জন্মগত ত্রুটি

শনিবার , ২৮ জুলাই, ২০১৮ at ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ
50

শুভ (ছদ্মনাম), চার ভাই বোনের মধ্যে তৃতীয় সে, জন্মের সময়ই শিশুটির পরিবার জানতে পারে তার রয়েছে লিঙ্গ নির্ধারণে সমস্যা। তার শরীরে রয়েছে নারী ও পুরুষ উভয়েরই জননাঙ্গ। কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে ও দারিদ্রতার অভিশাপের কারণে পরিবারের কাছে অবহেলিত রয়ে গেল এই শিশুটি। বয়সন্ধিকালে শরীরে মেয়েলি পরিবর্তন আসতে শুরু করায় শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হয় সে। অতঃপর ১৩ বছর বয়সে অস্বাভাবিকভাবে পেট ফুলা, রক্তশূন্যতা এবং মুমূর্ষু অবস্থা নিয়ে চমেক হাসপাতালে ভর্তি হয় সে। অস্ত্রোপচার ও বায়োপ্‌সি পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পরে তার ‘গোনাডোব্লাস্টোমা’ (ক্যানসার) হয়েছে।

মারুফা (ছদ্মনাম), ৭ মাসের ফুটফুটে শিশু, জন্মের পরেই ডাক্তাররা বাবা মাকে জানিয়ে দেয় তাদের সন্তানের পায়ুপথ নেই। পায়খানা বের হওয়ার কোনো পথ না থাকায় পেট ফুলে গিয়ে এবং বমি হওয়ার কারণে বাচ্চাটি নিস্তেজ হয়ে পরে। ফলে জন্মের পরপরই বড় বড় অপারেশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় শিশুটিকে। পেটের একপাশে কৃত্রিম মলদ্বার বানিয়ে দেওয়া হয়।

১৩ বছরের দুরন্ত কিশোর জাহেদ (ছদ্মনাম), আজ ডাক্তারের চেম্বারে উপস্থিত বিশাল বড় পেট আর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে। যে চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার কথা, সে চোখে ভর করেছে বিষন্নতা আর এই সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আকুলতা। জন্ম থেকেই থ্যালাসেমিয়া নামক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আμান্ত সে। অনেক ছোট বেলায় রোগটি সনাক্ত করা গেলেও পরিবারের অবহেলা আর দারিদ্র্যের অভিশাপে সঠিক সময়ে চিকিৎসা করা হয় নি। যার ফলশ্রুতিতে প্লীহা অস্বাভাবিক ভাবে বড় হয়ে গিয়ে (চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্প্লেনোমেগালি’) ছেলেটির জীবন এখন সংকটাপন্ন।

লাভলি আক্তার (ছদ্মনাম), ২৩ বছর বয়স, গর্ভে তাঁর ২৮ সপ্তাহের সন্তান। কত না স্বপ্ন ছিল তাঁর অনাগত সন্তানকে ঘিরে। গর্ভধারণের ২৭ সপ্তাহে করা আল্ট্রাসোনোগ্রামে ধরা পরে শিশুটির হার্টের পর্দায় ছিদ্র (‘ভিএসডি’) ও মেরুদন্ডের গঠনগত ত্রুটি (‘স্পাইনা বিফিডা’) আছে। যার কারণে জন্মের পর তার বেঁচে থাকাটা অনিশ্চিত, বেঁচে থাকলেও দুঃসহ হবে সেই জীবন। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মাবাবার সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে। হয় এ সন্তানকে জন্ম দিয়ে সারাজীবন তাকে কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় করা, না হয় বুকে পাথর চাপা দিয়ে সন্তানকে গর্ভেই নষ্ট করে দেওয়া। মাবাবার জন্য এর চেয়ে কঠিন পরীক্ষা আর কি হতে পারে?

ঘটনাগুলো অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হলেও বাংলাদেশে এমন দৃশ্যপট খুব একটা অপরিচিত নয়। ঘটনাগুলো অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হলেও বাংলাদেশে এমন দৃশ্যপট খুব একটা অপরিচিত নয়। যদিও বাংলাদেশে কতজন শিশু জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মায় তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই, কিন্তু চমেক হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডা. তাহমিনা বানুর নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ২০০৮ থেকে ২০১২ সালে এ বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা ৪৫% শিশু জন্মগত ত্রুটিতে আμান্ত। উল্লেখ্য, বিশ্বে প্রতি ১০০ জন শিশুর ৩ থেকে ৬ জন শিশুই বড় ধরণের জন্মগত ত্রুটিতে আμান্ত এবং এ সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। ২০১৬ সালে ‘৩ রা মার্চ বিশ্ব জন্মগত ত্রুটি দিবস’ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড হেল্‌থ অরগানাইজেশন’ এর একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতি দশজনে একের অধিক নবজাতক শিশু জন্মগত ত্রুটি জনিত কারণে মৃত্যুবরণ করে।

