জনমনে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক দূর করতে হবে

ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে চাই দায়িত্বশীল ভূমিকা

শনিবার , ৩ আগস্ট, ২০১৯ at ৩:৩৩ পূর্বাহ্ণ
45

মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। সর্বত্রই উৎকণ্ঠা। সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা নির্মূল, নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা সৃষ্টিতে গৃহীত সব প্রচেষ্টা যেন ব্যর্থ হতে চলেছে। কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না। কমছে না ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, বরং লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে বেড খালি নেই। বিপুলসংখ্যক ডেঙ্গু আক্রান্ত ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে নাভিশ্বাস উঠছে চিকিৎসক-নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রতিদিন ডেঙ্গু জ্বর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে শত শত মানুষ ছুটে যাচ্ছে। সারাদেশের মানুষের মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার অজানা ভয় কাজ করছে। প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের চোখে মুখে উৎকণ্ঠা।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর অবস্থা উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। একই সঙ্গে তাঁরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাঁরা বলেন, এডিস মশা বাংলাদেশে নতুন আসেনি, অনেক আগে থেকেই ছিল। এই সমস্যা মোকাবিলায় সঠিক পরিকল্পনা দরকার। আশপাশের দেশগুলো এবং আগের বছরের অবস্থা তুলনা করলে দেখা যাবে সার্বিক পরিস্থিতি বেশ জটিল। তবে মহামারী বা আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু না।
অন্যদিকে, ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ায় মশাবাহিত এই রোগ থেকে মুক্তির জন্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন দলটির সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমি কতগুলো নির্দেশনা দিয়েছি। আমি মনে করি, আমাদের পার্টির মানুষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে মশার বংশবিস্তার যাতে না হতে পারে তার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এবং নিজেদের, পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা, ঘর-বাড়ি সুরক্ষিত করা হয় সেজন্য সবাইকে আমি আহ্বান জানাচ্ছি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশা দমনের গুরুদায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। তাদের কর্মীরা এডিস মশা নিধন ওষুধ স্প্রে করবে এবং যে সকল স্থানে এডিস মশার প্রজননস্থল রয়েছে সেগুলো খুঁজে বের করে স্প্রে করে লার্ভা ধ্বংস করবে। সিটি কর্পোরেশন ছাড়াও নাগরিকরা সচেতন হয়ে নিজেরা ডেঙ্গু মশার প্রজননস্থল অর্থাৎ বাড়ির আশপাশে ডাবের খোসা, আইসক্রিমের কৌটা, ভাঙা বালতি, ফুলের টব, টায়ার ও টিউবসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি পরিষ্কার করতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে এডিস মশা যেন অন্য কাউকে কামড়ে আক্রান্ত করতে না পারে সেজন্য ডেঙ্গু জ্বরের রোগীকে সবসময় মশারির নিচে রাখতে হবে। কিন্তু প্রতিরোধে অত্যাবশ্যক এ তিনটি কার্যক্রমের কোনোটিতেই সফলতা আসছে না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি কর্পোরেশন ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। একইভাবে পারিবারিক বা ব্যক্তি পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব কারণেই আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এডিস মশা মূলত দিনের বেলা, সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তবে রাত্রে উজ্জ্বল আলোতেও এডিস মশা কামড়াতে পারে। মশার কামড় থেকে বাঁচতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে। সম্ভব হলে ঘরের দরজা ও জানালায় নেট লাগানো যেতে পারে। প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলন্ট স্প্রে, লোশন, ক্রিম, কয়েল ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুদের হাফপ্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা পরাতে হবে। এডিস মশা জমা হওয়া স্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে। তাই ঘরে সাজানো ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, যেকোনো পাত্র বা জায়গায় জমে থাকা পানি তিন থেকে পাঁচ দিন পর পর ফেলে দিতে হবে। এতে এডিস মশার লার্ভা মারা যায়। পাত্রের গায়ে লেগে থাকা মশার ডিম অপসারণে পাত্রটি ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করে নিতে হবে। ঘরের বাথরুমে কোথাও জমানো পানি পাঁচ দিনের বেশি যেন না থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ঘরের অ্যাকুয়ারিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচে এবং মুখ খোলা পানির ট্যাংকে যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত তিন দিন মশা নিধনের জন্য স্প্রে বা ফগিং করতে হবে। বিভিন্ন রাস্তার আইল্যান্ডে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ফুলের টব, গাছপালা, জলাধার ইত্যাদি দেখা যায়। এখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে। সেগুলোতেও যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল দিতে হবে।
তবে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। জনগণের মনে যেন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, তা দূর করার দায়িত্ব সরকারের। এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের।

x