জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করবার কৌশল নিয়ে ভাবতে হবে

শনিবার , ১১ মে, ২০১৯ at ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
26

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অগ্রগতি সহজেই চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের উন্নয়ন এখন বিশ্বব্যাপী আলোচনার বিষয়। শাঁই শাঁই করে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। ছোট্ট একটি ভূখণ্ডে আমরা অনেক মানুষ বাস করি। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটির বেশি। মোট আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার চাপ বেশি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে অভাব, দারিদ্র্য, বেকারত্ব রয়ে গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যে গতিতে এগিয়ে চলেছে, বাংলাদেশ ঠিক সেভাবে এগিয়ে যেতে পারছে না। মানব সম্পদ হলো দেশের জনসাধারণ। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম উপকরণ হলো মানব সম্পদ। মানব সম্পদের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশ অগ্রসর হয়, সমৃদ্ধি লাভ করে এবং তার ওপর ভিত্তি করে দেশের অবস্থানের পরিমাপ চলে। মানব উন্নয়নের সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচনের সম্পর্ক রয়েছে। দারিদ্র্য ও উন্নয়ন সংজ্ঞায়িত করা ও পরিমাপ করার ক্ষেত্রে গত চার দশকের গবেষণায় বেশ পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। ‘দারিদ্র্য’ ও ‘উন্নয়ন’ এখন আর মাথাপিছু আয়ের ব্যাপার নয়, এর সাথে ‘মানব উন্নয়নের’ ও ‘মানবিক উন্নয়নের’ সকল মাত্রা সমন্বিত হয়েছে। মানব উন্নয়ন ব্যাপারটা বিশেষ করে যারা বহিঃস্থ বঞ্চিত অর্থাৎ দরিদ্র, নারী এবং যুবক তাদের পরিপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টির সমার্থক। মানুষ যে সব সত্যিকারের স্বাধীনতা উপভোগ করে সেগুলোর সম্প্রসারণ প্রক্রিয়াই মানব উন্নয়ন। কাজেই মানব উন্নয়নের সঙ্গে সহজাত যোগ রয়েছে ‘একীভূতকরণের’ ধারণা। এটি শুধু সম্পদের সঙ্গে যুক্ত নয়। এর সঙ্গে অনেক ব্যাস্টিক এবং সামাজিক অধিকারে প্রশ্ন জড়িত। অন্যদিকে, মানব উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। অর্থনীতিবিদ ও নীতি-বিশ্লেষকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অর্থের মাপকাঠিতে দারিদ্র্যকে মাপতে চান। ধরে নেওয়া হয়, ব্যক্তির জীবনযাত্রার বৈষয়িক মানদণ্ডই তার অবস্থার উন্নতি নির্দেশ করে।
মানবজাতির উন্নয়ন ছাড়া ‘মানব উন্নয়ন’ সম্ভব নয়। উন্নয়নকে একটি নৈতিক প্রত্যয় হিসেবে মেনে নিয়ে অনেকেই এর যে বিষয়গত সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা হচ্ছে ‘কাম্য পরিবর্তনই হচ্ছে উন্নয়ন’। এই অর্থে ‘মানব উন্নয়ন’ হচ্ছে ‘মানব নির্ধারিত মানবের কাম্য পরিবর্তন।’ কোনো পরিবর্তনকে উন্নয়ন বলার জন্য ঐ পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট অধিকাংশের চাওয়াটা একটা অনিবার্য পূর্বশর্ত হতে পারে, কিন্তু যথেষ্ট পূর্বশর্ত নয়। পরিবর্তনশীল মানুষের পরিবর্তনশীল প্রয়োজনীয় কাম্যতাই হচ্ছে উন্নয়নের আধেয়। আরো স্পষ্ট করে যদি বলতে হয়, তাহলেই বলি মানব সম্পদ উন্নয়নের অর্থ হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নত হওয়ার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ হওয়া, যাতে দক্ষ জনশক্তি সমাজে ও বিশ্বে তাদের অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারে এবং সমাজে তাদের চাহিদা সৃষ্টি হয়। মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই। বিশ্বের অনেকগুলি দেশ আছে, যে সব দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ অফুরন্ত। অন্যদিকে, জাপান বলতে গেলে প্রাকৃতিক সম্পদহীন একটি দেশ। তারপরও কারিগরি শিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার কারণে দেশটি বিশ্বের অন্যতম সেরা দেশের মর্যাদা পাচ্ছে। তাই নিঃসঙ্কোচে বলা যায়, কারিগরি শিক্ষা ছাড়া জনদক্ষতা বৃদ্ধি সম্ভব নয়। বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তির যুগে বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন জাতিকে সমৃদ্ধি এনে দিতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এক সময় পুরোপুরি কৃষিনির্ভর ছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তৈরি পোশাক শিল্প। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে উজ্জ্বল অবস্থানে পৌঁছে গেছে এরই মধ্যে। এ ছাড়া আমাদের রপ্তানি পণ্য তালিকায় নতুন নতুন আইটেম যুক্ত হচ্ছে। আজকাল বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত বিভিন্ন শিল্পজাত সামগ্রী, ইলেকট্রনিঙ পণ্য পৃথিবীর অনেক দেশে যাচ্ছে। এগুলোর বেশ ভালো চাহিদা রয়েছে। কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে এক সময়ে বাংলাদেশের যে পরিচিতি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, তা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে সময়ের পালাবদলে। প্রযুক্তির নানা বিকাশ, শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির রাজত্ব গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক কাঠামোয় এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন।
দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। উন্নত দেশের এটাই মূল চালিকাশক্তি। ব্যক্তিগত জীবনেও উন্নতির জন্য স্ব-স্ব ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন একান্ত প্রয়োজন। তবে দক্ষতা রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়। মূলত, উন্নত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মপরিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে ইহার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন যে, বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকবে না। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ধনী দেশ হিসাবে আবির্ভূত হবে। উন্নয়নের এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করবার কৌশল নিয়ে ভাবতে হবে।

x