এ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে সর্বপ্রথম ৩ মার্চ, ২০১৫ সালে ‘বিশ্ব জন্মগত ত্রুটি দিবস’ পালিত হয়। ‘মার্চ অব ডাইমস’ এবং ৫০ টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থা জন্মগত ত্রুটিকে গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতি বছর এ দিবসটি পালন করে আসছে।

সহজ ভাষায়, জন্মের সময় যদি শিশুর দেহের কোনো অঙ্গ অনুপস্থিত বা ত্রুটিপূর্ণ থাকে তাহলে তাকে জন্মগত ত্রুটি বলে। এটি শরীরের গঠনগত, কার্যগত, মেটাবোলিক বা জেনেটিক অসামঞ্জস্যতা যা ভ্রুণ অবস্থাতেই উৎপনড়ব হয়। এসব ত্রুটির মধ্যে রয়েছে, হার্নিয়া, হার্টের ভাল্বের সমস্যা ও পর্দায় ছিদ্র থাকা, হাত পায়ের গঠনগত ত্রুটি, ঠোঁট কাটা, তালুকাটা, খাদ্যনালি, মূত্রনালি, মলদ্বার না থাকা, পেটের দেয়াল অসম্পূর্ণ থাকা বা গঠিত না হওয়া, কিডনির গঠনগত জটিলতা, মাথার খুলি অসম্পূর্ণ থাকা, লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা, ব্রেনে অতিরিক্ত তরল পদার্থ জমা হওয়া, মেরুদন্ডের গঠনগত ত্রুটি, ‘থ্যালাসেমিয়া’, থাইরয়েড হরমোন জনিত সমস্যা, মানসিক বিকাশ জনিত সমস্যা ইত্যাদি। বেশিরভাগ ত্রুটি ভ্রুণের ৩ মাসের মধ্যেই পরীক্ষার মাধ্যমে সনাক্ত করা যায়। জন্মগত ত্রুটি সম্পর্কে আমাদের দেশের মানুষের স্বচ্ছ ধারণা নেই। বেশিরভাগ সময়ে মাকেই শিশুর জন্মগত ত্রুটির জন্য দোষারোপ করা হয়। অনেকে এর কারণ হিসেবে গর্ভকালীন সময়ে সূর্যগ্রহণ/চন্দ্রগ্রহণের প্রভাব, এই সময় বিভিন্ন খাবার খাওয়ার ফল, আশে পাশের মানুষের কুনজর, জ্বিনপরীর আছর ইত্যাদিকে দায়ী মনে করে। এখনো পর্যন্ত জন্মগত ত্রুটি সম্পর্কে যেসব কারণ জানা গেছে তার মধ্যে রয়েছে বংশগত, জিনগত, রক্ত সম্পর্কীয় বিবাহ, খুব কম বা বেশী সময়ে সন্তান ধারণ, অপুষ্টি, দারিদ্রতা, গর্ভকালীন সময়ে ধূমপান ও মদ্যপান, গর্ভকালীন সময়ে সংμামক রোগ (যেমন : রুবেলা, সাইটোমেগালো ভাইরাস, টক্সেপ্লাজমা ভাইরাস ইত্যাদি), উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হরমোনজনিত সমস্যা, খিঁচুনি, অপচিকিৎসা, তেজষ্ক্রিয়তা, ভেজাল খাদ্যদ্রব্য, চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিত ওষুধ সেবন ইত্যাদি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অনিদ্রা প্রতিকারের জন্য ‘থ্যালিডোমাইড’ ওষুধটি বাজারে আসে এবং প্রচার করা হয় গর্ভবতী মা ও শিশুদের জন্য এই ওষুধটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু ১৯৬১ সালের দিকে ডা. উইলিয়াম ম্যাকব্রাইড দেখেন যে অধিকাংশ নবজাতক শিশুই ‘এমেলিয়া’ (হাত/পা গঠিত না হওয়া) বা ‘ফোকোমেলিয়া’ (হাত পায়ের গঠনগত সমস্যা) নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে এবং এর জন্য ‘থ্যালিডোমাইড’ ওষুধটিই দায়ী। আবার কিছু কিছু ওষুধ (যেমন : আয়রন, ফলিক এসিড) গর্ভকালীন সময়ে সেবন করলে অনেকগুলো জন্মগত ত্রুটি (যেমন: মেরুদন্ডের গঠনগত ত্রুটি) প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই গর্ভকালীন সময়ে ওষুধ সেবনে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

