জরুরি চিকিৎসার সরঞ্জামই নেই জরুরি বিভাগে!

রতন বড়ুয়া

শনিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৮ at ৩:৩২ পূর্বাহ্ণ
102

একটি হাসপাতালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ধরা হয় জরুরি (ইমার্জেন্সি) বিভাগকে। সংকটাপন্ন রোগীকে জরুরি চিকিৎসার আশায় প্রথমে নিয়ে আসা হয় এই জরুরি বিভাগেই। কিন্তু জরুরি চিকিৎসার কোন সরঞ্জামই নেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে! শুধু সরঞ্জামই নয়, বিভাগটিতে নেই একজন কনসালটেন্টও! প্রতি শিফটে মাত্র একজন মেডিকেল অফিসার পদের চিকিৎসক দিয়েই চলছে জরুরি বিভাগের এ সেবা। ১৯৬০ সালে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এভাবেই চলে আসছে। যদিও মাঝেমাঝে এক শিফটে দুজন মেডিকেল অফিসার দায়িত্ব পালন করেন বলে দাবি জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. রাজিব পালিতের। ডা. রাজিব পালিত বলছেনজরুরি বিভাগে একজন রোগী আসার পর যত দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে রোগীটিকে পাঠানোর কাজটি করে থাকেন তাঁরা। এছাড়া গুরুতর নয়, এমন রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। আর দুর্ঘটনায় আহতদের প্রাথমিকভাবে ড্রেসিং সেবা দেয়া হয়ে থাকে। বছরের পর বছর ধরে মূলত এরকম দায়িত্বই পালন করে আসছেন জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা। বাস্তবিক অর্থে জরুরি চিকিৎসা সেবা দেয়ার সুযোগ এখানে নেই বলেও স্বীকার করেছেন ডা. রাজিব পালিত। সংশ্লিষ্টরা বলছেনএকজন সংকটাপন্ন রোগীর জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদানের যাবতীয় আয়োজন থাকা প্রয়োজন জরুরি বিভাগে। আর কনসালটেন্ট (বিশেষজ্ঞ) থাকাটা অপরিহার্য। অন্তত কার্ডিওলজি, সার্জারি (অর্থোপেডিক), মেডিসিন ও অ্যানেসথেশিয়ার একজন করে কনসালটেন্ট থাকাটা জরুরি। এছাড়া অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ও ড্রেসিং রুমের পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের জরুরি কিছু সরঞ্জাম (এঙরে, আলট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি, ইকো কার্ডিয়াগ্রাম) থাকা প্রয়োজন।

এর বাইরে সংকটাপন্ন রোগীর জন্য আইসিইউ (ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিট) অথবা এইচডিও (হাই ডিপেন্ডেড ইউনিট) থাকলে সেটিকে একটি আদর্শ জরুরি বিভাগ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এর কিছুই নেই। কেবল একটি ড্রেসিং রুম রয়েছে, তাও ছোটখাটো। এর বাইরে শিফট ভিত্তিক একজন করে মেডিকেল অফিসার এখানে দায়িত্ব পালন করেন। অপারেশন থিয়েটার, কিংবা এঙরে, আলট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি, আইসিইউ বা এইচডিও কোন কিছুই নেই।

জরুরি বিভাগের এই দৈন্যদশার বিষয়টি স্বীকার করে সব সরকারি হাসপাতালের চিত্র একই বলে দাবি করেছেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন। হাসপাতাল পরিচালক বলছেনশুধু এখানেই (চমেক হাসপাতালে) নয়, দেশের সব সরকারি হাসপাতালেই এই ভঙ্গুর চিত্র। তবে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সেখানে জরুরি বিভাগ বলতে গেলে স্বয়ং সম্পূর্ণ। চারজন কনসালটেন্ট সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালন করেন। অপারেশন থিয়েটারের পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও রয়েছে। আইসিইউ সুবিধাও বিদ্যমান। সংকটাপন্ন কোন রোগী আসলে তাঁর জরুরি চিকিৎসা সেবাটা জরুরি বিভাগেই দেয়ার সুযোগ থাকে। জরুরি চিকিৎসা শেষে শারীরিক কিছুটা উন্নতি হলে ওই রোগীকে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে ভর্তির জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়। এটাই হওয়া উচিত। বিদেশের হাসপাতালগুলোতেও এই প্রক্রিয়ায় চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়ে থাকে।

আমাদের এখানেও জরুরি বিভাগটি স্বয়ং সম্পূর্ণ করতে পারলে অবশ্যই ভালো হতো। কিন্তু কেবল হাসপাতাল প্রশাসন কর্তৃক এমন পরিবর্তন খুব কঠিন। কারণ, বিষয়টি সরকারের উর্ধ্বতন পর্যায়ের (কিংবা মন্ত্রণালয়) সিদ্ধান্তের সাথে সম্পর্কিত। যদিও এটা হওয়া খুব প্রয়োজন বলেও মনে করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন।

জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির আহবায়ক ডা. মাহফুজুর রহমানের মতেএকজন সংকটাপন্ন রোগীর জন্য ২ বা ৩ মিনিট সময়ও কিন্তু বড় ফ্যাক্টর। অনেক সময় দেখা যায়সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর জরুরি বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে বা আইসিইউতে নেওয়ার প্রাক্কালেই রোগীটি মারা গেছেন। অথচ জরুরি বিভাগে এই জরুরি চিকিৎসা সেবার আয়োজন থাকলে রোগীটিকে হয়তো বাঁচানো যেতো। তাই সংকটাপ্নন রোগীর ক্ষেত্রে মাত্র ২/৩ মিনিট সময়ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই অন্তত সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোকে স্বয়ং সম্পূর্ণ করা উচিত। অর্থাৎ জরুরি চিকিৎসা সেবার সব আয়োজন যাতে ওখানে (জরুরি বিভাগে) থাকে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহনের দাবিও জানান এই মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীন চিকিৎসক।

চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছেবিভাগটিতে ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের (ইএমও) ৭টি পদ আছে। বর্তমানে ৭ জন ইএমও এখানে কর্মরত আছেন। দিনে তিনটি শিফটে এখানে দায়িত্ব পালন করে থাকেন চিকিৎসকরা। প্রতি শিফটে বেশির ভাগ সময়ই একজন ইএমও দায়িত্বে থাকেন। তবে মাঝেমাঝে এক শিফটে দুজনও দায়িত্ব পালন করেন বলে দাবি জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. রাজিব পালিতের।

হাসপাতাল প্রশাসনের তথ্য মতেজরুরি বিভাগের মাধ্যমে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী ভর্তি হন হাসপাতালে। আর দৈনিক প্রায় ২০০ রোগী জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা গ্রহন করেন। প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিয়ে তাঁরা বাসায় ফিরে যান।

x