জনস্বার্থ ও দেশীয় শিল্পের বিকাশের দিকটা বিবেচনায় রাখতে হবে

রবিবার , ২৬ নভেম্বর, ২০১৭ at ৫:০৭ পূর্বাহ্ণ
76

২৪ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক আজাদীর সম্পাদকীয়তে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়েছিলো। এবং বলা হয়েছিলো যে এ সাফল্যকে ধরে রাখতে হবে। ঐদিনই সারা দেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়িয়েছে সরকার। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বলেছে, নতুন এ হার কার্যকর হবে আগামী ডিসেম্বর থেকে।

ভোক্তা পর্যায়ের পাশাপাশি বিতরণকারী সংস্থাকোম্পানি পর্যায়েও বিদ্যুতের পাইকারি দাম বেড়েছে। যদিও বিদ্যুতের খুচরা দাম বাড়ানো হলেও পাইকারি দাম বাড়েনি বলে ঘোষণা দিয়েছিল এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণায় জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিক্রিয়ায় বলা হচ্ছে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রতি মাসে নতুন করে বাড়তি টাকা গুনতে হবে এখন ভোক্তাদের। তাঁরা বলছেন, এই মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি যৌক্তিক হয়নি। কেননা গণশুনানিতে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের যৌক্তিকতাও প্রমাণিত হয়নি।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ১ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত আটবার বাড়ানো হল বিদ্যুতের দাম। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিদ্যুতের দাম গড়ে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ বাড়িয়েছিল সরকার। তাতে মাসে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের খরচ বাড়ে ২০ টাকা; ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে খরচ বাড়ে কমপক্ষে ৩০ টাকা।

সব শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মতামত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা।

তাঁরা বলছেন, গত আট বছরে বিদ্যুতের দাম আট বার বাড়লেও নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হলেও সরকার বেশি দামে উৎপাদনের সুযোগগুলো গ্রহণ করছে। এরপর ঘনঘন বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের মতই বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হচ্ছে। নিম্ন আয় এবং মধ্যবিত্তের খরচ বাড়বে। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে দামবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। ক্ষুদ্রশিল্প, বাণিজ্যিক ও শিল্প বিদ্যুতের দাম বাড়ায় পণ্য উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে একদিকে বাণিজ্যিক খরচ বাড়বে অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দাম বৃদ্ধিও ঘটবে।

যদিও প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিকইলাহী চৌধুরী বিদ্যুতের দাম বাড়ানোকে খুবই সামান্য এবং মামুলি ব্যাপার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, জনজীবনে এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করি না। দাম বৃদ্ধির কাজটি বিইআরসি নিজস্ব বিবেচনা থেকে বাড়িয়েছে, এক্ষেত্রে আমাদের কোনো প্রভাব নেই। সমালোচক বা নিন্দুকরা এ নিয়ে সমালোচনা করলেও দাম বৃদ্ধি অযৌক্তিক নয়। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও সরকারকে এখনও প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া লাগবে।

বিদ্যুতের দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হয়েছে শিল্প ও বাণিজ্যখাতে। কিছুদিন পর পর গ্যাসবিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি অনিশ্চয়তা তৈরি করে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। ব্যবসায়ীরা মনে করেন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে শিল্পের উৎপাদন খরচ আরেক দফা বাড়বে। এর প্রভাব রপ্তানি শিল্প এবং খুচরা গ্রাহক পর্যায়েও পড়বে। তাঁরা বলেন, এভাবে দাম না বাড়িয়ে সরকার পাঁচ বছরের জন্য একটি পরিকল্পনা দিয়ে রাখলে ভালো হয়। এর বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দর বৃদ্ধি বা কমার সাথে দর সমন্বয় হবে। এ রকম পরিকল্পনা থাকলে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। ফের বিদ্যুতের দর বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় আরেক দফা বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারের উৎপাদকের পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতায় সক্ষমতার ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। আর উৎপাদনের ব্যয় বাড়লে তাও শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়বে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসায়ীদের জন্য দামবৃদ্ধি বড় সমস্যা হবে না। কিন্তু সেটি এখনই নিশ্চিত না হওয়ায় শিল্পেবাণিজ্যে খরচ বাড়বে।

বিদ্যুতের সঙ্গে সব খাত জড়িত। তাই বিদ্যুতের দাম বাড়ালে সব কিছুর দাম বেড়ে যায়। এখন চালসহ নিত্য পণ্যের দাম অনেক বেশি। এমন সময়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণায় সব কিছুর মূল্য আরও বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। সরকার নানা ক্ষেত্রে সবসময় ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রেও জনস্বার্থে ও দেশীয় শিল্পের বিকাশের জন্য ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরকার বিরত থাকতে পারলে মঙ্গল হতো।

x