জনসংখ্যা বিস্ফোরণ প্রতিরোধে প্রয়োজন বিশেষ প্রচারণা

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ
39

গতকাল দেশে উদযাপিত হয়েছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘জনসংখ্যা ও উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ২৫ বছর : প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন।’ পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, গত ২৫ বছরে দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অনেক অগ্রগতি-অর্জন হয়েছে। কমেছে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, সন্তান জন্ম দেওয়ার হার। বেড়েছে গড় আয়ু, জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহারসহ আরো কিছু সূচকের হিসাব, যা নিয়ে সরকারের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। এ অগ্রগতির সঙ্গে বেড়েছে এসব কাজে নিয়োজিত পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে কাজ করা জনবলের বেতন-ভাতা, পদ-পদবি, সুযোগ-সুবিধার পরিধি। তবে দেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম শুরুর পর থেকে গত ৫০ বছরের পরিসংখ্যানের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গত ২৫ বছরে (১৯৯৪-২০১৯) পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের আওতায় দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যে অর্জন, তার তুলনায় আগের ২৫ বছরে (১৯৬৯-১৯৯৪) সাফল্যের হার বেশি। অথচ তখন এই সেক্টরে কাজ করা জনবলের এখনকার মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সাফল্য একসময় উন্নয়ন নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি কেড়েছিল। কিন্তু সেই সাফল্য বাংলাদেশ ধরে রাখতে পারছে না বলে মনে হয়। বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যেভাবে বাংলাদেশে গুরুত্ব হারাচ্ছে, তাতে দেশটির সাফল্য ভেস্তে যেতে পারে। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর একটি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনঘনত্ব প্রায় এক হাজার দুশোর কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন যে গতিতে কমছে, যতদিনে সেটা থিতু বা স্থির হবে, ততদিনে বাংলাদেশের জনঘনত্ব দাঁড়াবে অনেকটা এরকম।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, পরিবর্তিত বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধি থেমে নেই। ২০০৭ সালেই এ পৃথিবী ধারণ করেছে ৭ বিলিয়ন জনসংখ্যা। ১৯৮৭ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত প্রতি ১২ বছরে বিশ্বের জনসংখ্যা বেড়েছে ১ বিলিয়ন করে। বাংলাদেশেও এ হার ক্রমবর্ধমান। প্রজনন-হার কমে এলেও প্রতি বছর ২০ লক্ষাধিক নতুন মানুষ যোগ হচ্ছে। ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ ২০১৫ এর গবেষণা তথ্য বলছে, ১৯০১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ২৯ মিলিয়ন, তা বেড়ে ২০১৪ তে হয়েছে ১৫৬ মিলিয়ন। ২০৬১ সালে আমাদের মোট জনসংখ্যা হবে ২৬৫ মিলিয়ন। ওদিকে আয়ুস্কাল বেড়ে যাওয়ায় দেশে বয়স্ক লোকের সংখ্যা ২০১১ সালে হয়েছে মোট জনসংখ্যার ৭.৫ শতাংশ যা প্রতিনিয়ত বেড়েই যাচ্ছে। বিপরীতে প্রতি বছর ২.১ মিলিয়ন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী (১৫ বছর ও ততোধিক) জনসংখ্যায় যোগ হচ্ছে। এ বিশাল গোষ্ঠীকে শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করাই হচ্ছে সরকারের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশে ফার্টিলিটি রেট বা মা প্রতি শিশু জন্ম হার ছিল ছয় দশমিক ২। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল তিন শতাংশ। পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশ এই অতি উচ্চ জন্ম হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে। ফার্টিলিটি রেট এখন নেমে এসেছে দুই দশমিক পাঁচে, আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক দশমিক তিনে। কিন্তু কয়েক দশকের এই সাফল্য এখন ভেস্তে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাঁরা বলছেন, একসময়ে বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি অনুন্নত দেশগুলোর জন্যে রোল মডেল হলেও এখন আর সেই অবস্থা নেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতিগত পরিবর্তন, রাজনৈতিক দলগুলোর মতভিন্নতার কারণে কখনো ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর বিষয়টি সামনে গেছে, কখনো পেছনে গেছে। ফলে এই বিষয়টি আর সেভাবে গুরুত্ব নিয়ে থাকেনি। আশির দশকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা জন্ম নিয়ন্ত্রণের উপকারিতা বোঝানোর পাশাপাশি পিল ও কনডম পৌঁছে দিতেন। কিন্তু সরকারের সেই কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। প্রায় পনেরো বছর ধরে এই দপ্তরে নতুন করে কোন মাঠকর্মী নিয়োগ করা হয়নি। ফলে সেখানে একটি শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।তাঁরা জনবলের অভাবকে দায়ী করলেন। কিন্তু জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখন একজন কর্মী অনুপাতে পরিবার হয়েছে বারোশ থেকে পনোরোশো। ফলে কর্মীরা আর আগের মতো সবার কাছে যেতে পারছেন না। পিল ও কনডমের মতো সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবহারে সচেতনতা তৈরি করতে বাংলাদেশ অনেকটাই সফল হলেও, এখনো দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতি গ্রহণে বেশিরভাগ দম্পতিরই অনীহা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সরকারের উচিত এক্ষেত্রে বিশেষ প্রচারণা ও আগ্রহ তৈরি করা।

x