জন্মের আগেই শিশুর জন্মগত ত্রুটি নির্ণয় সম্ভব। গর্ভধারণের আগেই মাবাবার পূর্ব ইতিহাস জেনে শিশুর জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি নির্ণয় ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ভ্রুণের প্রথম ১২ থেকে ২২ সপ্তাহ ‘হাই রেজুলেশন আল্ট্রাসোনোগ্রামের’ মাধ্যমে নার্ভাস সিস্টেম, হাটর্, কিডনি, হাড়, খাদ্যনালী, মলদ্বারসহ অন্যান্য ত্রুটি বোঝা যেতে পারে। তাই এ সময়ে গর্ভবতী মায়েদের ‘অ্যানোমালি স্ক্যানিং’ (জন্মগত ত্রুটি নির্ণয়ের পরীক্ষা) করানো উচিৎ। এছাড়াও জিনগত সমস্যা শনাক্ত করতে রক্ত পরীক্ষা এবং ‘অ্যামনিওটিক ফ্লুইড এনালাইসিস’, ‘কোরিওনিক ভিলাস এনালাইসি’ ইত্যাদি এখন বাংলাদেশেই সম্ভব।্ল্ল্ল্ল

জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধের উপায়গুলো হল রক্ত সম্পর্কীয় বিবাহ না করা, খুব কম বা বেশী বয়সে মা না হওয়া, গর্ভধারণের পূর্বমুহূর্তে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা, পরিকল্পিত উপায়ে জন্মদান, গর্ভকালীন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান থেকে বিরত থাকা, মদ্যপান না করা, অ্যানোমালি স্ক্যানিং করা, মাতৃত্বকালীন সেবার মান বাড়ানো, অপুষ্টি দূরীকরণ ইত্যাদি। এছাড়া জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। তাই রাষ্ট্রীয় সহযোগীতা, যথাযথ কারণে গর্ভপাতের আইন প্রণয়ন করা, ত্রুটিগ্রস্থ শিশুদের জন্য শিশুবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা করা ও সমাজে তাদের গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।

শিশুদের সার্জিকাল সেবা সাশ্রয়ী, বিশেষ করে যেসব জন্মগত ত্রুটি নিরাময়যোগ্য অথবা যেসব জন্মগত ত্রুটির সংশ্লিষ্ট বিকলাঙ্গতা উল্লেখযোগ্যভাবে সারিয়ে তোলা সম্ভব। একজন শিশুর ইন্‌গুইনাল হার্নিয়া রিপেয়ারের খরচে (১২.৪১ ডলার/প্রায় ১০৩৬ টাকা) ১ ড্যালি বাঁচে, যেখানে ম্যালেরিয়া দূরীকরণের জন্যে ব্যবহৃত কীটনাশকযুক্ত মশারির খরচে (৪১ ডলার /প্রায় ৩৪২২ টাকা) ১ ড্যালি বাঁচানো যায়। জন্মগত ত্রুটিতে আμান্ত শিশুর চিকিৎসা শুধু শিশুটিকে সমাজের কর্মক্ষম ব্যাক্তিতে পরিণতই করেনা, তার পরিবারকেও দারিদ্রের দুষ্টচμ থেকে বাঁচায়। দা ল্যানসেট কমিশন অন গ্লোবাল সার্জারি এবং দা ওয়ার্ল্ড হেলথ এসেম্বলি রেসুলেশ্যন ৬৮.১৫ এর মাধ্যমে সার্জিক্যাল ব্যাবস্থাকে সারা বিশ্বে শক্তিশালী করার ভিত্তি স্থাপন করা হয়। কিন্তু এতে শিশুদের সার্জারী গুরুত্ব পায়নি। সাস্‌টেনেবল ডেভেলাপমেন্ট গোল ৩.(ঝউএ ৩.) এর লক্ষ্য হল ২০৩০ সালের মধ্যে নবজাতক ও ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুহার এর অবসান করা। শিশু সার্জিকাল সেবায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ছাড়া এ লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়।

সমগ্র বিশ্বে শিশুদের সার্জিকাল সেবা প্রদানকারীদের দ্বারা ২০১৬ সালে দা গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর চিল্ড্রেন সার্জারি (এওঈঝ) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় শিশুদের নিরাপদ সার্জিকাল সেবার লক্ষ্যে অপ্টিমাল রিসোর্সেস ফর চিল্ড্রেনস সার্জারি নামক একটি ল্যান্ডমার্ক গাইডলাইন ক্ষতি করেছে। এখন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হবে ভোগোলিক বা আর্থসামাজিক অবস্থা যাই হোক না কেন, সকল শিশু যেন নিশ্চিত ভাবে নিরাপদ, সুলভ, সময়মত সার্জিকাল সেবা পায় তার বিশ্বব্যাপী বাস্তবায়ন।

হ ১. চিটাগং রিসার্চ ইন্সটিটিউট ফর চিল্ড্রেন সার্জারী (ঈজওঈঝ)

হ ২. গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর চিল্ড্রেন সার্জারী (এওঈঝ)

লেখাটি তৈরি করেছেন

প্রফেসর ডা. তাহমিনা বানু, ডা. নওরিন তামান্না

তাসমিয়াহ তাহেরা আজিজ, ডা. অর্নি দাশ ও ডা. নুগায়ের শারমিন

x