়সেন বলে।

ঠিকই বলেছো বাবু। তোমার ধারণাটা সত্যি।

এখানে জাল ফেলবে?

হ্যাঁ।

সবাই জাল ফেলতে শুরু করে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অগ্রসেন। ঘণ্টা দেড়েক পরে জাল তোলার সিদ্ধান্ত নেয় অগ্রসেন। জালের টান দেখে অগ্রসেন বলে,

বাবু, খুব বেশী মাছ নেই। তবে কম নয়।

আরো অপেক্ষা করে অগসেন।

এক সময় চীৎকারকরে বলে, এবার জাল তোল্‌ ধীরে ধীরে।

জাল তুলতে শুরু করে।

জালে ইলিশ পরেছে এবারও। তবে সব বড়ো নয়। ছোট মিশানো। কম। বেশী নয়। তাতে জয়সেন, অগ্রসেন সবাই খুশী।

আগের মতো ট্রলারের বরফ বাক্সে রাখতে শুরু করে। কয়েকটা বড়ো ইলিশ কেবিনের ছোট বরফ বাক্সে রাখতে বলে জয়সেন।

অগ্রসেন বলে,

বাবু, এবারতো ইলিশ বেশী পড়েনি। তবে একশ মণের বেশী হবে মনে হয়।

মন্দ কি? অনেক পেয়েছি।

ট্রলার ছাড়ে।

ট্রলার এক ঘণ্টা চলার পরে আবারও একই ঘটনা।অন্য ডাকাত দল ছুটে আসে বীরের বেশে। অবস্থা দেখে অগ্রসেন বলে,

বাবু, একই বিপদে আবারো পড়লাম। কি করি এখন!

ট্রলারের গতি বাড়িয়ে দাও অগ্রদা।

হ্যাঁ, তাই দিচ্ছি।

ট্রলারের গতি বাড়ানোর পরেও ডাকাতের ট্রলার দ্রুত কাছে চলে আসে। অগ্রসেনের বুঝতে বাকী রইলোনা। এটা পঁচাত্তর ঘোড়ার ট্রলার।

ঠিক একই ভাবে ইলিশ চাইলো। ওরা ভদ্র।কম কথা বলে। হাতে ভারি অস্ত্র ব্যবহার না করে চলে যায়। ভয় দেখায়না।

অগ্রসেন ট্রলার চালকের দায়িত্বের কথা ভুলে যায়। জয়সেন নির্বাক। বাকিরা সবাই চুপ।সাগরের মাঝখানে সত্তুর ঘোড়ার ট্রলার ভাসতে থাকে।

চারিদিকে রাশিরাশি জল। ঝিরঝির হাওয়ায় ট্রলার দোল খায়।

জয়সেন হঠাৎ নিজেকে ফিরে পায় যেন। অগ্রসেন, কালিচরন,অন্য সবাইকে দেখে। চুপ। কারো মুখে কথা নেই। সাগরের

দূরে চোখ রেখে মনেমনে বলে,

হায়রে দেশের মানুষ! আকাশে, মাটিতে, এমনকি জলেও মানুষের নিরাপত্তা নেই। মানুষ থাকবে কোথায়? কোথায় যাবো আমরা?

ট্রলার অথৈ জলে ভাসে। দোল খায়! কেউ নেই,

কাউকে কিছু বলার।

x