জরায়ুমুখে ক্যানসার নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ
181

নারীদেহের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গ হলো জরায়ু। এটি মাতৃত্ব ও নারীত্বের জন্য অপরিহার্য অঙ্গ। জরায়ুমুখের কোষগুলোর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেলে এই ক্যানসার সৃষ্টি হয়। তবে শারীরিক এই পরিবর্তন একদিনে হয় না। জরায়ুমুখের স্বাভাবিক কোষগুলো বিভিন্ন কারণে পরিবর্তিত হয়ে ক্যানসার কোষে রূপান্তরিত হতে বেশ সময় লাগে। জরায়ুমুখে অনেকদিন ধরে ক্যানসার পূর্ব অবস্থা থাকতে পারে, যা সাধারণত রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ক্যানসার পূর্ব অবস্থা খালি চোখেও দেখা যায় না।
জরায়ুমুখে ক্যানসার এর কারণ

জরায়ুমুখে ক্যানসার ৩৫ বছর এবং ৫০-৫৫ বছর বয়সে বেশি দেখা দেয়। এই ক্যানসার হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট একক কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসকে (এইচপিভি) এ ক্যানসারের জন্য দায়ী করা হয়। শুধু অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে জরায়ুমুখ সংক্রমিত হয়ে এ ক্যানসারে রূপান্তরিত হয়। এই পর্যন্ত ১৩০ ধরনের এইচপিভি ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে এইচপিভি ১৬, এইচপিভি-১৮, প্রজাতির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই জরায়ুমুখের ক্যানসারের জন্য দায়ী।
যাদের হওয়ার আশঙ্কা বেশি

নিরাপদ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতা, বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে গর্ভধারণ, অধিক ও স্বল্প বিরতিতে গর্ভধারণ, বহুগামিতা, অনেকদিন ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন, ধূমপান ইত্যাদি।
জরায়ুমুখে ক্যানসার এর লক্ষণ বা উপসর্গ

প্রাথমিক পর্যায়ে জরায়ুমুখের ক্যানসারের লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও ক্রমে যে উপসর্গগুলো দেখা দেয় তা হলো- যোনিপথে অতিরিক্ত সাদা স্রাব, বাদামি বা রক্তমিশ্রিত বেশি স্রাব। অনিয়মিত রক্তস্রাব। সহবাসের পর রক্তক্ষরণ। ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় রক্তক্ষরণ। তলপেটে বা কোমরে ব্যথা ইত্যাদি।
ক্যানসার পূর্ববর্তী অবস্থা শনাক্তকরণ

জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে জরায়ুমুখে ক্যানসারের পূর্বাবস্থা শনাক্ত করা সম্ভব। ভিআইপি/পিএপিএস এর মাধ্যমে জরায়ুমুখে ক্যানসারের পূর্বাবস্থা শনাক্ত হওয়ার পর কোলপোস্কোপি এর সাহায্যে বায়োপসি নিয়ে ক্যানসারের পূর্বাবস্থা নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করলে রোগ নিরাময় সম্ভব। আবার খালি চোখে জরায়ুমুখ পরীক্ষা করে কোনো গ্রোথ, আলসার পাওয়া গেলে সেখান থেকে বায়োপসি নিয়ে হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষার মাধ্যমে এ ক্যানসারের ধরণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন যাদের

৩০ থেকে ৬০ বছরের নারীদের প্রতি ৩ বছর পরপর ভিআইএ-এর সাহায্যে জরায়ুমুখ পরীক্ষা করাতে হবে। ১৮ বছরের আগে বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে ২৫ বছর হলেই জরায়ুমুখ পরীক্ষা করাতে হবে। আবার বিয়ের বয়স ১০ বছরের বেশি হলে সে ক্ষেত্রে ৩০ বছরের কম বয়স হলেও জরায়ুমুখ পরীক্ষা করাতে হবে।
রোগ নির্ণয়

রোগীর শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল স্টেজিং করে জরায়ুমুখ ক্যানসারের বিস্তৃতি অনুধাবন করা হয় এবং সেই সঙ্গে জরায়ুমুখ থেকে বায়োপসি নিয়ে হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল গ্রেডিং করা হয়। ক্লিনিক্যাল স্টেজিং ও হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল এর ওপর ভিত্তি করে জরায়ুমুখ ক্যানসারের চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।
প্রতিরোধ

জরায়ুর মুখে ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই জন্য নারীদের শিক্ষিত হয়ে নিরাপদ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে। বেশি সন্তান নেওয়া যাবে না। সঠিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী সব নারীর জরায়ুমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্মসূচীর আওতাধীন থেকে প্রতি ৩ বছর পরপর জরায়ুমুখ পরীক্ষা করাতে হবে। আরো পরিণত পর্যায়ে লক্ষণ অনুভূত হওয়ার পরে রোগ নির্ণয় করা যায়- সারভাইক্যাল স্মিয়ার টেস্ট, কোলপোস্কোপি, বায়োপসি অথবা চিকিৎসকের দেখা সারভিক্সে নালি ক্ষত বা ফুলকপির ন্যায় বৃদ্ধির স্থান দ্বারা।
ক্যানসার প্রতিরোধী খাবার

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু খাবার প্রতিদিন গ্রহণ করলে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়। এ খাবারগুলোকে গবেষকরা ঘোষণা দিয়েছেন ক্যানসার প্রতিরোধী খাবার বলে। যেমন- হলুদ-কমলা রঙের সবজি ও গাজর ও ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফলমূল এগুলোতে আছে পর্যাপ্ত বিটা ক্যারোটিন, কম ফ্যাট যুক্ত দুধে আছে ক্যালসিয়াম রিবোফ্ল্যাবিন, ভিটামিন-এ, সি, ডি ইত্যাদি উপাদান এবং পেঁয়াজ ও রসুন এগুলো ক্যানসার প্রতিরোধক হিসেবে দেহে কাজ করে।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান

বিজ্ঞানী চিকিৎসক হ্যানেম্যান এর যুগান্তরকারী আবিস্কার ক্রনিক মায়াজম সোরা, সাইকোটিক ও টিউবার কুলোসিস এর প্রভাবেই জরায়ুমুখে ক্যানসার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। জরায়ুমুখের ক্যানসার একটি জটিল রোগ। তাই অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে লক্ষণ সাদৃশ্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় নিম্নলিখিত ওষুধ প্রয়োগ করে সুফল পাওয়া যাবে।
যথা- (১) আর্সেনিক এল্ব, (২) অরাম মিউর, (৩) বেলেডোনা, (৪) ক্যালকেরিয়া কার্ব, (৫) কার্বোভেজ, (৬) কার্বোএনামেলিস, (৭) কোনিয়াম, (৮) গ্রাফাইটিস, (৯) আয়োডিয়াম, (১০) ক্রিয়োজোট, (১১) ল্যাকেসিস, (১২) লাইকোপোডিয়াম, (১৩) ম্যাগ মিউর, (১৪) মার্কসল, (১৫) এসিড নাইট্রিক, (১৬) ন্যাট্রাম কার্ব, (১৭) ফাইটোলাক্কা, (১৮) রাসট্রঙ, (১৯) সিপিয়া, (২০) সাইলিসিয়া, (২১) কেলিকার্ব, (২২) ফিউলিগো, (২৩) ম্যাঙ্গিফেরা, (২৪) সিফিলিনাম, (২৫) জাপোলিন, (২৬) সেম্পারভাইভাম টেক্টোরাম, (২৭) মেডোরিনাম, (২৮) থুজা উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x