জনবলের নতুন অর্গানোগ্রাম পাস হয়নি ৬ বছরেও

বিপিসিতে কমেছে সেবার গতি

সোহেল মারমা

বৃহস্পতিবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৮ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ
85

৩৪ বছর আগে বছরে ১০/১২ লাখ টন জ্বালানি আমদানি করত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। বর্তমানে তাদের আমদানির পরিমাণ ৭০ লাখ টন। আগের তুলনায় বর্তমানে বিপিসির কাজের পরিধি ৫/৬ গুণ বাড়লেও সে তুলনায় বাড়েনি জনবল। বছর ছয়েক আগে নতুন অর্গানোগ্রাম বা জনবল কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংশোধনের নামে সেটি বিপিসি থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত তিনদফা যাওয়া-আসা করেছে। এরপরও ফাইলটি পাস হয়নি। এভাবে চরম জনবল সংকটের মধ্যে বছরের পর বছর পার করছে সংস্থাটি। এতে অতিরিক্ত কাজের চাপে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যেমন অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে তেমনি সংস্থাটির দৈনন্দিন কার্যক্রমেও গতি কমছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
বিপিসি সূত্র জানায়, জনবল সংকটের কারণে বর্তমানে একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্বে থাকার পরও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে একই কর্মকর্তাকে। ফলে একজন কর্মকর্তার পক্ষে একসাথে এতগুলোর দায়িত্ব পালন করা যেমন কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে তেমনি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে তিনি সঠিক ভাবে নজরদারিও করতে পারছেন না। এতে বিপিসির পুরো কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিপিসি’র ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজাদীকে বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত আট ঘণ্টার জায়গায় জরুরি প্রয়োজনে দশ ঘণ্টা কাজ করা যেতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন যদি কাউকে ১৬ ঘণ্টা কাজের দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে তাঁর মানসিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? নতুন অর্গানোগ্রামটি চূড়ান্তের ব্যাপারে এত
সময়ক্ষেপণ হওয়ার কারণ কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি তৈরির প্রক্রিয়া এখন থেকে নয়; এটা বহু আগে থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে মাঝপথে এটি আটকে যায়। সর্বশেষ ২০১২ সালে আবারো অর্গানোগ্রামটির ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই সময় মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা অর্গানোগ্রামটি পরে সংশোধনীর জন্য পাঠানো হয়। প্রয়োজনীয় সংশোধনীর পর ২০১৩ সালে তা আবারো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মাঝখানে কয়েক বছর এটার ব্যাপারে সাড়াশব্দ ছিল না। গত বছর আবারো অর্গানোগ্রামটির ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেটাও চলতি বছরের প্রথম দিকে সংশোধনীর জন্য বিপিসি দপ্তরে পাঠানো হয়। সর্বশেষ সংশোধনীর পর গত অক্টোবরে আবারো তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’
যত দ্রুত অর্গানোগ্রামটি চূড়ান্ত হবে তা বিপিসিসহ সবার জন্য মঙ্গল জানিয়ে এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আগে বিপিসি প্রতিবছর মিলে জ্বালানি তেল আমদানি করত ১০ থেকে ১২ লাখ টন। এখন আমদানি করছে ৭০ লাখ টন। সে সময় বিপিসির কোনো প্রকল্প কাজও ছিল না। এখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বিপিসি বাস্তবায়ন করছে। সামনে আরও প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পূর্বে বিপিসির সাথে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা ছিল না। বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করতে হচ্ছে। এভাবে বিপিসির কাজের পরিধি আগের তুলনায় অন্তত পাঁচগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু আমাদের জনবল আগের মতোই রয়ে গেছে।’
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের সচিব কাজী মোহাম্মদ হাসান গত রোববার আজাদীকে বলেন, ‘সর্বশেষ পাঠানো অর্গোনোগ্রামটিতে খুব বেশি কাটছাট হবে না। আমরা সেখানে ৩১৫ জনের জনবল দেখিয়েছি। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, আশা করছি, ‘এবার মন্ত্রণালয়ে অর্গোনোগ্রামটি পাস হবে বলে আশা করছি। এক্ষেত্রে আর খুব বেশি সময় লাগবে না।’ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাধিক দায়িত্ব পালন করার কথা স্বীকার করে সচিব বলেন, ‘আমি নিজেও সবসময় প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থাকি।’
বিপিসি’র সংস্থাপন শাখার এক কর্মকর্তা গতকাল আজাদীকে বলেন, ‘অর্গানোগ্রামের বিষয়ে গত সোমবার মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। সে বৈঠকের ব্যাপারে এখনো বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তবে আশা করছি, এবার এটা চূড়ান্ত হয়ে যাবে।’
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে তৎকালীন সরকার গঠিক এনাম কমিটি বিপিসি’র জন্য ১৭৭ জনের একটি জনবল কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম তৈরি করেছিল। তবে ওই কাঠামো অনুযায়ী এখনো বিপিসি পরিপূর্ণভাবে লোক নিযুক্ত করতে পারেনি। এরমধ্যে ৫৯ জন কর্মকর্তা ও ১১৮ জন কর্মচারী রয়েছেন। এসব অনুমোদিত জনবলের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১১৬ জন। এর মধ্যে ৩৭ জন কর্মকর্তা ও ৭৯ জন কর্মচারী রয়েছেন। বাকী পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছে, নতুন জনবল কাঠামোটি চূড়ান্ত হলে আরও ১৩৮ জনের জনবল বেড়ে যাবে।
জানা গেছে, বিপিসি’র ওপর জনগণের চাহিদা বৃদ্ধি ও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সম্প্রসারণের ফলে নতুন করে অর্গানোগ্রাম তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে বিপিসি’র তৎকালীন চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক ৩২৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি জনবল কাঠামো তৈরি করে নতুন অর্গানোগ্রাম প্রণয়ন করেন। পরে তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিলে সংশোধনের জন্য তা বিপিসিতে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ৪১১ জন ও ৩১৫ জনের জনবল কাঠামো পাঠানো হয়। সর্বশেষ অর্গানোগ্রামের ব্যাপারে উদ্যোগ নেন বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান ও বর্তমানে জ্বালানি সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। বর্তমান সরকারের দুই দফা মেয়াদে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে আগের তুলনায় জ্বালানি আমদানি ৫ থেকে ৬ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময় আমদানি, বিপণন ও সরবরাহ কার্যক্রমে গতিশীলতার লক্ষ্যে বড় বড় বাজেটের কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিপিসি।
২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে বিপিসি যেখানে ৩৩ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল হ্যান্ডেলিং করত সেখানে গত অর্থবছর (২০১৭-১৮) এর চাহিদা দাঁড়িয়েছে ৮৬ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন। এসব কার্যক্রম কম জনবল দিয়েই চালাতে হয়েছে বিপিসিকে।
চল্লিশ বছর আগে এক অর্ডিন্যান্সে আত্মপ্রকাশ করা এই সংস্থাটি সরকারি ঋণ, ভতুর্কি ও সাহায্যে বেশিরভাগ সময় চলে আসলেও সম্প্রতি এটি ধীরে ধীরে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এটা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে একটি অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে দীর্ঘমেয়াদী চলা বিপিসির পক্ষে এখন অনেকটা অসম্ভব বলে মনে করেন কর্মকর্তারা।
উল্লেখ্য, দেশের জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিপিসি’র সদর দপ্তর চট্টগ্রামেই অবস্থিত। এখান থেকেই সারাদেশের চাহিদার ভিত্তিতে আমদানি করা জ্বালানি তেল পরিশোধন করে দেশব্যাপী সরবরাহ করা হয়।

x