জমির জীবন বাঁচাবে সবুজ সার

সুনীল বড়ুয়া, রামু

বৃহস্পতিবার , ১৪ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ
89

রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জমিতে ‘সবুজ সার’ বা ধৈঞ্চার ব্যবহার একটি লাভজনক পদ্ধতি। জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি এবং তুলনামূলক খরচ কম হওয়ায় কৃষকেরা এ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে। শুধু সবুজ সার নয়, ধৈঞ্চার কাঠিও জ্বালানী হিসেবে মানুষের কাছে গ্রহণ যোগ্যতা বাড়ছে।
কৃষিবিদেরা জানান, জমির শ্রেণি ভেদে সবুজ সার শতকরা ৮০-৯০ ভাগ ইউরিয়া সারের ঘাটতি পূরণ করে এবং অন্যান্য সারের চাহিদা কমিয়ে আনে। জমিতে জৈব পদার্থ পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ায় এবং জমির গঠন উন্নত করে।
কৃষকেরা বলছেন,জমিতে ধৈঞ্চার ব্যবহার লাভ জনক ও পরিবেশ সম্মত হওয়ায় দিন দিন ধৈঞ্চার ব্যবহার বাড়লেও এখনো বেশিরভাগ কৃষক এ বিষয়ে ভালভাবে জানেননা।
কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের জাদী পাড়ার রহমত উল্লাহ জানান, ধৈঞ্চা সম্পর্কে খুব একটা ধারনা ছিলনা আমার। প্রথম ২০১২ সালে দুইকানি জমি দিয়ে ধৈঞ্চার চাষ শুরু করি। এ বছর করেছি তিন কানি। তিনি বলেন, রাসায়নিক সারের চেয়ে সবুজ সারে খরচ কম, ফলনও ভাল হয় এবং অনেক বেশী নির্ভরযোগ্য ও কার্যকরী পদ্ধতি। কচ্ছপিয়ার কৃষক নুরুল হক প্রায় ৫কানি ধৈঞ্চা বা সবুজ সার প্রয়োগ করেন।
তিনি বলেন, রাসায়নিক সার প্রয়োগের পর অধিক বৃষ্টি হলে জমির পানি চলে যাওয়ায় সারের কার্যক্ষমতা কমার ঝুঁকি থাকে। এ পদ্ধতিতে সে ঝুঁকি নেই। তবে লাভজনক পদ্ধতি হয়েও ধৈঞ্চার বীজ সহজ লভ্য না হওয়ায় এবং এ বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে এ পদ্ধতিতে কৃষকদের উৎসাহ কম। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শুধুমাত্র রামু উপজেলায় আমন ও তামাক ক্ষেতে প্রায় দুইশ একর বা পাঁচশ কানি জমিতে ধৈঞ্চার চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি বিভাগের রয়েছে প্রায় বিশ একর।
জানা গেছে, সবুজ সারের প্রতি চাষীদের উদ্বুদ্ধ করতে কৃষি বিভাগের পাশাপাশি ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো কোম্পানীও (বিএটিবি) কাজ করছে। রামু,চকরিয়া,বান্দরবানের লামা,আলী কদম ও নাইক্ষ্যংছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএটিবি তামাক ও সব্জি চাষীদের বিনামূল্যে ধৈঞ্চার বীজ ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে ।রামু কৃষিবিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা লিপি বড়ুয়া জানান, জমিতে পর্যায়ক্রমে রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে দিনদিন মাটি শক্ত হয়ে যাচ্ছে। মাটিতে অনুজীব কমে যাচ্ছে।
মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে এবং মাটির উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে। এছাড়াও অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগের কারণে জমিতে নাইট্রিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায় যা ফসলের জন্য ক্ষতিকর। এ ক্ষেত্রে সবুজ সার বা ধৈঞ্চা একটি নির্ভরযোগ্য এবং কার্যকর পদ্ধতি। বছর বছর ব্যবহার করলে সবুজ সার ৮০-৯০ ভাগ ইউরিয়ার ঘাটতি পূরণ করে এবং অন্যান্য সারের চাহিদা অনেক গুণ কমিয়ে আনে। জমিতে জৈব পদার্থ এবং পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ে। মাটি ঝুরঝুরে হয়। মাটির ভেতরে বায়ু চলাচল এবং অনুজীবের কার্যকারিতা বাড়ে। একথায় জমির জীবন বাঁচাতে ধৈঞ্চা অন্যতম পদ্ধতি। তিনি আরো জানান, শুধু তাই নয়, জ্বালানী হিসাবেও ধৈঞ্চার ব্যবহার করা যায়। সবুজ সারের পাশাপাশি ধৈঞ্চার কাঠি জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করতে চাষীদের উদ্ধুদ্ধ করা হচ্ছে।
চাষ ও প্রয়োগ পদ্ধতি-
বোরো মৌসুমের শেষে অর্থাৎ ১ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ধৈঞ্চা চাষের উপযুক্ত সময়। নির্বাচিত জমিতে একবার চাষ দিয়ে সবুজ সারের জন্য কানি প্রতি ৪ কেজি আর জ্বালানী এবং বীজ সংগ্রহের জন্য আড়াই কেজি বীজ ছিটাতে হবে। জমিতে খরা দেখা দিলে প্রয়োজনে একবার সেচ দিতে হবে। তিন থেকে সাড়ে তিন মাস পর ধৈঞ্চার গাছে ফুল আসলে গাছগুলো কেটে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। দশ-পনের দিনের মধ্যে তা পচে মাটিতে মিশে যায় এবং সারে পরিণত হয়। এরপর জমিতে স্বাভাবিক চাষ দিয়ে চাষাবাদ করা যায়। তবে কেউ জ্বালানী বা বীজ নিতে চাইলে না কেটে গাছগুলো চার মাস পর্যন্ত রাখতে হবে। এরমধ্যে ধৈঞ্চার কাঠি ছয়-আট ফুট উঁচু হয়। সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে ধৈঞ্চার কাঠিও বীজ সংগ্রহ করা যায়।
অনাবাদী জমিতে ধৈঞ্চা চাষ-
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, শুধু সবুজ সার নয়, জ্বালানী ও বীজ সংগ্রহের জন্য ধৈঞ্চার চাষ লাভজনক। তবে এক্ষেত্রে নদ-নদী, ঝিরির পাড় অথবা পতিত জমিতে (যেখানে অন্য কোন চাষাবাদ হয় না) চাষের জন্য বেছে নিতে হবে। খরচ কম এবং জমির জন্য উপকারী- উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ছোটন দে জানান, নিয়ম অনুযায়ী মধ্যম শ্রেণির এক কানি জমিতে ২৫ কেজি ইউরিয়া , ১৬-২০ কেজি টিএসপি, ১০ কেজি এমওপি, ১২ কেজি জিপসান, এককেজি জিংক সার দিতে হয়। কিন্তু অজ্ঞতার কারণে কৃষকেরা এর দ্বিগুণ ইউরিয়া সার ব্যবহার করে। অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের কারণে অন্যান্য সারের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ফসল ভাল হয় না। কিন্তু এর চেয়ে কম খরচে সবুজ সার প্রয়োগ করে ভাল ফসল পাওয়া যায় এবং জমির স্বাস্থ্য ভাল রাখা যায়। কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক আ.ক.ম শাহরীয়ার, জানান, স্বাভাবিকভাবে জমিতে পাঁচভাগ জৈব পদার্থ থাকার কথা থাকলেও আছে গড়ে মাত্র এক ভাগেরও কম। জমির এ ঘাটতি পূরণে ধৈঞ্চা, গোবর ও কম্পোষ্ট সার অন্যতম। এর মধ্যে ধৈঞ্চা সবচেয়ে সহজতম এবং কার্যকরী পদ্ধতি। ধৈঞ্চার গাছ থেকে জৈব পদার্থ আর শেকড়ের নডিউল (সাদা সাদা গুটি) থেকে নাইট্রোজেন পাওয়া যায়। যা জমির জন্য খুবই উপকারী। তিনি জানান, ব্যাপক হারে ধৈঞ্চার চাষ হলে দেশে সারের ঘাটতি অনেকাংশে কমে যাবে।

x